পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ১১:৪২ পিএম

অরণ্য কিংবা ঘন গাছপালা রয়েছে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশের ৩০০ মিটারের মধ্যে যেসব ব্যক্তি বসবাস করেন, তাদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১৬ শতাংশ  হ্রাস পায়। স্পেনের একদল গবেষক এমনটাই জানিয়েছেন। সায়েন্স নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেনের হাসপাতাল ডেল মার মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ডেল মার হাসপাতাল, কাতালোনিয়ান সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের যৌথ গবেষণায় এই ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণাপত্রটি এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্পেনের কাতালোনিয়ার গবেষকরা ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে ৩৫ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

পাশাপাশি, গাছপালা বেশি থাকলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কম থাকে। গবেষকদের দাবি, পরিবেশ দূষণের মাত্রা যত বাড়ে স্ট্রোকের আশঙ্কাও তত বেড়ে যায়। ৫ জুন বিশে্বর ১০০টির বেশি দেশের মতো বাংলাদেশেও ঘটা করে পালিত হয় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ এই বাংলাদেশ। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণসহ প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ টেকসই পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন আধার সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই প্রত্যেককে কমপক্ষে একটি করে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশ^ পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২২ এবং ‘ জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২২’ উদ্বোধন করেন। গত দুই বছর করোনা মহামারীর কারণে বন্ধ ছিল জাতীয় পর্যায়ের এই মেলাটি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং অংশীজনের মধ্যে জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২০, ২০২১, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৯, ২০২০ এবং সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীদের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন। জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২২ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন প্রাঙ্গণে তিনটি গাছের চারা রোপণ করেন। এ বছরের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযানের প্রতিপাদ্য হলো ‘বৃক্ষ প্রাণে প্রকৃতি-পরিবেশ, আগামী প্রজন্মের টেকসই বাংলাদেশ’। প্রতিপাদ্যটি সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না- সেই ইঙ্গিতও রয়েছে তাতে। তাই আমাদের উন্নয়ন কর্মকা-ে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে বৃক্ষরোপণ ও প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে।

শহরের ছাদ বাগানে যারা পছন্দ মতো ফলের গাছ লাগাতে চান, ফুলের গাছ লাগাতে চান, যারা বারান্দা বেলকনি সাজাতে চান সবুজ শোভাবর্ধক বৃক্ষলতায়, যারা বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও কারখানার খালি জায়গায় ভরে তুলতে চান সবুজের সমারোহে, তারাই সারা বছর ধরে অপেক্ষা করেন জাতীয় বৃক্ষমেলার জন্য। জাতীয় বৃক্ষমেলায় শুধু দেশ-বিদেশি ফল, ফুল, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারাই বিক্রি হয় না, সেখানে বৃক্ষ পরিচর্যার যাবতীয় উপকরণও পাওয়া যায় সুলভে। বিভিন্ন ধরনের টব, বৃক্ষ পরিচর্যার যন্ত্রপাতি, জৈব সার, জৈব কীটনাশক সবকিছুই পাওয়া যায় বৃক্ষমেলায়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মেলায় গিয়ে দেশের ফুল, ফল ও ভেষজ গাছের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এতে তাদের মধ্যে বৃক্ষরোপণে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় প্রাণ-প্রকৃতি ও সবুজ বৃক্ষের প্রতি অসীম মমত্ববোধ ও গভীর ভালোবাসা। ঢাকার আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশের মাঠে এবারও শুরু হয়েছে ‘জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২২’। মাসব্যাপী এই মেলা চলবে ৪ জুলাই পর্যন্ত। এবারে জাতীয় বৃক্ষমেলায় ১১০টি স্টলে ২০০ প্রজাতির ফুল, ফল, ভেষজ ও শোভাবর্ধক গাছ পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেশি বিক্রি হচ্ছে ছাদ বাগান উপযোগী গাছ। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আম্রপালি, বারি আম-১১ (বারমাসি), কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গু, ব্রুনাই কিং, কেজি ফোর, পালমার, সূর্যডিম জাতের আম, বিদেশি কাঁঠাল, কমলা, থাই বাতাবিলেবু, থাই তেতুল, ভিয়েতনামি রঙিন কাঁঠাল, ডালিম, শরিফা, সফেদা, আমলকী, রঙিন জামরুল, অরবরই, বিলম্বি, ড্রাগন, বারমাসি আমড়া, করঞ্জা, বলসুন্দরী কুল, গ্রিনলেডি জাতের পেঁপে, বারি মাল্টা-১, তৃণ, থাই পেয়ারা ইত্যাদি। ফুলের মধ্যে রয়েছে গোলাপ, গাঁদা, কনকচাঁপা, টগর, নয়নতারা ইত্যাদি। বর্ণিল অর্কিড এখন প্রায় সবাই চেনে। বিদেশি প্রজাতির এই ফুল সাধারণত থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়। তবে দেশে চাহিদা বাড়ায় মানিকগঞ্জ, সাভার ও ময়মনসিংহে ভালো উৎপাদন হচ্ছে অর্কিডের। এবারের মেলায় বিভিন্ন রঙের অর্কিডেরও সমারোহ দেখা যায়।

প্রতি বছরের মতো এবারও এসিআই ফার্টিলাইজার তাদের নগরীয় কৃষি কার্যক্রম,  ‘এসিআই অরণ্য’ নিয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলায় অংশগ্রহণ করেছে। বিভিন্ন জাতের দেশি-বিদেশি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছ, বাগান পরিচর্যার সরঞ্জাম, জৈব সার, হরমোন, ম্যাক্রো, মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট, বীজ, কীটনাশক ও ফুলের টব ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে এসিআইয়ের স্টলে। এছাড়া ওই স্টলে আছে গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল শেখার সুবিধা। ‘এসিআই অরণ্য’ স্টল পরিদর্শন করলে নগরীয় কৃষির অনেক কিছুই শিখতে পারবেন যে কেউ। মেলায় বিক্রয়ের পাশাপাশি ‘এসিআই অরণ্য’ বাসাবাড়ি কিংবা অফিস-আদালতে গাছ লাগানো ও পরির্চার সেবা দিয়ে থাকে। শহরে গাছ রোপণের জন্য টব অপরিহার্য। এবারের মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ডিজিটাল টব, যাতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পানি দেওয়া সম্ভব। টবটির মুখ বন্ধ থাকায় এতে মশামাছি ও পোকামাকড় জন্মাতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশের সর্বত্র ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ এবং রোপিত বৃক্ষের পরিচর্যার কোনো বিকল্প নেই। এ কাজে জাতীয় বৃক্ষমেলার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সারা দেশের নামকরা নার্সারিগুলো  জাতীয় বৃক্ষমেলায় অংশগ্রহণ করে। ফলে অংশগ্রহণকারী নার্সারিগুলোর সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, চারা বিক্রি বেড়ে যায়। অধিক গুণগত মানের চারা উৎপাদনে নার্সারির মালিকরা নতুন করে মনোনিবেশ করেন। নগরবাসী হাতের কাছে সুলভে পছন্দ মতো গাছের চারা ও বৃক্ষরোপণের উপকরণ পেয়ে সহজেই গড়ে তুলতে পারেন শখের ছাদ বাগান। মেলা থেকে গাছের চারা কিনে কেউ কেউ গ্রামের বাড়ির আশপাশে, কেউ কেউ অফিস-আদালত, কলকারখানা ও বিদ্যালয়ের খালি জায়গায়  রোপণ করেন, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

লেখক : মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত