পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরসেনর প্রভাব ফেলবে। এটি হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এ সেতুকে চিন্তা করতে হবে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে। এর ফলে দেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে, যা নির্মিত পদ্মাসেতুর ব্যয়ের প্রায় তিনগুণের বেশি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে জাতীয় অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব শীর্ষক অর্থনীতিবিদদের সংলাপে এ কথা বলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত, ড. জামালউদ্দীন আহমেদ, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। এছাড়া অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক এফবিসিসিআই সভাপতি ও সংসদ সদস্য শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিটিএমইএ সভাপতি ও সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী ও আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।
সংলাপে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের গর্বের বিষয়। এর ফলে আমাদের জিডিপিতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। যা নির্মিত পদ্মা সেতুর ব্যয়ের প্রায় তিনগুণের বেশি।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থা পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার পর নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটার মাধ্যমে যে হিউম্যান ক্যাপিটাল অর্জন হয়েছে এটা এখন নতুন যে কোনো উদ্যোগের সাহস জোগাবে। পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এটা একটি অর্থনৈতিক করিডর হয়ে গেল। এর ফলে এই অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হবে।
তবে তিনি বলেছেন, উন্নয়ন যেন প্লটভিত্তিক না হয়ে ব্লকভিত্তিক হয়। পদ্মা সেতু চালুর পরে ঢাকায় আরও গাড়ির চাপ বাড়বে। তাই সেই বিষয় মাথায় রাখা উচিত। সামগ্রিক ভাবে বলব ঢাকায় একটি রিংরোড হওয়া দরকার। যাতে গাড়ির এই নতুন চাপ সামাল দেওয়া যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে উন্নয়নের সুফল পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এ সেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটন বাড়বে, শিল্প গড়ে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটবে, যা অর্থনীতিতে অনন্য মাত্রা যোগ করবে। এই সেতু আমাদের বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, পদ্মা ছিল কীর্তিনাশা পদ্মা, এখন হয়ে যাবে কীর্তিমান পদ্মা। এর ওপর দিয়েই তো আমাদের নতুন সফলতা গাঁথা হবে।
টিপু মুনশি বলেন, যে কথা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, একইভাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমরা জানি যে, অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব পড়বে, আমাদের ভাগ্য বদলাবে। এই সাহস দেখিয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন যে, আমরা মাথা নত করার লোক নই।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, পদ্মা সেতু করার সাহসী পদক্ষেপ আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এটা শেষ না হতেই আমরা এখন আরেকটি পদ্মা সেতুর দাবি করছি। সবাই এখন আমাদের প্রশংসা করছে। পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায়ও শেখ হাসিনাকে মোস্ট পপুলার লিডার হিসেবে গণ্য করা হয়।
আলোচনায় অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে ট্রান্সপোর্ট বাড়বে। পণ্য পরিবহন বাড়বে। আগে যে ঢাকায় পণ্য আনতে বেশি সময় লাগত, পথেই কাঁচা শাকসবজি নষ্ট হতো সেটি কমবে। এর ফলে কৃষক লাভবান হবে। মানুষ টাটকা শাক-সবজি খেতে পারবে। এই অঞ্চলে কৃষি কলকারখানা বৃদ্ধি পাবে। মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল। সব চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে পদ্মা সেতু করল এটাই বড় শক্তি। এখন বিদেশিরা বাংলাদেশের এই উন্নয়নকে মিরাকল বলে। পদ্মা সেতুর ফলে শুধু দেশের ২১টি জেলা নয় পুরো বাংলাদেশই উপকৃত হবে। এর আশপাশে ট্যুরিজম অনেক ডেভেলপ করবে। প্রধানমন্ত্রীর ৩০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির জন্য শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য সবগুলো পোর্টই প্রয়োজন হবে। খুলনা দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে। এটার মাধ্যমে বড় একটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই এলাকায় কৃষি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা অনেক উপকৃত হবে।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর (ইএবি) সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, এই সেতুর ফলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। এই সেতুর মাধ্যমে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে চাপ কমবে। আমরা মোংলা পোর্ট খুব অনায়াসেই ব্যবহার করতে পারব। এতে এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবনসহ পাশর্^বর্তী এলাকায় পর্যটন বৃদ্ধি পাবে।
