প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পেরিয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের। এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক বেতন পান সাকুল্যে ১০ হাজার টাকা। তবে কয়েকজনকে ১২ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। অথচ প্রত্যেক শিক্ষকই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা। আর অধ্যাপক বেতন পান মাত্র ৩০ হাজার টাকা। বছরের পর বছর এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়টি চালাচ্ছেন এর উদ্যোক্তারা। সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অসংগতি ও অনিয়ম নিয়ে তদন্ত শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
(ইউজিসি)। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহেরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তাদের প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ করেছে। শিগগিরই সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদনের কপি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের প্রভাষকরা শুরুতেই জাতীয় বেতন কাঠামোর নবম গ্রেডে ৩৫ হাজার টাকার ওপরে বেতন পান। বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকদের বেতন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষকরা যোগদানের মাস থেকেই শুধু সরকারি অংশেই পান ২২ হাজার টাকা ও মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষকরা পান ১৬ হাজার টাকা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকও শুরুতেই ১৬ হাজার টাকা বেতন পান।
ফার্স্ট ক্যাপিটাল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ দেখতে পায়নি ইউজিসির তদন্ত কমিটি। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন থাকার কথা থাকলেও ফার্স্ট ক্যাপিটাল বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম ১০ থেকে ১২ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি জীর্ণ অবকাঠামোতে পরিচালিত হচ্ছে। এত স্বল্প আয়তনে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন দেওয়া সমীচীন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৪টি প্রোগ্রামের অনুমোদন রয়েছে। সে হিসেবে কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষক থাকার কথা। অথচ আছেন ৩৩ জন। যাদের মধ্যে ২৪ জনই প্রভাষক। অধ্যাপক আছেন একজন, সহযোগী অধ্যাপক আছেন একজন ও সহকারী অধ্যাপক আছেন ৭ জন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে যথাযথ যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যতজন শিক্ষক প্রয়োজন তা নিয়োগ করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করতে হবে। এছাড়া মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি প্রস্তুত, উন্নতমানের কম্পিউটার সংযোজন এবং পর্যাপ্ত ক্লাসরুম না বাড়ানো পর্যন্ত ল্যাবরেটরিভিত্তিক প্রোগ্রামেও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন পদ রেজিস্ট্রার, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), লাইব্রেরিয়ান, ডিন, প্রক্টর, উপদেষ্টা (ছাত্র কল্যাণ), জনসংযোগ কর্মকর্তা ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে দ্রুততম সময়ে নিয়োগ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। তাদের যে বেতন দেওয়া হয় তা বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে খুবই অপ্রতুল। সকলের বেতন-ভাতাদি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে পাঠিয়ে কমিশনের চিঠি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কক্ষ মোটেই সুরক্ষিত নয়। খাতাপত্র উন্মুক্ত স্থানে আছে, যা থেকে বোঝা যায় বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে। ইউজিসি নির্দেশনা দেওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই মুজিব কর্নার। প্রতি চার বছর পরপর চলমান প্রোগ্রাম আপডেট করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। গত দুই অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করা হয়নি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী সাধারণ তহবিল পরিচালনায় বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মনোনীত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও রাষ্ট্রপতি মনোনীত ট্রেজারারের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। কিন্তু আইন অনুযায়ী তা করা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়টির চেক স্বাক্ষর করেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, যা আইনসম্মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও এফডিআর খোলা হয় ২০১৮ সালে। তাই প্রতিষ্ঠাকাল থেকে প্রয়োজনীয় সুদ হিসাব করে সংরক্ষিত তহবিলে জমা দিয়ে এর প্রমাণ কমিশনে পাঠাতে হবে।
এছাড়া ক্যাশবই নিয়মিত হালনাগাদ, স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য, গত তিন বছরের আয়-ব্যয় বিবরণী, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বিবরণী, আয়কর রিটার্ন দাখিলের তথ্য কমিশনে পাঠাতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকদের বেতন কম, এটা ঠিক। তবে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন দিতে আমি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর সে অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে বলে চেয়ারম্যান সম্মত হয়েছেন। কিন্তু চেয়ারম্যান বর্তমানে অসুস্থ। আগামী জুলাই থেকে আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা ছিল। সেটা হয়তো ডিসেম্বর লেগে যাবে। এরপর অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।’
