বাংলাদেশের তো বটেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মার দুই তীরের মানুষের চোখে আনন্দের উচ্ছ্বাস। পদ্মা সেতু সংযুক্ত করছে পদ্মা নদীর দুই তীর। পদ্মা সেতু শুধু তীব্র খরস্রোতা নদীর ওপর নির্মিত চ্যালেঞ্জিং এক সেতুই নয়; এর নির্মাণশৈলী, বিশালত্ব, ব্যয়বহুলতার সব দিক ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক গুরুত্বের সেতু। প্রথম থেকেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিরোধিতার অভিযোগ ছিল। বিরোধিতাকে পুঁজি করে পাল্টা আক্রমণও চলেছে, চলেছে কথার লড়াই। দেশীয়, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শক্ত অভিযোগ করা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে। আছে বাস্তব-অবাস্তব নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ। দফায় দফায় খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেশি টাকা ব্যয় এবং উচ্চ হারে টোল ধার্য করার সমালোচনাও আছে। কিন্তু সব সত্ত্বেও পদ্মা সেতু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরু থেকে এ সেতু নিয়ে অসংখ্য সংবাদ হয়েছে। লেখা হয়েছে বিস্তর সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়; নানাদিক থেকে করা হয়েছে বিশ্লেষণ। কতশত ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন যে প্রকাশিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাংলাদেশের পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন, ফেইসবুক পেজ, ইউটিউব, ব্লগ মিলে কত খবরের উৎস হয়েছে পদ্মা সেতু? সার্চ ইঞ্জিন গুগল থেকে জানা যাচ্ছে পদ্মা সেতু নিয়ে গত কয়েক বছরে অন্তত আড়াই কোটি প্রতিবেদন হয়েছে। পদ্মা সেতুর পাইলিং, পিলার স্থাপন, স্প্যান বসানো সবকিছুই ছিল সংবাদ শিরোনাম। গুগলে ইংরেজিতে ‘পদ্মা ব্রিজ নিউজ’ লিখে সার্চ দিলে এক কোটি ২৩ লাখ খবরের লিংক পাওয়া যায়। ইংরেজিতে শুধু ‘পদ্মা ব্রিজ’ লিখলে ৬০ লাখ ১০ হাজার খবরের লিংক পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ছবি, ভিডিও, ওয়েবসাইট থাকলেও বেশির ভাগই পদ্মা সেতু নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ। গুগলে বাংলায় ‘পদ্মা সেতুর সংবাদ’ লিখে সার্চ দিলে ১৪ লাখের মতো খবরের লিংক পাওয়া যায়। আর বাংলায় ‘পদ্মা সেতুর নিউজ’ লিখে সার্চ দিলে পাওয়া যায় ১৬ লাখ ২০ হাজার লিংক। শুধু ‘পদ্মা সেতু’ লিখলে পাওয়া যায় ৩৬ লাখ লিংক। এই লিংকগুলোতে পদ্মা সেতু নিয়ে করা বিভিন্ন প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেতু নিয়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সেতু।
পদ্মা সেতু নিয়ে আনন্দের বন্যার পাশাপাশি দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি। কোলের সন্তান নিয়ে মায়ের শুকনো জায়গা খুঁজে বেড়ানো, খাদ্যের জন্য হাত বাড়ানো মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অসহায় চাহনি, গবাদিপশু আর মানুষের গাদাগাদি করে থাকার ছবি প্রচারমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। কী হারায়নি মানুষ এই বন্যায়! মাথার ওপরে ছাদ নেই, পায়ের নিচে শুকনো মাটি নেই, জমির ফসল, গোলার ধান, পুকুরের মাছ, রাস্তাঘাট, দোকানপাট সব ভেসে গেছে, ভেসে গেছে বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণসহ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন।
বাংলাদেশ পানি পলি ও বন্যার দেশ। বাংলাদেশ বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চার ধরনের বন্যা হয়। এগুলো হচ্ছে : ১. মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত বর্ষাকালীন বন্যা। ২. আকস্মিক (পাহাড়ি ঢল) বন্যা। এ বন্যা বাংলাদেশের উত্তরের কিছু এলাকা, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে হয়ে থাকে। এ বন্যার পানি দ্রুত বাড়ে এবং দ্রুতই আবার কমেও যায়। একই সঙ্গে পানিপ্রবাহের গতিবেগ বেশি হয় এবং বন্যা হয় স্বল্পমেয়াদি। ৩. অপ্রতুল নিষ্কাশন ব্যবস্থাজনিত বন্যা। এ ধরনের বন্যা সাধারণত পর্যাপ্ত পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পানি জমে কোনো কোনো এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এ বন্যার পানি খুব ধীরে কমে এবং বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হয়। ৪. সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ঝড়-সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ারের উচ্চতাজনিত বন্যা।
এবার সিলেট অঞ্চলের এই ভয়াবহ বন্যার কারণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে সমস্ত কথা তার অনেক কিছুই আমাদের জানা। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প মেঘালয়ের পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ওপরে উঠে যায়। সেখানে ভারী হয়ে বৃষ্টি আকারে পড়তে শুরু করে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এবার ভীষণ বৃষ্টি হয়েছে এই অতিবৃষ্টির কারণে এবারের ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি। এবার এক টানা তিন দিন চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত হয়েছে, ২৪৮৭ মিলিমিটার, এই পানি নেমে আসতে না আসতে আরও কয়েক দিন বৃষ্টি হয়েছে। চেরাপুঞ্জির ভাটি এলাকা হিসেবে এই পানি ঢল হিসেবে নেমে এসেছে সিলেট অঞ্চলে। অতীতে এ ধরনের ধারাবাহিক বৃষ্টি খুব কম দেখা গেছে। চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, সেটা ছয় থেকে আট ঘণ্টার ভেতরে তাহিরপুরে চলে আসে। কিন্তু সিলেট অঞ্চলে এসে পানি তো আর দ্রুত নামতে পারে না। ফলে তখন সেটা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে বন্যা তৈরি করে। বন্যা প্রাকৃতিক বিষয় কিন্তু পানি নেমে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে বন্যার ভয়াবহতা বৃদ্ধির দায় সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রের।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার আত্মচরিত-এ ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের বন্যা সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রজাদের আবেদন গ্রাহ্য করিয়া যদি রেলওয়ের সংকীর্ণ কালভার্টগুলো বড় সেতুতে পরিণত করা যাইত, তবে এই বন্যা নিবারণ করা যাইত।...সম্প্রতি প্রসিদ্ধ জলশক্তি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার স্যার উইলিয়াম উইলকক্স যেসব বক্তৃতা করিয়াছেন, তাহার দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করিবার অসারতা প্রমাণিত হইয়াছে।’ ১৯২২ সালের বন্যা নিয়ে ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, বন্যার জন্য দায়ী নদী নয়, অতিবৃষ্টি নয়, দায়ী ব্রিটিশের তৈরি রেলপথ। স্থপতি ড. বেল্টলিকের মন্তব্য ছিল এ রকম, যেসব প্রকৌশলী ওই অঞ্চলে জেলা বোর্ড ও রেলওয়ের রাস্তাগুলো নির্মাণ করেছেন, তারা এ দেশের স্বাভাবিক পানিনিষ্কাশনের পথগুলোর কথা ভাবেননি। বন্যার কারণ বাংলার নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত করে তৈরি রেলপথগুলো।
১৯০৭ সালে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকায় লেখা হয়, রেললাইন বাঁচাতে গিয়ে দামোদরের পূর্বপাড় বরাবর বাঁধ নির্মাণের পর বর্ধমান ও হুগলি জেলার জলাভূমিগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। ১৯১৭ সালে তৈরি করা হয় হাওড়া-বর্ধমান কর্ডলাইন। এভাবে ১৯ শতকের মধ্যভাগ থেকে নদ-নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে শাখা নদ-নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফল ১৯৪৩ সালে দামোদরের ভয়াবহ বন্যা, যার তোড়ে দামোদরের বাঁধ, জিটি রোড ও রেললাইন ভেঙে গিয়ে কলকাতা উত্তর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শাখা নদ-নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে বালুতে ঢেকে ও মজে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতি এখন আরও তীব্র হয়েছে। নদী দখল, দূষণ, খালগুলোকে ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, বন ধ্বংস ও উজাড় করে ফেলা, নদীর নাব্য কমে যাওয়ার সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভয়াবহ বন্যা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কৃষিফসল বিনষ্টের ফলে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশ মূলত প্লাবনভূমি, বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে পানি এবং পলি দিয়ে। এই ভূখণ্ড গড়ে ওঠার ইতিহাস হচ্ছে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া পানি আসবে, আবার তা বেরিয়ে সমুদ্রে যাবে। এই আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়া বা বন্ধ করা তো এই ভূখণ্ডের গড়ে ওঠার নিয়মের পরিপন্থী। প্রকৃতিকে জয় করা মানে প্রকৃতিকে পরাজিত করা নয়, বরং প্রকৃতির নিয়ম জেনে তাকে মানুষের কাজে লাগানো। এটা উপেক্ষিত হয়েছে বারবার।
বাংলাদেশকে বলা হতো নদীমাতৃক দেশ। দেশ জুড়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া শত শত নদীর দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এখন দেশের বুক চিড়ে অসংখ্য রাস্তা আর নদীর বুকে অসংখ্য সেতু। দেশকে এখন সেতুমাতৃক দেশ বললেও অতিরঞ্জন হবে না।
বাংলাদেশের জনগণের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই জাতির অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ়তা লক্ষণীয়। নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের কারিগরি কুশলতা, পদ্মার মতো গভীর, তীব্র স্রোত সম্পন্ন এবং ভাঙনপ্রবণ নদীকে নিয়ন্ত্রণ করে সেতু নির্মাণসম্পন্ন করার দক্ষতা প্রশংসনীয়। সেতুর ওপর চলবে গাড়ি। যদিও ভাড়া বাড়বে তবুও সহজ হবে মানুষের যাতায়াত, জিডিপিতে প্রভাব পড়বে এবং দেড় শতাংশ বাড়বে বলে হিসাব করা হচ্ছে। কিন্তু পদ্মা সেতু বৈষম্য কমাবে কি না সে কথা কেউ বলছেন না। যমুনা সেতু হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের কৃষকের দুর্দশা যেমন কমেনি, পদ্মা সেতুর প্রভাব তেমন হোক এটা জনগণ চায় না। পদ্মা সেতু নির্মাণের সাফল্য সরকার দাবি করুক, কিন্তু সুফল যেন জনগণ পায় সেটাই তো কাম্য হওয়া উচিত। দৃশ্যমান সাফল্য স্থায়ী হোক, সঙ্গে সঙ্গে জনগণের অদৃশ্য শত্রু শোষণ ও প্রকাশ্য ফলাফল যে বৈষম্য তা যেন দূরীভূত হয়Ñ সেটাই গণমানুষের আশা।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
