পদ্মা সেতুর মন

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১২:১৭ এএম

পদ্মা সেতুর মন আজ বেশ ফুরফুরে। হবেই না বা কেন? কত চড়াই-উতরাই, কত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি পার করে আজ সে যৌবনে পা দিতে যাচ্ছে আজ তার উদ্বোধন। একটু পরেই প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আসবেন আর তার হাত ধরেই সে আজ যুক্ত করতে যাচ্ছে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষকে, তার হাত ধরে একটু পরেই জয় করতে যাচ্ছে সে প্রমত্তা পদ্মাকে। আজ তার অনেক গর্বও লাগছে, কারণ তাকে জন্ম দিতে গিয়ে এই দেশের মানুষকে শুনতে হয়েছিল কত অবজ্ঞার কথা, অনেকে তো তার জন্ম হোক এটাও চায়নি। সেজন্য অন্যায়ভাবে দুর্নীতির অভিযোগও চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল কেউ কেউ। এই সব কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে সে। আর তাই সেও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তার ওপর দিয়ে যত গাড়ি যাবে, যত মানুষ যাবে সবাইকে সে বুকে আগলে রেখে পার করে দেবে। সে শুনেছে এতদিন মানুষ কত কষ্ট করে ফেরি বা লঞ্চে করে নদী পার হতো। একটা ফেরির জন্য কত মানুষ অপেক্ষা করত, কত কাঁচা সবজি-ফল নষ্ট হয়ে যেত, তার ওপর লঞ্চে বা স্পিডবোটে পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের প্রাণহানি হতো। কিছুক্ষণ পরেই এই সব কষ্টের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। আজ তার উদ্বোধন, সবাই খুব খুশি, সাজ সাজ রব আজ পদ্মার পাড়ে। আজকের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে সবার কত আয়োজন। যদিও সব কিছু এমন ছিল না...।

পদ্মা সেতুর আজ খুব মনে পড়ছে সেই দিনের কথা যখন তাকে জন্ম দেওয়ার জন্য প্রথম পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেটা ছিল ১৯৯৭ সাল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথম পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে এই সেতু জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা নেন। এরপর ২০০৪ সালে ফিসিবিলিটি স্টাডি করা হয় যেখানে কনসালট্যান্ট ছিল জাইকা। তারা মাওয়া পয়েন্টকে পদ্মা ব্রিজের জন্য নির্বাচন করেছিল। ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই স্টাডি রিপোর্টের অনুমোদন দেন এবং শুরু হয় মূল নকশা প্রণয়নের কাজ। যেদিন তার মূল নকশার কাজ শুরু হয় সেদিন থেকেই তার চাওয়া ছিল যেন সুন্দর একটা চেহারা তার দেওয়া হয়। কিন্তু সে জানত না যে, অনেকেই চায় না তার জন্ম হোক। একদিন সে শুনতে পেল, তার নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক টাকা দিতে চাইলেও হঠাৎ করে তারা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আসল। তারা বলতে শুরু করল যে, এই সেতুর নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে। সে বোঝে না যে, যেখানে কোনো টাকাই ছাড় হয়নি বা কাজ শুরু হয়নি সেখানে কীভাবে দুর্নীতি হতে পারে? সেদিনটা ছিল তার জন্য অনেক হতাশার, অনেক কষ্টের, শুধু তার জন্যই নয় পুরো দেশবাসীর জন্যও ছিল কষ্টের। সে ভেবেছিল একদিন তার নির্মাণ হবে, প্রমত্তা পদ্মাকে সে পাড়ি দেবে কিন্তু এখন সে ভাবছে তার কি আদৌ জন্ম হবে নাকি পরিকল্পনাতেই সে শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু না, তা হয়নি, তা হতে দেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একজন মা যেমন আপ্রাণ চেষ্টা করেন তার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে তেমনি সবাই যখন চাইছিল পদ্মা সেতুর জন্ম না হোক, বিশ্বব্যাংক যখন বলে দিল তারা টাকা দেবে না তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহস করে বলেছিলেন ‘আমাদের টাকায়ই হবে পদ্মা সেতু’। সেদিন তার মনে হয়েছিল যে কীভাবে একজন মানুষ এত আত্মবিশ্বাসী হয়। আসলে এই দেশের মানুষগুলোই এমন। হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ-কষ্ট সব সহ্য করতে পারে কিন্তু দেশের সম্মানে যখন কেউ বিন্দুমাত্র আঘাত করে তখন এই মানুষগুলোই জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে। ঠিক যেমন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদাররা যখন এই দেশের ওপর আঘাত হেনেছিল তখন নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর ভরসা করেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’ ওই এক কথাতেই এই নিরস্ত্র মানুষগুলোই হয়ে উঠেছিল এক একজন যোদ্ধা, যারা মুক্ত করেছিল এই দেশ। সেই ১৯৭১ সাল যেন ফিরে এসেছিল আবার ২০১৪ সালে, বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ তুলে পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশকে ছোট করতে চেয়েছিল তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দেশের মানুষের ওপর, দেশের বিশেষজ্ঞ-প্রকৌশলীদের সামর্থ্যরে ওপর ভরসা করে নিজেদের অর্থায়নে এই সেতু তৈরি করার কাজ শুরু করেন। একটা সাহসী কথা, একটা সাহসী স্বপ্ন, একটা সাহসী সিদ্ধান্ত যে মানুষকে কতটা অনুপ্রাণিত করতে পারে, গত আট বছর তা দেখল পুরো দেশ, পুরো পৃথিবী। পদ্মা সেতু আজ এক বাস্তব অস্তিত্ব।

নিজের জন্মের এই পুরো প্রক্রিয়া এখনো তার মনে পড়ে। শুরু থেকেই তাকে নির্মাণ করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়াররা অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েছিল। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার ছিল পদ্মা নদী নিজেই। পদ্মা এমন এক খরস্রোতা নদী যার তুলনা করা চলে একমাত্র আমাজান নদের সঙ্গে। এই খরস্রোতের একটা বড় কারণ হলো গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি একসঙ্গে এসে মিলিত হয় আরিচায়, যেখানে নদীর প্রশস্ততা যথাক্রমে ১৪ কিমি এবং ৬ কিমি প্রায়। অন্যদিকে মাওয়া প্রান্তে পদ্মার প্রশস্ততা ৬ কিমি প্রায়। অর্থাৎ ২০ কিমি প্রশস্ততায় প্রবাহিত পানি পার হচ্ছে ৬ কিমির একটা চ্যানেল দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এই স্থানে নদীতে স্রোত থাকে বেশি এবং স্রোতের কারণে নদীর তলায় আচমকা ৫০-৬০ ফুট বা তারও বেশি বালি/মাটি ধুয়ে চলে যেতে পারে যেকোনো সময়। এমন একটা নদীতে তাকে নির্মাণ করার সময় তার এক একটা পিয়ারের (পিলার) নিচে ১০ ফুট ব্যাসের ৬ থেকে ৭টি পাইল দিতে হয়েছে। যেগুলো ক্ষেত্রবিশেষে নদীর তলদেশ থেকে ১০০ থেকে ১২২ মিটার পর্যন্ত চলে গিয়েছে। এই পাইলগুলো কিছুটা কোনাকুনিভাবে প্রবেশ করানো হয়েছিল যাতে ভারসাম্য নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া ভূমিকম্পের সময় যাতে তার কোনো ক্ষতি না হয় সে জন্য ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। এছাড়া দুই স্প্যানের সংযোগস্থলে যে বিয়ারিং বসানো হয়েছে তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।

প্রমত্তা পদ্মা নদী যাতে এই সেতুর নিচ দিয়েই প্রবাহিত হয় সে নিশ্চয়তার জন্য নদীশাসন করা হয়েছে নিখুঁতভাবে গাণিতিক বিশ্লেষণ করে। কিছুদিন আগে বিশেষজ্ঞ দল এসেছিল, তাদের আলোচনার কিছু কিছু তার কানেও এসেছে, তারা নাকি এই সেতুর আয়ু ১০০ বছর ধরেছে। এই ১০০ বছর সেতু কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে তার পরিপূর্ণ একটা গাইডলাইনও তারা দিয়েছে। কিন্তু তার রক্ষণাবেক্ষণের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে সে নিশ্চিত যে, যদি সঠিকভাবে কেউ সেটা পালন করে তাহলে সে ১০০ বছর পরেও আরও অনেক বছর পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে মানুষের সেবা দিতে পারবে। তার ওপর দিয়ে যে শুধু সড়ক চলাচল হবে তা নয়, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও থাকছে এখানে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাইলগুলো মাটিতে প্রবেশ করানোর সময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী হ্যামার ব্যবহার করতে হয়েছিল। আর এই পুরো ব্যাপারটিতে যারা সাহায্য করছিল তারা হলো মূল কাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ লিমিটেড’, নদীশাসনের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ‘সিনোহাইড্রো’ এবং আমাদের দেশের প্রকৌশলী আর এই সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দল। তারা যে পরিমাণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল এবং সেগুলো যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে তা প্রকৌশলবিদ্যার জন্য বড় একটি শিক্ষা। কারণ, সব সমস্যার সমাধান বইয়ে ছিল না বরং প্রকৌশলী আর বিশেষজ্ঞরা তাদের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা দিয়ে সেগুলো কাটিয়ে উঠেছেন। 

আজ উদ্বোধনের পরই তার ওপর দিয়ে গাড়ি চলবে, যাত্রী বা মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অল্প সময়ে চলে যাবে এটা ভাবতেই তার ভালো লাগছে। সে এখন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমন্বয় সাধনে ভূমিকা রাখবে। কারণ, এর ফলে দেশের দুটি বন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলার মধ্যে সরাসরি সড়ক সংযোগ তৈরি হলো। তার কারণে পণ্য পরিবহনে সময় কমে যাবে, খাদ্যদ্রব্য ও সবজি আগে ফেরি পারাপারের দীর্ঘ সময়ে নষ্ট হয়ে যেত কিন্তু এখন আর তা হবে না, রেললাইনের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ স্থাপন হলে অল্প সময়ে অনেক যাত্রী ও মালামাল পরিবহন হবে যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা পুরো দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

লেখক সহকারী অধ্যাপক, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বুয়েট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত