নিন্দুক ও হতাশাবাদীদের মুখে ছাই দিয়ে অবশেষে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক তার শেষ কর্মদিবসে এককভাবে একটি বানানো অভিযোগ উঠিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রস্তাবিত ১.২ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন বাতিল করায় যে জটিলতা দেখা দেয় তাতে এর বাস্তবায়ন প্রায় তিন বছর পিছিয়ে যায়। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সেতু নির্মাণের আমদানি করা উপকরণসমূহের দাম বেড়ে যায়। এর ওপর নদীশাসন, অতিরিক্ত গভীরতম পিলার স্থাপন এবং কারিগরি ও ইকোলজিক্যাল জটিলতায় প্রকল্পের খরচও বেশ বেড়ে যায়। এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই স্বদেশের অর্থে এই মেগা প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করায় বাংলাদেশের আত্মশক্তির উত্থানের এক নয়া ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।
বাড়ন্ত প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে যেভাবে দিতে পেরেছে তাতে আমাদের ম্যাক্রো-অর্থনীতির শক্ত অবস্থানের জানান দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে এই সাহসী সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পেরেছিলেন এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তিনি নেতৃত্বের দৃঢ়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাই পদ্মা সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আমরা দেখছি তা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। পদ্মা সেতু শুধু বাঙালির আবেগ ও অহঙ্কারের প্রতীক নয়। এটি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির এক অনন্য লড়াইয়ের স্মারকও বটে।
এর ফলে দক্ষিণ বাংলার একুশটি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে। পরিবহন খরচ কমবে। যাতায়াতে সময় বাঁচবে। কৃষক ন্যায্যমূল্যে তার পণ্য বিক্রি করতে পারবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কম খরচে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং বেশি দামে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবে। ঢাকায় কল-কারখানায় যারা এখন কাজ করছেন তারা তাদের নিজেদের গ্রামে-গঞ্জে ছোটখাটো কারখানা গড়ে তুলবেন। এই এলাকাতেও সরকার তাঁতিপল্লী গড়ে তুলছে। নার্সিং কলেজ গড়ে উঠছে। শিবচরে বিরাট আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠতে শুরু করেছে। পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটতে শুরু করেছে।
এতে দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যবহার বাড়বে বলে অর্থনৈতিক দক্ষতাও বাড়বে। মোংলা ও পায়রা বন্দরের সক্ষমতাও বাড়বে। রেল সংযোগ হয়ে গেলে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। অর্ধেক সময়ে যশোর হয়ে কলকাতা পৌঁছানো যাবে। শরিয়তপুরের জাজিরায় নতুন শহর গড়ে ওঠার সব প্রস্তুতি চোখে পড়ছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে ফরিদপুরের নানা এলাকায় নগরায়ণের গতি বাড়বে। তাছাড়া এই অঞ্চলে পাটের উৎপাদনের ঐতিহ্য বেশ ভালো। তাই এই এলাকায় আরও আধুনিক পাটশিল্পের বিকাশের বেশ সম্ভাবনাও রয়েছে। বরিশাল ও খুলনায় জাহাজভাঙা ও নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট এই সেতুর ওপর দিয়ে যাবে বলে নতুন করে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়বে। এসবের প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপর পড়বে।
একটি হিসাবে জানা যায়, প্রতি বছর দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ৩.৫ শতাংশ বাড়তি জিডিপি যুক্ত হবে। জাতীয় জিডিপিতে এখনই যুক্ত হবে ১.২৬ শতাংশ। এরপর তা দেড় থেকে দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেতুর ওপর দিয়ে রেল যুক্ত হওয়ার পর তা জাতীয় জিডিপিতে আরও এক শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করবে। প্রতি বছর দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় অন্তত পক্ষে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই এলাকায় এখন জাতীয় গড় থেকে পাঁচ শতাংশ বেশি দারিদ্র্যের হার। পদ্মা সেতু চালু হলে বছরে ১.০৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমতে থাকবে। দেশের মোট শ্রমশক্তির ১.২ শতাংশের কাজ জুটবে এই সেতুর কারণে।
ইন্টারনেট প্রাপ্তির কারণে ফ্রিলান্সিংসহ ডিজিটাল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। যশোরের আইটি পার্কের ব্যাপ্তি বাড়বে। এই অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল গড়ে উঠবে। সেতুর ওপারে সাংহাইয়ের মতো আধুনিক শহর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পরিকল্পিত উপায়ে এই এলাকায় কিছু সরকারি অফিস আনতে পারলে এখনই নগরায়ণ নয়া মাত্রা পাবে। কলকাতা বিমানবন্দরের কাছেই যেমন রাজারহাটের মতো নয়া স্মার্ট শহর গড়ে উঠেছে এই সেতুর ওপারেও তেমনটি ঘটা সম্ভব। বিশেষ করে শরীয়তপুরের চরাঞ্চলে নয়া পর্যটক-বান্ধব রিসোর্ট গড়ে উঠবে। প্রশিক্ষণ জোরদার করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা থেকে বিদেশে কাজ করার জন্য অনেক তরুণ-তরুণী এখনই প্রস্তুত। সেজন্য সরকারকে কিছু প্রণোদনা আলাদা করে দিতে হবে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণ তহবিল, স্টার্টআপ তহবিলের একটি অংশ আলাদা করে ওই অঞ্চলের জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ করা যেতে পারে।
দক্ষিণ বাংলায় যে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশের জমির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হারে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে। একমাত্র বরিশালেই প্রায় এক হাজার নতুন এসএমই গড়ে উঠবে বলে স্থানীয় চেম্বার জানিয়েছে। উত্তর বাংলায় বঙ্গবন্ধু সেতু যেমন ঐ এলাকার অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করেছে পদ্মা সেতুও তেমনি দক্ষিণ বাংলার অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করবে। ইতিমধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। এই এলাকাকে এশীয় হাইওয়ে তথা সারা দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বিত করে পদ্মা সেতু অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন করবে বাংলাদেশে।
পরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত অবকাঠামো বরাবরই এমন রূপান্তরবাদীই হয়ে থাকে। এই সুদূরপ্রসারী প্রভাববিস্তারী মেগাপ্রকল্পটির ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ প্রভাবগুলো হিসেবে নিলে পদ্মা সেতুর ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন ১৮ থেকে ২২ শতাংশ হবে। ত্রিশ বছরের মধ্যেই এই সেতু বাবদ পুরো বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে। আর এটিকে সিকিউরিটাইজ করে পুঁজিবাজারে নিতে পারলে জিরো-কুপন বন্ড বা গ্রিন বন্ড চালু করা গেলে প্রবাসীরা বিদেশি মুদ্রায় প্রচুর বিনিয়োগ করবেন। এই অর্থ দিয়ে আরেকটি পদ্মা সেতু গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আমাদের বহিঃঅর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করতেও পদ্মা সেতুর আবেগকে খুবই মুনশিয়ানার সঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চয় রয়েছে। এখন দেখার বিষয় আমাদের নীতিনির্ধারকরা এর সুযোগ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিতে পারেন। আমার বিশ্বাস যে নেত্রী সাহস করে দেশের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন তিনি নিশ্চয় একে ঘিরে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের যে সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে তারও সদ্ব্যবহার করার উপযুক্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই নীতি-দক্ষতার ওপর নিশ্চয় আমরা ভরসা করতে পারি।
সবশেষে এ-কথাটি বেশ স্পষ্ট করেই বলা চলে যে বাংলাদেশ তার মতো করে স্বতন্ত্র এক স্ব-উন্নয়নের কৌশল দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে। সেই কৌশলের ভিত্তি হচ্ছে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রধানত নিজের সম্পদের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিকে জাতির মননে গেঁথে দেওয়া। তার মানে এই নয় যে আমরা বিদেশি সাহায্য উপেক্ষা করছি। সুবিধাজনক শর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সাহায্য আমরা অবশ্যই নিচ্ছি। তবে তা আমাদের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের আলোকেই নিচ্ছি। বিশেষ করে চলমান সংকটকালে এই সহায়তাও আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গেই নিয়েছি এবং এখনো নিচ্ছি। তবে বরাবরই নজর রাখছি আমাদের মতো করে উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নের দিকে।
কৃষি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানির ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়ার এই আত্মবিশ্বাসের পরম্পরায় পদ্মা সেতু এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে যুগের পর যুগ। ‘আমরাও পারি’স্লোগানের বহিঃপ্রকাশ বিপুলভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণের উপাখ্যানের অংশ হয়ে থাকবে চিরদিন। শত প্রতিকূলতা পায়ে দলে সাহসের সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই জাতীয় মনোভাব অক্ষুণœ থাকুক সেই প্রত্যাশাই করছি।
লেখক : উন্নয়ন সমন্বয়-এর সভাপতি ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
