বৈশ্বিক মাপকাঠিতেও উঁচুমানের সেতু

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০৫:৫০ এএম

প্রথমত হচ্ছে, একটা সেতু নদীর এপারকে ওপারের সঙ্গে সংযুক্ত করে। নদীটি যদি প্রশস্ত হয়, তাহলে নদী পারাপার নৌকা কিংবা ফেরির মাধ্যমে। পারাপারের ব্যবস্থা নদীর প্রশস্ততা ও প্রবহমান স্রোতের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং নদীর দুই পাড়ের কোন কোন পয়েন্টকে সংযুক্ত করছে, তার দূরত্বের ওপরে নির্ভর করতে হয়। আগে যেমন আরিচা থেকে নগরবাড়ী, অনেক দূর ঘুরে ফেরিতে যেতে হতো। চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যেত। একটা সেতু নির্মিত হলে নদীর এপার থেকে ওপারের পয়েন্টে সরাসরি যোগাযোগ হয় এবং এই নির্বাচনের সময় দেখা হয় যাতে এ থেকে যে উপকার পাওয়া যাবে সেটি যাতে অপটিমাম হয়। অর্থাৎ এর সঙ্গে খরচের তুলনায় নদীর স্থায়িত্ব ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়, যাতে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।

পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে স্থান নির্বাচন, কোথায় এই সেতুটি হবে। কারণ পদ্মা নদী হচ্ছে পৃথিবীর দুটি প্রধান নদীর যোগফল। ভারত থেকে যে গঙ্গা নদী এসে রাজশাহীর পাশ দিয়ে আরিচা পর্যন্ত আসে, এই গঙ্গা নদী পৃথিবীর ১০টি বড় নদীর মধ্যে অন্যতম; আর ব্রহ্মপুত্র নদী যেটা ভারত থেকে এসে আরিচা পর্যন্ত আসে, যদিও দেশের বড় একটি অংশে একে যমুনা বলা হয়, আমার কাছে এটা ব্রহ্মপুত্র। আর রাজশাহী অঞ্চলে ওই নদীটাকে পদ্মা বলা হলেও আমার কাছে তা গঙ্গা। সেই গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থল হচ্ছে আরিচা অথবা গোয়ালন্দ। সেখান থেকে এই দুটো নদীর পানি যখন ভাটির দিকে আসে, তখন নদীটার প্রশস্ততা হয়তো ব্রহ্মপুত্রের তুলনায় কম, কিন্তু তার শক্তি হয়ে গেল দ্বিগুণ। প্রশস্ততা আপেক্ষিকভাবে ব্রহ্মপুত্রের তুলনায় কম হওয়ার কারণে নদীটা অত্যন্ত গভীর।

আমরা যখন সেতুর জন্য নদীতে স্থান খুঁজি, তখন এপার-ওপারে কোনো জায়গায় করলে উপকার সবচেয়ে বেশি হবে, অথবা উপকারটাকে একটা বিবেচনায় আনা যেতে পারে এবং সেতুর স্থায়িত্বটা এই দুটো পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি চিন্তা করি। এখন আরিচার পরে যত দূর পদ্মা নদী প্রবাহিত হলো, এর মধ্যে মাওয়া পয়েন্টে নদী একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাওয়ার অংশে বা মাওয়া করিডরে মাটির একটু নিচে, মানে ১৫-২০ ফুট নিচ থেকেই শক্ত মাটির স্তর শুরু হয়েছে। এতে ভূতাত্ত্বিক জরিপের সময় বোঝা গেছে, সেখানে এই শক্ত মাটির অংশে প্রচুর গাছের গুঁড়ি আছে। হয়তো কয়েক লাখ বছর আগে এখানে বন থাকতে পারে, কিংবা কোনোভাবে এই কাঠগুলো এসে কাদামাটিতে আটকে গিয়ে পাথরে পরিণত হয়েছে। এটা কোনো জায়গায় ১০০ ফুট, কোনো জায়গায় ৫০ ফুট গভীর।

আমরা আরও লক্ষ করলাম যে, নদীটি পূর্ব থেকে পশ্চিম, আবার পশ্চিম থেকে পূর্বে নড়াচড়া করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় মাওয়ার কাছে এসে ওটা থেমে যায়। অর্থাৎ পশ্চিমদিক থেকে পুবদিকে আসছে, নদীটা তার চ্যানেলের মধ্যখান থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। তারপর তীরে আসে। কিন্তু মাওয়ায় এসে থেমে যায় শক্ত কাদামাটির স্তরের জন্য। কাজেই এ সেতুটা এখানে করলে প্রকৃতির, অর্থাৎ শক্ত মাটির সুযোগটা পাওয়া যাবে। যে কারণে নদীর তীরটা ঠিক করা হলো মাওয়া স্থানে যেখানে ফেরিঘাট ছিল, তার কাছাকাছি। আর এই যে একটু আগে বললাম, নদীর এক পাড় ভেসে চলে, কিছুদিন পর থেকে অন্য পাড় ভেসে যায়, মানে পদ্মার মতো নদীর ক্ষেত্রে এবং সে পশ্চিম পাড়ে পৌঁছায়।

পদ্মা নদী মাওয়ার কাছে ৬ কিলোমিটারের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে। পদ্মা সেতু যখন নির্মাণ শুরু হয় ২০১৬-১৭ সালের দিকে, তখন নদীটা একেবারে পুবঘেঁষে ছিল এবং পদ্মা ও তার উজানে বিক্রমপুরে বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙছিল। এরপর দু-তিন বছর ধরে দেখছি পদ্মাটা একটু পশ্চিম দিকে যাচ্ছে এবং এ মুহূর্তে বোধ হয় দেড়-দুই কিলোমিটার দিয়ে মূল প্রবাহ প্রবাহিত হচ্ছে। এর মূল প্রবাহের প্রশস্ততা থাকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার। তাহলে যে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে নদীর ব্যাপ্তি, তার তিন কিলোমিটার যদি নদী হয়, তাহলে বাকি তিন কিলোমিটার হচ্ছে চর। সেতু নির্মাণের সময় আমরা দেখলাম মাদারীপুর অঞ্চলে চর জানাযাত। বিশাল এক চর যার প্রশস্ততা দুই থেকে তিন কিলোমিটার, দৈর্ঘ্য ১০-১২ কিমি এবং যেটা অনেক দিন ধরে স্থায়ী হয়ে থাকার কারণে ওটার ওপরে তিনতলা ঘরবাড়ি,  ইউনিয়ন পরিষদ অফিস গড়ে ওঠে, হাইস্কুল গড়ে ওঠে, বহুলোক সেখানে বাড়িঘর করা শুরু করে।

এখন নদীটা পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। আমার ধারণা চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ওই চরগুলো পুরোটা নদী গর্ভে চলে যাবে এবং নদী একেবারে পশ্চিম দিকে গিয়ে উপস্থিত হবে। সেটাকেই আমরা নির্ধারিত করে নদীর জন্য সীমানা নদীকে বুঝিয়ে দিই, বুঝিয়ে পূর্ব পাড়ে চার কিলোমিটারের মতো নদীরক্ষা বাঁধ, নদীশাসন বাঁধ, আর পশ্চিম দিকে সাড়ে ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীশাসন বাঁধ করা হয়েছে। নদীটাকে আমরা ভবিষ্যতে তার গতিবিধি বুঝে, তার ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি না করে, নদীর প্রয়োজন অনুযায়ী তার প্রশস্ততা রেখেছি। তবে যেহেতু নদীর প্রশস্ততা খুব বেশি কিন্তু যে অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়, সেটা খুব বেশি প্রশস্ত নয়, সে কারণে এর গভীরতা বেশি।

পদ্মার এই গভীরতাই বোধ হয় পৃথিবীতে নদীর সবচেয়ে বেশি গভীরতা। স্রোতও অত্যন্ত বেশি। স্রোতের পরিমাণ প্রতি সেকেন্ড সাড়ে ৪ মিটার, তার মানে প্রতি সেকেন্ডে ১৪-১৫ ফুট। এই চিন্তা সামনে রেখেই আমরা নদী ব্যবস্থাপনার ডিজাইন সম্পন্ন করেছি। সেতু নির্মাণের সময়ও একই ফ্যাক্টরগুলো বিবেচনায় আনা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় প্রায় ৮০ হাজার লোকের কাছ থেকে জমি নিতে হয়েছে। তাদের পুনর্বাসন এবং এর পরিবেশগত যেসব চিন্তাভাবনা, যাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয়, নির্মাণকাজে যে ১০-১২ হাজার লোক কাজ করবে তাদের যে প্রতিক্রিয়া, তারা তো প্রচুর বর্জ্য উৎপাদন করবে, তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষা সবকিছুকে বৈশ্বিক সবচেয়ে উচ্চমানের বিবেচনায় রেখে ডিজাইন করা হয়।

ডিজাইন সম্পন্ন করার পর বিশ্বব্যাংক তাদের বিশেষজ্ঞ দিয়ে এসব পরীক্ষা করায় এবং পুরো প্রজেক্টকে পরীক্ষা করে। বিশ্বব্যাংক যখন বলছিল, তখন এসব পরীক্ষায় এটাকে সন্তোষজনক লেভেলে পাওয়া যায়। কাজেই বিশ্বব্যাংক চলে গেলেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন বিশ্বব্যাংক জড়িত থাকলে যে মান বজায় রাখা হতো, সেই মান যেন বজায় থাকে। সমস্যা হলো, দেশীয় প্রকল্প হলে পরিবেশের বিষয়টা মোটেই দেখা হয় না। যেমন : বন্যার সময় কথা উঠেছে মিঠামইনের ওই রাস্তাটা কীভাবে নির্মিত হলো? এটা অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের আইন, ১৯৯৭ সালের রুলস ও রেগুলেশন অনুযায়ী এটা নির্মিত হওয়ার কথা না। কিন্তু পদ্মা সেতু বাংলাদেশের আইন তো বটেই, বৈশ্বিক মাপকাঠিতেও অত্যন্ত উঁচুমানের নির্মাণকাজ হয়েছে।

কন্সট্রাকশনের মালামালের মধ্যে সেতুর স্টিল প্রধানত চীন থেকে এসেছে। কংক্রিটের স্ট্রাকচারের সিমেন্ট দেশ থেকেই সংগৃহীত হয়েছে। বালুও অধিকাংশই দেশ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। ইনফোসিং মাল, মানে পিয়ারের মধ্যে যে রড তা দেশে স্পেশাল ডিজাইন করে ও তার গুণগত মান রক্ষা করে গৃহীত হয়েছে, পাথর সংগৃহীত হয়েছে ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে। কিন্তু গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো জায়গাতেই কম্প্রোমাইজ করা হয়নি।

আমি এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলাম, সেটা আমার জন্য গর্বের বিষয় এবং যমুনা সেতুর অভিজ্ঞতা এখানে প্রচুর কাজে লেগেছে। সেতুর কাজ তো সব শেষ হয়নি। রেলসেতুর কাজ বাকি আছে। রাস্তা সেতু শেষ হয়েছে। নদীশাসন আরও এক বছর লাগবে। তারপর যত দিন এই সেতু কাজ করতে থাকবে, নদীর দিকে কীভাবে নজর রাখতে হবে এবং নদী যদি উল্টাপাল্টা কোনো ব্যবহার করে, তাহলে কী ধরনের কারিগরি ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটার দলিল তৈরি চূড়ান্ত হয়েছে, কিন্তু এখনো অনুমোদন হয়নি। নদীশাসনের ঠিকাদার কাজ শেষ হওয়ার পর তারাই তদারক করবে দুই বছরের মতো। তারপর কারা তদারক করবে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী কাজ হবে, আমার এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ যমুনা সেতুর ক্ষেত্রেও ওই মাপকাঠিতে কাজ হচ্ছে। কাজেই আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজে রেলওয়ের প্রকৌশলীরা গত ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে সেতুটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

লেখক : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানিব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত