সড়কপথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সংযুক্তির মাধ্যমে পদ্মা সেতু দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করল। এই সেতুর ফলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক মাত্রার পরিবহন ও যাতায়াত যুগে the great connectivity age) প্রবেশ করছে।
পদ্মার দুই পাশের জনপদের বাধনহীন সংযোগ মূলত আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি কার্যকর একীকরণ ঘটাবে, যার ফলে উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রম ও মূলধনের গতিশীলতা বাড়বে। দেশের এক জায়গার সফল ব্যবসা কৌশল, কারিগরি জ্ঞান, কর্মের মাধ্যমে লব্ধ দক্ষতা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়বে।
ভৌগোলিক আকারে তুলনামূলক ছোট হওয়ায় এবং ভাষা, বর্ণ ও মূল্যবোধ নির্বিশেষে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ভেদাভেদ না থাকায় আমাদের দেশের অঞ্চলগুলোর নিবিড় সম্পৃক্তকরণ অনেক সহজ। এ ক্ষেত্রে যাতায়াত ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। আমাদের ১৮ কোটি লোকের দেশে এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়েছে। এর সঙ্গে গভীরতর আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা নতুন মূলধনের জোগান বাড়াবে। পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের কার্যকর একীকরণ উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বিরাট ভূমিকা রাখবে, যা অধিকতর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়।
উৎপাদন প্রবৃদ্ধি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসর ঘটাতে অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে বিদ্যুৎ আর বড় সেতু আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য যাচাইয়ে যে স্টাডি হয়েছিল, সেখানে যথার্থই প্রতিফলিত হয়েছিল যে এই মাইলফলক অবকাঠামো বাংলাদেশের জাতীয় আয়কে অন্তত শতকরা ২.১ ভাগ বাড়াবে। আর শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোট উৎপাদন শতকরা ৫০ ভাগ বাড়বে। এর সঙ্গে অবশ্যই অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জমির দাম দেশের পূর্বাঞ্চলের চেয়ে কম, মজুরিও তুলনামূলকভাবে কম। এর সঙ্গে যোগ হবে পদ্মা সেতুর ফলে ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়া পরিবহন খরচ আর সময়। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই এলাকায় বিনিয়োগ অধিতর লাভজনক হবে।
এ কথা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায় যে, এই সেতুর অন্যতম প্রথম এবং প্রধান প্রভাব পড়বে পর্যটনশিল্পের ওপর। মূলত যাতায়াত ও পরিবহন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সেভাবে কাছে টানতে পারেনি। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, যার ফলে অনেকেই এখন বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যেতে চান। আমরা দেখতে পারব যে শিগগিরই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে হোটেল-মোটেল এবং রেস্তোরাঁর কর্মকাণ্ড বাড়বে আর এর সঙ্গে আসবে নতুন কর্মসংস্থান।
কৃষিপণ্য সরবরাহ সহজ হবে আর কৃষকদের উপযুক্ত দাম পেতে এই সেতু একটি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি, উৎপাদন খরচ কম হওয়া এবং পরিবহন-যাতায়াতে সময় ও দুর্ভোগ লাঘবে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে নতুন বিনিয়োগের আকর্ষণীয় স্থান। সরকার সারা দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে দেশি-বিদেশি পুঁজি আহরণের জন্য। এগুলোর মধ্যে ১৭টি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ভাগে হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থায় এ সেতু বাংলাদেশকে যুক্ত করবে। ট্রান্স-ন্যাশনাল হাইওয়ে ও ট্রান্স-ন্যাশনাল রেলওয়ের মাধ্যমে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সড়কপথে বাণিজ্য করা সম্ভব হবে। এশিয়া মহাদেশ বর্তমানে সারা বিশ্বের সামগ্রিক উৎপাদনের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ জোগান দেয়, যা সামনের দশকে অর্ধেকের বেশি হবে। অদূর ভবিষ্যতে এশিয়া হয়ে উঠবে পৃথিবীতে বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ট্রান্স-এশিয়ান কানেকটিভিটির গুরুত্ব অপরিসীম।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পাল্টাতে শুরু করেছে। চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব হওয়ার কারণে পশ্চিমা দুনিয়া এবং জাপান চেষ্টা করছে বিশ্বের উৎপাদন এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক চীনকেন্দ্রিক না রেখে বরং বহুমুখী করা। কভিড অতিমারীর পরপরই এটা স্পষ্ট হয়েছিল যেকোনো একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জোগান ব্যবস্থাপনাকে বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা ইউরোপের জন্যও একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে, অনেক বৈশ্বিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরবরাহের বিকল্প উৎস খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে। গার্মেন্টস শিল্প এরই মধ্যে বাংলাদেশকে একটি বড় সরবরাহকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং আশা করা যায় যে সামনের দিনগুলোতে দেশে আরও অধিক পরিমাণে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে।
বর্তমানে আমাদের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অবশ্যই রপ্তানি খাতে আমাদের সফলতা আছে কিন্তু এই রপ্তানির আকার আরও বড় হওয়া খুবই জরুরি। রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যের প্রসারের জন্য আমাদের মোংলা এবং পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয়তাকে কাজে লাগাতে হবে। পদ্মা সেতু সে ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখবে। এই সেতু মোংলার সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমিয়ে দিয়েছে, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আর্থিক ও সময়ের সাশ্রয় সুবিধা দিতে পারবে।
উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় অনেক সময় আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি হয়। দেখা যায়, কোনো একটি এলাকা কোনো বিশেষ কারণে প্রথমে অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং যতই এর উৎপাদনের আকার বাড়তে থাকে ততই সে অর্থনীতির মাত্রা (বপড়হড়সরবং ড়ভ ংপধষব) আর সমষ্টি অর্থনীতির (ধমমষড়সবৎধঃরড়হ বপড়হড়সরবং) সুবিধা নিয়ে তার গুরুত্ব আরও বাড়াতে থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশ এবং বিশেষ করে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা তাদের সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আঞ্চলিক সুষম বণ্টন বিশ্বের সব দেশের নীতিনির্ধারকদের চিন্তার কারণ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে, সব সময় যোগাযোগ অবকাঠামো এবং শ্রম ও মূলধনের অবাধ গতিশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭০ ভাগ আসে বৃহত্তর ঢাকা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আর উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম জেলাসমূহের অবদান শতকরা ৩০ ভাগের মতো। দেশের শিল্পজাত রপ্তানির শতকরা ৯২ ভাগ আসে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভারীশিল্প নেই বললেই চলে। এই আঞ্চলিক বৈষম্য ঘুচাতে পদ্মা সেতু একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আগে উল্লিখিত যে ১৭টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে করা হচ্ছে, তার মধ্যে কয়েকটি শিগগিরই কার্যক্রম শুরু করতে পারলে, প্রবৃদ্ধির আঞ্চলিক বণ্টন অনেকাংশে পাল্টাতে পারে। পদ্মা সেতুকে ভিত্তি করে ঢাকা থেকে মোংলা পর্যন্ত একটি বড় অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আরও ব্যাপক উন্নয়ন করা সম্ভব।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ সাফল্য ও সুফল প্রশ্নাতীত। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, এই সেতু একটি বৃহত্তর উন্নয়নের প্রস্তুতি। কিন্তু এখান থেকে কতখানি সুবিধা আমরা রপ্ত করতে পারব তা নির্ভর করবে আমাদের অন্যান্য নীতি ও প্রজ্ঞা আর ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ওপর। ভালো যোগাযোগ উন্নয়ন মানে ঢাকার পরিবহন অবকাঠামোর ওপর আরও চাপ বাড়বে। এর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে যে পরিমাণ সময় সাশ্রয় করা সম্ভব তা অর্জন করা যাবে না। আবার, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে হলে সেতুর পাশাপাশি আনুষঙ্গিক নীতি সহায়তার প্রয়োজন। তা হতে পারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ইত্যাদি। এ বিষয়গুলোকে সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে আশু কর্মপন্থা প্রস্তুত করে তার কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। পদ্মা সেতু যে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তার সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষণা পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং চেয়ারম্যান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট
