যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক তিনি। ঢাকার মেট্রোরেল ও হাতিরঝিল প্রকল্পসহ অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিআরটি, এমআরটি ও সাবওয়ে প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। রাজধানীর হাতিরঝিলের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার এবং কুড়িল মোড়ে দেশের প্রথম ‘ইন্টারচেঞ্জার’-এর প্ল্যানার তিনি। দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত এই বিশেষজ্ঞ নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ‘পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল’ এবং ‘কর্ণফুলী মেগা কন্টেইনার টার্মিনাল’-এর প্ল্যানার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ বাকি দেশের যোগাযোগব্যবস্থার নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন পুরকৌশলের
অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিনদেশ রূপান্তর : পদ্মা সেতু চালুর কারণে রাজধানী ঢাকায় বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে সরকার নানামুখী পরিকল্পনা করছে। সাভার থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত উড়ালসড়ক এবং ঢাকা মহানগর ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে ঢাকার ভেতরে সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল নিয়ে। আন্তঃজেলা এই বাস টার্মিনালগুলো কি এখানেই থাকবে না সরিয়ে নেওয়া হবে। রাজধানীতে অতিরিক্ত পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে আর কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
ড. এম শামসুল হক : প্রথমেই বলব সাভার-কেরানীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ উড়ালসড়ক এবং ঢাকার চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। একটা রাজধানী এবং এমন মেগাসিটিকে ঘিরে এমন বাইপাস ও সার্কুলার রোড মূল সিটিকে অপ্রয়োজনীয় যানবাহনের চাপ থেকে রক্ষা করে এবং দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করে। আর বাস টার্মিনালের বিষয়ে আমি যতটুকু জানি যে ঢাকার আশপাশে জায়গা খোঁজা হচ্ছে নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য। কিন্তু এখানে কিছু বিষয়ে আলোচনা দরকার। কারণ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মূল মহানগরের বাইরে হবে এটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আমরা গণপরিবহনের সমস্যাটা বুঝি না দেখে আগে সমস্যাটা তৈরি করি আর এরপর সেটা সমাধানের পথ খুঁজি, বিনিয়োগের চিন্তা করি। বিশ্বের যেকোনো বড় মহানগর এমনকি একালের সবচেয়ে পুরনো মহানগর লন্ডনে গেলেও দেখা যাবে একদম নগরকেন্দ্রেই বাস টার্মিনাল থাকে। কিন্তু তারা আমাদের মতো এত মেগা টার্মিনাল তারা করে না। এদেশে আমরা মুখে বলছি টার্মিনাল। আসলে এগুলো একইসঙ্গে বাসের ডিপো বা পার্কিংয়ের জায়গা, মেরামতের ওয়ার্কশপ সবই। এমন ঘটার কারণ হলো, শত শত কোম্পানির অসংখ্য বাসের এই মালিকরা ছোট বিনিয়োগকারী। তাদের কেউই নিজের বিনিয়োগে পার্কিং বা ওয়ার্কশপ তৈরির ক্ষমতা রাখেন না। এসব কারণে পিক টাইমে টার্মিনালগুলোতে যানজট লেগে যায়, বাস ঢুকতে-বেরুতে পারে না। আমাদের মনে হয় টার্মিনালগুলোতে জায়গা হচ্ছে না। আমরা দেখি টার্মিনালগুলোর কারণে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতেও যানজট লেগে যায়।
এখানে আসল কারণটা কিন্তু টার্মিনাল নয়, গণপরিবহনের পরিকল্পনা ও পরিচালনা নীতির সমস্যা। নগরের গণপরিবহনই বলি বা আন্তঃজেলা গণপরিবহন আসল সমস্যাটা হলো হাজার হাজার পরিবহন মালিক আর হাজার হাজার বাস কোম্পানি। আমরা যদি ঢাকায় এবং সারা দেশে একটা-দুইটা কিংবা অল্প কয়েকটা কোম্পানির গণপরিবহন ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি করে পরিচালনা করতে পারতাম তাহলে এই সমস্যা থাকত না। ইংল্যান্ড-লন্ডনে এখনো সারা দেশে একটাই পরিবহন সেবা ন্যাশনাল এক্সপ্রেসওয়ে। এমন সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সবাই সেবা দেয় এবং যার যার মুনাফার অংশ বুঝে নেয়। ফলে এক বাসের সঙ্গে আরেক বাসের কোনো প্রতিযোগিতাও থাকে না এবং সে কারণে কোনো বিশৃঙ্খলাও থাকে না।
অন্যদিকে, ঢাকা বা এমন মেগাসিটি থেকে টার্মিনালগুলো বাইরে ঠেলে দিলে কী হবে? মানুষ বিভিন্ন জেলা থেকে সেসব টার্মিনালে আসবে এবং তারপর নিজের কিংবা ভাড়া করা ছোট ছোট পরিবহনে চড়ে মূল মহানগরের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে বাধ্য হবে এবং তখন মহানগরের ভেতরে বাড়তি যানজট তৈরি হবে। তাই টার্মিনাল মহানগরের ভেতরেই হওয়া উচিত। কিন্তু সেটাকে ডিপো-ওয়ার্কশপ বানানো যাবে না। ছোট ছোট টার্মিনাল হবে এবং সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো ছাড়া এক মিনিটও বাস দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। অবস্থাটা হলো আমরা উপসর্গটা দেখি রুট কজ বা আসল কারণগুলো বুঝি না। যে কারণে সায়েদাবাদের মতো মেগাটার্মিনাল বানিয়েও আমরা জায়গা দিতে পারছি না, সমস্যাটা সমাধান করতে পারি না। যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে যেমন এই সমস্যা তেমনি পণ্যবাহী ট্রাক-লরির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। মহানগরে ট্রাক না ঢুকলে আমরা খাব কী, বাসাবাড়ি বানাব কী করে? অথচ ঢাকা মহানগরে এখনো কোনো ট্রাক-লরির ডিপো নেই। সব রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। যারা নগরপরিকল্পনা করেছেন তার এসব সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা ছাড়াই সেটা করেছেন। সমস্যাটা নীতিনির্ধারণী জায়গায়, পরিকল্পনায়।
দেশ রূপান্তর : পদ্মা সেতু হয়ে চলাচলের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলের ২১ জেলার সবগুলোতে নতুন বাস সার্ভিস চালু করতে যাচ্ছে সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। বেসরকারি পরিবহন কোম্পানিগুলোও পদ্মা সেতু হয়ে পুরনো ও নতুন নতুন রুটে বেশি সংখ্যক বাস চালু করার চিন্তা করছে। পদ্মা সেতু এক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে সেটি কাজে লাগাতে এই আন্তঃজেলা পরিবহন সেবাকে কীভাবে ঢেলে সাজানো যেতে পারে বলে মনে করেন?
ড. এম শামসুল হক : পদ্মা সেতু অবশ্যই এক বিরাট সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এই ধরনের সুযোগ সবসময়ই অগণিত ছোট ছোট বিনিয়োগ তৈরি করে। কিন্তু সেটা পরিকল্পিতভাবে করা না হলে নতুন সমস্যার তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রে যে সমস্যার কথা বলেছিলাম এখানেও সেটা আছে। হাজার হাজার মালিক আর হাজার হাজার বাস কোম্পানি এখানে ব্যবসা করছে। আর এখন যে চাইছে তাকেই যদি নতুন রুট পারমিট দিয়ে দিই তাহলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, ধাক্কাধাক্কি হবেই আর সে কারণে বিশৃঙ্খলাও বেড়ে যাবে। সম্ভাবনার জায়গাটা হলো, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন এই করিডোরে একটা ভার্জিন গ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে। সরকার চাইলে সেটা কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে নিয়েই দেশের প্রথম আন্তঃজেলা সমন্বিত বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করার চেষ্টা চালাতে পারে। এটা সরকারি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণে যৌথভাবে হতে পারে। পদ্মা করিডর দিয়ে এমন একটা একক বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি করা হলে সেটা হবে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। এখন আমরা যদি আবারও বিজ্ঞান না বুঝে একটা সিঙ্গেল করিডরকে সবার ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করে দিই তাহলে পুরনো পথেই হাঁটা হবে এবং বারবার আমরা নতুন করে পুরনো সমস্যারই পুনরাবৃত্তি করতে থাকব। আমি সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাব এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে। আমরা যাতে পদ্মা সেতুর এই ভার্জিন গ্রাউন্ডের সুযোগটা হেলায় হারিয়ে না ফেলি।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব হয়ে গেছে মাত্র ১৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ এখন ঢাকার সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দর মোংলা। এদিকে পদ্মা সেতু এবং পটুয়াখালীর পায়রা সেতু হয়ে বাকি দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পায়রা বন্দরও। এতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পণ্যপরিবহনের চাপও এই রুটগুলোতে অনেক বেড়ে যেতে পারে। পদ্মা সেতু হয়ে এই দুই বন্দরের সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. এম শামসুল হক : ঢাকার নিকটবর্তী বন্দরের যে কথা আপনি বলছেন সেক্ষেত্রে আমার মূল্যায়ন একটু ভিন্ন। মোংলা বন্দরের অনেক ইনহেরেন্ট উইকনেস আছে। আসলে একটা নদীবন্দর, সমুদ্র থেকে অনেক ভেতরে। এখানে বড় জাহাজ আসে না। এখন সেখানে লাইট কার্গো ভেসেলগুলোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে। পায়রাও আসলে একটা নদীবন্দর, সেখানে নাব্য সংকট আছে। তবে সেখানে বিশেষ ধরনের নানা পণ্য আসবে। আমি বলতে চাই চট্টগ্রামের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা। সেটার ঘোষিত উদ্দেশ্যই হলো দূরত্ব কমিয়ে পরিবহন খরচ কমিয়ে আনা। সেখানে মাদার ভেসেল ভিড়বে। ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন মাত্রা তৈরি হবে। একবারে পণ্য বোঝাই করেই সেটা ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে পারবে। সিঙ্গাপুর বা শ্রীলঙ্কা হয়ে যেতে হবে না। ফলে মাতারবাড়ীতে যে বিশাল বিনিয়োগ হচ্ছে সেটার আকর্ষণ ব্যবসায়ীদের কাছে সবসময়ই বেশি থাকবে বলে মনে করি। পাশাপাশি বে-টার্মিনাল হচ্ছে, পতেঙ্গায় টার্মিনাল হচ্ছে। প্রত্যেকটা সেবা সমুদ্রের কূলে। এছাড়া চট্টগ্রামে আছে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল আর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। সঙ্গে যুক্ত হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। ফলে দূরত্বের হিসাবে মোংলা ও পায়রা ঢাকা থেকে কাছে হলেও কৌশলগতভাবে চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরগুলো আর কনটেইনার টার্মিনালগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশিই হবে। এখন সরকারের উচিত হবে চট্টগ্রাম মহানগরকে কীভাবে দ্রুতগতির অবকাঠামো দিয়ে কানেক্ট করা যায় সেই উদ্যোগ নেওয়া। একইসঙ্গে এখন মোংলা ও পায়রা বন্দরের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নতুন কাঠামো নির্মাণ এবং সংযোগ চ্যানেলগুলোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবগুলো রুটে সবগুলো বন্দরের সম্ভাবনাই কাজে লাগাতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : পদ্মা করিডর দিয়ে মোংলা-পায়রা বন্দর, চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর, বে-টার্মিনাল এবং চট্টগ্রামের কনটেইনার ডিপোগুলোর যে সক্ষমতা সেসবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কি রাজধানী ঢাকা প্রস্তুত? এখন কি রাজধানী ঢাকা কিংবা আশপাশে নতুন কোনো কনটেইনার ডিপো নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কি? কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় আসলে কী কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার?
ড. এম শামসুল হক : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। ঢাকা এবং আশপাশের ইপিজেডগুলো এবং অন্যান্য শিল্প-কারখানার র-মেটেরিয়াল কনটেইনারে করে ঢাকায় আসে এবং ফিনিশড প্রোডাক্ট ঢাকা থেকে বন্দরগুলোতে যায়। কিন্তু ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) ক্ষেত্রে কেন জানি না বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো আগ্রহ দেখি না। অথচ কনটেইনার পরিবহন করে রেলওয়ের যে আয়ের সম্ভাবনা আছে সেটা ঈর্ষণীয় পরিমাণ বেশি। যাত্রী বহন করে রেল আয় করতে পারছে না। অনেক যাত্রী টিকিট ছাড়া যাতায়াত করে। এছাড়া রেলওয়েতে এখন যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে সেটা তুলে আনতে, ঋণ পরিশোধ করার জন্য আয় বাড়াতে কনটেইনার পরিবহনে রেলওয়ের আরও অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।
দ্বিতীয়ত কনটেইনার ব্যবস্থাপনা আমূল ঢেলে সাজানো দরকার। সারা পৃথিবী চলে যে নিয়মে আমরা সে নিয়মে চলি না। কনটেইনার সমুদ্রপোতে উঠবে, বন্দরে নামবে রেলে উঠবে। রেল চলে যাবে ইপিজেড বা এমন শিল্পাঞ্চলগুলোতে। কনটেইনার সেখানে সরাসরি নামবে। সেখানে থাকবে আইসিডি। আমরা কী করছি, কনটেইনার চট্টগ্রামে নামাচ্ছি, ঢাকায় নামাচ্ছি। একটা কনটেইনার ভেঙে তিনটা কাভার্ড ভ্যানে মালামাল তুলছি। সেসব মহাসড়ক আর শহর-বন্দরের রাজপথ দিয়ে কারখানায় যাচ্ছে। এটা টেকসই উন্নয়নের পথ না। আপনি সঠিকভাবেই বলেছেন যে এখন ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো নির্মাণ আর কনটেইনারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এমন সব মিসিং লিংকগুলো দূর করতে কৌশলগত নতুন অবকাঠামো তৈরি এবং ব্যবস্থাপনার নতুন যুগে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। নইলে আমরা এতসব বন্দরের বড় বড় বিনিয়োগ আর পদ্মা করিডরের সুফল যথাযথভাবে পাব না।
দেশ রূপান্তর : পদ্মা সেতু দিয়ে ২১ জেলায় যাতায়াতের জন্য আপনি আন্তঃজেলা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির সম্ভাবনার কথা বলছিলেন। কিন্তু পদ্মা করিডরের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমের গন্তব্যগুলো কিংবা উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোর নতুন কোনো বিন্যাস প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?
ড. এম শামসুল হক : পদ্মা করিডরের সুফল কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ঢাকার দিকে যেমন সাভার-কেরানীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ উড়ালসড়ক এবং ঢাকাকে ঘিরে সার্কুলার রোড নির্মাণের পরিকল্পনা আছে তেমনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও এমন কিছু পরিকল্পনা দরকার। পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেছে। দুই পাড়ের এক্সপ্রেসওয়ে চালু হচ্ছে। অর্থাৎ পদ্মা করিডরের ব্যাকবোন বা মেরুদন্ডটা খুবই এফিশিয়েন্টলি ফাংশনাল হতে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যখন এই ব্রডব্যন্ড নেটওয়ার্ককে ব্রাঞ্চিং করব বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একুশ জেলা আর উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে দেব সেখানে কিন্তু সমস্যা রয়ে গেছে। সেখানকার ২১ জেলার বেশিরভাগই ছোট ছোট রাস্তা, যেগুলো বেশিরভাগই ব্রিটিশ আমলের সিঅ্যান্ডবি রোড। তার ওপর সেখানে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে চলছে নসিমন-করিমন-ভটভটি-রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক-সিএনজি। রাস্তার ওপর হাটবাজার। এটা গেল একটা দিক। আরেকটা দিক হলো আমরা বলছি ওই ২১ জেলাকে এখন উন্নত করব। সেখানে নতুন নগর গড়ে তুলব। খেয়াল রাখা দরকার এটা করতে হলে ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন নতুন স্মার্ট সিটি তৈরি করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ করতে হবে। ফলে বর্তমান আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো সেই লোড নিতে পারবে না। এজন্য জেলা সদরসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে বাইবাস করে এবং নতুন সিটিগুলোকে কানেক্ট করে একটা নতুন সড়ক-মহাসড়কের নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আমরা যদি আলোচনাটা গুটিয়ে আনি তাহলে দেখা যাচ্ছে আপনি পাঁচটি উদ্যোগের কথা বলছেন সেগুলো পদ্মা সেতুর সর্বোচ্চ সুফল ত্বরান্বিত করতে পারে। এগুলো হলো ঢাকার চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা নিয়ে আন্তঃজেলা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা, মোংলা-পায়রা এবং চট্টগ্রামে বন্দরগুচ্ছের সংস্কার ও প্রয়োজনীয় নতুন কাঠামো নির্মাণ, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর নতুন ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের একুশ জেলা ঘিরে সড়ক-মহাসড়কের নতুন নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা করা।
ড. এম শামসুল হক : আসলে করণীয় আরও অনেক কিছুই আছে। কিন্তু এখনই এই পাঁচটা উদ্যোগ পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে পদ্মা সেতু কেবল অর্থনীতিতেই নয়, বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
