জমির দাম বেড়েছে ৫ থেকে ২০ গুণ

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১১:৪৮ পিএম

বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হচ্ছে আজ। পদ্মা নদীর কারণে একসময়ের বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত জনপদের মানুষ এখন সেই নদীর ওপর নির্মিত সেতু ঘিরে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন। এই সেতু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় শিল্প কল-কারখানা, অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প। তেমনি এ অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সেতুর কারণে ঢাকাসহ দেশের বাকি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় সেতুর পাশের এলাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় জমি কেনার ধুম পড়েছে। ফলে জমির দাম বেড়েছে বহু গুণ।

মুন্সীগঞ্জ : পদ্মা সেতু ঘিরে মুন্সীগঞ্জে সাধারণ মানুষের জীবনমানেও আসতে যাচ্ছে পরিবর্তন। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের সময় নজর কাড়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় যাতায়াতের সুবিধার কারণে এখানে বসতি স্থাপনে আগ্রহ বাড়ছে অনেকের। এরই মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, শ্রীনগর ও সিরাজদীখান উপজেলায় জমির দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের মতে, গেল ১০ বছরে জেলায় জমির দাম বেড়েছে অন্তত ৫ থেকে ২০ গুণ। এক্সপ্রেসওয়ের দুপাশে ফসলি জমিতে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের সারি সারি বিলবোর্ড দেখে ধারণা মেলেÑ এখানে আবাসনশিল্পের বিকাশ হতে চলেছে। পদ্মা সেতু ঘিরে এখানে জমি কেনাবেচার হিড়িক পড়েছে বেশ আগে থেকেই।

লৌহজং উপজেলার মেদিনীম-ল এলাকার সাজু রহমান বলেন, ‘আমার প্রতি শতক ফসলি জমির দাম ৫ বছর আগে ছিল ৮০ হাজার টাকা। বর্তমানে দাম উঠেছে আড়াই লাখ টাকা। আর কিছুদিন পর বিক্রি করব। কারণ লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে। সবাই চায় এখানে ভালো শিল্প-কারখানা, রেস্তোরাঁ, মার্কেট করতে।’

শ্রীনগর উপজেলার বীরতারা গ্রামের আরিফ হোসেন বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের পাশে এখন বিক্রির মতো জায়গা নেই। তাই একটু গ্রামের ভেতর গেলে নিচু জমি শতাংশ প্রতি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় কিনে ভরাট করে আমি বিক্রি করছি ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায়। ঢাকার আবাসন কোম্পানিগুলো সে জমিই ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা শতাংশ বিক্রি করছেন।

সিরাজদীখান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাসনিম আক্তার বলেন, পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হওয়ায় সিরাজদীখানে জমির দাম পাঁচ গুণ বেড়েছে। পদ্মা সেতু ঘিরে এখানে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল বলেন, ২০০৫ সালে পদ্মা সেতুর নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়। সে সময়ের হিসাব করলে বর্তমানে জমির দাম বেড়েছে ২০ গুণ। উপজেলায় মূল সড়কের পাশে যেসব জায়গা রয়েছে তার দাম প্রতি শতাংশ ৮ লাখ টাকার কম নয়।

শরীয়তপুর : শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার দলিল লেখক জাহাঙ্গীর চৌকিদার বলেন, ১০ বছর আগে পদ্মা সেতুর নিকটবর্তী নাওডোবা ও পূর্ব নাওডোবা এবং সেনেরচর ইউনিয়নে এক কড়া (দুই শতাংশ) জমির দাম ছিল ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই জমি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জাজিরা পৌরসভায় এক কড়া জমির দাম ছিল এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। পদ্মা সেতু হওয়ায় মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে সেই জমি এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকায়।

জাজিরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সিকদার মাসট্রেড নামে একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক মোবারক আলী বলেন, গার্মেন্টস পল্লী, কৃষক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, শ্রমিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কারিগরি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ১০০ বিঘা জমি কিনেছি। তবে জমি যে দামে কিনেছিলাম, তা থেকে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

জাজিরা পৌরসভার মেয়র মো. ইদ্রিস মাদবর বলেন, ‘আমার পৌরসভায় পাঁচ বছর আগেও যে জমির দাম ছিল প্রতি কড়া এক থেকে দেড় লাখ টাকা তা এখন বেড়ে ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা হয়েছে।’

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক মো. পারভেজ হাসান জানান, এখানে আমরা কৃষিভিত্তিক ইকোনমিক জোন করার পরিকল্পনা শুরু করেছি। বেসরকারিভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের লক্ষ্যে এখানে জমির চাহিদা ও দাম বহু গুণ বেড়েছে।

কুয়াকাটায় পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ আগ্রহে বেড়েছে জমির দাম

পটুয়াখালী : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পর্যটন ব্যবসায় নতুন করে বিনিয়োগ আগ্রহে কুয়াকাটায় হঠাৎ করে বেড়ে গেছে জমির দাম। পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে দাম বেড়েছে কলাপাড়া-কুয়াকাটা মহাসড়কের দুই পাশের জমিরও। এক দশক পর জমির এমন মূল্যবৃদ্ধিতে খুশি জমির মালিকরা।

আবাসন ব্যবসায়ীসহ জমির মালিকরা জানান, ২০০৬ সালে যে জমির দাম ছিল ১ লাখ টাকা, ২০১০ সালে তা দাঁড়ায় ৬ লাখ টাকায়। ২০১৩ সাল থেকে জমি কেনাবেচায় প্রয়োজন হয় সরকারি অনুমতির। কমতে থাকে জমি কেনাবেচা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ বেড়েছে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের। আবার বাড়ছে জমির দাম।

দক্ষিণ কুয়াকাটার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ২০২০ সালে তিনি প্রতি শতাংশ জমি বিক্রি করেছেন সাড়ে ৪ লাখ টাকা। পাশেরই অবশিষ্ট জমি বর্তমান দর ৭ লাখ টাকা। কিছুদিন অপেক্ষা করলে এ দাম আরও বাড়বে।

শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মা সেতুকে ঘিরে এরই মধ্যে মাদারীপুরের শিবচরে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় জমির দাম বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। বিশেষ করে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশের জমির দাম আকাশছোঁয়া।

সরেজমিনে গিয়ে গত ২৩ জুন পদ্মা সেতুসংলগ্ন শিবচরের বাংলাবাজার ঘাট, কাঁঠালবাড়ী, কুতুবপুর, পাচ্চর, মাদবরের চর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ বছরে ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়কের পাশের জমির দাম ১৫ থেকে ২০ গুণ বেড়েছে।

এদিকে পদ্মা সেতুকে ঘিরে মাদারীপুরে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার একর জমি। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বদলে যাবে এ জেলার চিত্র। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে কলকারখানা গড়ে তুলতে জমি কিনছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

কাঁঠালবাড়ী ও কুতুবপুর এলাকায় জমি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ইউনুছ মোল্যা নামে এক যুবক বলেন, প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে জমির বাজার মূল্য সরকার নির্ধারিত দরের ১২ থেকে ১৫ গুণ বেশি।

কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের বাগিয়া গ্রামের বাহাদুর খান বলেন, ১০ বছর আগে যে জমির দাম ছিল ১০ হাজার টাকা শতাংশ, এখন তা ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সুবিধাজনক স্থানে জমি পাওয়া যায় না। অনেক জমি অধিগ্রহণ হওয়ায় এলাকায় বিক্রি করার মতো জমি কমেছে।

কুতুবপুর এলাকার যুবক হায়দার আলী বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ সুবিধা বাড়ায় শিবচরের এক্সপ্রেসওয়ের দুপাশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জমি কিনে রেখেছেন। অনেকে অবকাঠামো নির্মাণও শুরু করেছেন। এখন আর কেউ জমি বিক্রি করতে রাজি নন। কিন্তু জমি কিনতে ঘুরছেন অনেকে।

মাদারীপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাফিজুর রহমান যাচ্চু খান বলেন, পদ্মা নদীর কারণে একসময় মাদারীপুর ছিল অবহেলিত এক জনপদ। পদ্মা সেতু ঘিরে উদ্যোক্তারা এখন দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শিবচর উপজেলায় বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেতু ঘিরে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র বদলে যাবে। এখান থেকে মোংলা বন্দর এবং পায়রা বন্দর কাছে হওয়ায় গড়ে উঠবে কলকারখানা, বাড়বে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মামুনুর রশীদ খোকা (মুন্সীগঞ্জ), ছগির হোসেন (শরীয়তপুর), জাহিদ রিপন (পটুয়াখালী) ও রফিকুল ইসলাম, শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত