সেতুর সঙ্গে খুলল কর্মসংস্থানের দুয়ার

আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ০৫:৪৮ এএম

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলাকে জুড়ে দিল পদ্মা সেতু। এখন থেকে এই জেলাগুলো থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে আগের থেকে দুই-আড়াই ঘণ্টা কম সময় লাগবে। নদী পার হওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে বসে থাকতে হবে না যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী গাড়িগুলোকে। এতে ওই অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। কমে আসবে পণ্য পরিবহন ব্যয়। গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ পাবেন অনেকে। বদলে যাবে সেখানকার কর্মীদের ভাগ্য। গতকাল শনিবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে স্বপ্নের পদ¥া বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে কর্মসংস্থানের বিশাল এই সম্ভাবনার দুয়ার খুলল বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।

দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতুকে ঘিরে দুই পাড়ে নির্মাণকাজ বাড়বে ২৯ শতাংশ। পদ্মার ওপারের কৃষিতে সাড়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। পাশাপাশি পরিবহন খাতে কাজ বাড়বে ৮ শতাংশ। এর প্রভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি লোকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘এই সেতুর কারণে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ের যোগাযোগ বাড়বে। এশীয় হাইওয়ের সঙ্গেও যুক্ত হবে সেতুটি। এটি চালুর পরপরই ওপারে নতুন করে প্রতি বছর ২-৩ লাখ কর্মসংস্থান হবে। জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করবে দক্ষিণ বাংলার অর্থনীতিকে।’

জানা গেছে, পদ্মা সেতুর সঙ্গে ওই অঞ্চলের অনেক অবকাঠামো উন্নত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আতিউর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর সঙ্গে দক্ষিণ বাংলার রাস্তাঘাট, টোল প্লাজাসহ সবকিছুতে বড় রকমের উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এসব উন্নয়ন বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে এবং বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।

যমুনার ওপর দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারের এই সেতু উত্তরের জেলাগুলোর সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করে। ফলে বগুড়া বা রংপুরের কৃষক সকালে ক্ষেত থেকে যে সবজি তোলেন, মধ্যরাতে তা ঢাকায় পৌঁছায়। রাজশাহীর মৎস্যচাষিদের তাজা রুই মাছ রাজধানীর বাজারে বাজারে বিক্রি হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে উত্তরের মতো ফসলের বাড়তি দাম পাওয়া যাবে বলে মনে করেন দক্ষিণের কৃষকরা। তাদের এই আশার দিকটি উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সমীক্ষায়।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব বা ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন (ইআরআর) দাঁড়াবে বছরে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে সেটা বাড়তে পারে।

আশা করা হচ্ছে, পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর ও পদ্মা লিংক রেল এই তিনটি দক্ষিণাঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাবে। দেশের প্রধান অর্থনীতির সঙ্গে পায়রা ও মোংলা বন্দরের সুফল যুক্ত হবে। সেখানে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

পদ্মার ওপারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলা, ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জসহ মোট ২১ জেলার ৩ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। এ অঞ্চলে বেসরকারি বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা জাজিরা প্রান্ত থেকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ঘিরে এবং আশপাশের এলাকায় জমি কিনে হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেট নির্মাণ শুরু করেছেন।

পদ্মা সেতুর ওপারে সংযোগ সড়ক থেকে ভাঙ্গা উপজেলার তিনদিকে তিনটি রাস্তা চলে গেছে। এর একটি বরিশাল, একটি খুলনা অংশে, আরেকটি রাজবাড়ী, যশোর, বেনাপোলে। এ তিনটি সড়ক যুক্ত হবে মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে। ফলে তিন বন্দর দিয়েই আমদানিপণ্য দ্রুত ঢাকাসহ শিল্পাঞ্চলগুলোয় প্রবেশ করতে পারবে। এখানেও কাজ পাবে নতুন অনেক কর্মী।

রপ্তানিপণ্যের লিড টাইম (ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে পণ্য তৈরির পর রপ্তানি করতে যে সময় লাগে) কমে আসবে। ফলে দ্রুত ব্যবসার মুনাফা পাওয়া যাবে। অর্থের চলাচল বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে বহুমুখী খাত। সেতুর মাওয়া অংশ থেকে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করবে। ফলে সারা দেশ থেকে কাজের জন্য কর্মীদের ওই ২১ জেলায় অভিবাসন করার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণ বাংলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে পদ্মার ওই পারে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি এপারের জেলা বিশেষ করে ঢাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। ওই পারের ২১ জেলা থেকে আগের থেকে দ্রুত সময়ে পণ্য ঢাকায় এলে সেগুলো বিপণনে নতুন ব্যবস্থাপনার দরকার হবে। ফলে পদ্মা সেতুর সুফল ঢাকার কর্মীরাও ভোগ করবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনুসর বলেন, পদ্মা সেতুর তাৎক্ষণিক সুফল হলো যোগাযোগটা বেড়ে যাবে। এতে ওই পারের লোকজন কৃষিজ পণ্য দ্রুত ঢাকায় এনে বিক্রি করতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে সেখানে নতুন নতুন শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ বাড়বে। আর বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

‘তবে পদ্মার ওপারে কোন ধরনের শিল্প খাতের সম্ভাবনা বেশি তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। গার্মেন্ট খাতের সম্ভাবনা আছে। সেখানে পণ্য বানিয়ে মোংলা বন্দর থেকে বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। তাছাড়া ভারতের সঙ্গেও আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। সেখানেও বিপুল পরিমাণ লোকের কাজের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পদ্মার ওপারের লোকদের কাজের জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে আসতে হবে না,’ যোগ করেন এই গবেষক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত