ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠে থাকেন চিকিৎসক দম্পতি আল্লা ভলোশিনোভিচ ও ভাদিম স্মিরনভ। তাদের বাড়ির সামনে একবার ভুল করে টেলিফোনের খুঁটি বসায় স্থানীয় প্রশাসন। এ নিয়ে চলছিল অশান্তি। চিকিৎসক দম্পতি অবশ্য জানতেন না, সেই খুঁটিই একদিন তাদের জীবন বাঁচাবে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
ভুল জায়গায় খুঁটি
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট শহর হোস্টোমেল। সেখানে এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাড়ায় থাকেন আল্লা ভলোশিনোভিচ ও ভাদিম স্মিরনভ নামে এক দম্পতি। দুজনই চিকিৎসক। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভুল করে একটি টেলিফোনের খুঁটি আল্লা ও ভাদিমের বাড়ির সামনে স্থাপন করে স্থানীয় প্রশাসন। ওই খুঁটির কারণে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। আল্লা ও ভাদিমের বাড়ির সামনের সরু মাটির রাস্তা ডান দিকে মোড় নিয়েছে। খুঁটির কারণে ওই মোড়ে গাড়ি চালাতে বেগ পেতে হয়। যারা আগে কখনো পাড়াটিতে যাননি, তারা দূর থেকে মনে করেন, খুঁটির জায়গায় বুঝি রাস্তাটি শেষ হয়ে গেছে, খুঁটির পরে ডান দিকের মোড় তাদের নজরে পড়ে না। কানাগলি ভেবে তাই তারা গাড়ি নিয়ে আর এগোন না। এ ছাড়া ভুল জায়গায় খুঁটি বসানোয় আল্লা ও ভাদিমের বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি যেতে সমস্যা হয়, অনেক সময় গাড়ির আরোহীদের তার আগেই নেমে যেতে হয়। খুঁটিটি সরাতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বেশ কয়েকবার অভিযোগ জানালেও কোনো লাভ হয়নি। ভুল জায়গায় বসানো খুঁটি নিয়ে অবশ্য খুশি চিকিৎসক দম্পতির প্রতিবেশীরা, কারণ খুঁটির বদৌলতে পাড়াটিতে গাড়িঘোড়ার চলাচল অনেক কমে যায়। এ নিয়ে কয়েক মাস পাড়ার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে আল্লা-ভাদিমের খিটিমিটি লেগেই ছিল। তবে টেলিফোনের ওই খুঁটি যে এক দিন তাদের জীবন বাঁচাবে, তা হয়তো কখনো ভাবেননি তারা।
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে প্যারাশুটে করে আল্লা-ভাদিমের বাড়ির কাছে আনতোনভ বিমানবন্দরে নামে রাশিয়ার সেনারা। কিয়েভ উপকণ্ঠের অন্য বাসিন্দাদের মতো ৫৫ বছর বয়সী আল্লাও রাশিয়ার হামলার বিষয়ে কিছু জানতেন না। বাড়িতে তখন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলেন ওই চিকিৎসক দম্পতি। পাশের ঘরে ছিল তাদের ১৪ বছর বয়সী ছেলে ইলিয়া স্মিরনভ। ভোরবেলা হঠাৎ মেয়ের ফোনে ঘুম ভাঙে আল্লার। কাছেই এক শহরে থাকেন আল্লা-ভাদিমের মেয়ে অ্যানাসটেসিয়া স্মিরনভ। তিনি ফোনে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আল্লাকে বলেন, ‘মা, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে!’ মেয়ের কথা শুনে আতঙ্কে বিছানা ছেড়ে উঠে বসেন আল্লা। স্বামীকে ঘুম থেকে তোলেন। আল্লা তখনই শহর ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার মনে হয়, যত দেরি হবে, তত বেশি স্বামী ও ছেলে নিয়ে শহর থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
হামলা শুরু
একসময় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় লুহানস্ক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন আল্লা ও ভাদিম। আট বছর আগে রুশভাষী অধ্যুষিত ওই অঞ্চল রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দখল করলে বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তারা। সঙ্গে ছিল ১৮ বছর বয়সী মেয়ে অ্যানাসটেসিয়া ও ছয় বছর বয়সী ছেলে ইলিয়া। আট বছর আগেকার সেই ঘটনা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় ৫৬ বছর বয়সী ভাদিমকে। তিনি চান না, আবারও ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিতে। তাই উদ্বিগ্ন স্ত্রীকে শান্ত হয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলেন তিনি। ভাদিমের ধারণা ছিল, রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালালে তা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। স্বামীর কথা শুনে দিন গুনতে থাকেন আল্লা। ছেলে ইলিয়াকেও নিশ্চিন্ত থাকতে বলেন ভাদিম।
তিন দিন পর ২৭ ফেব্রুয়ারি হোস্টোমেল শহরে ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রাশিয়ার সেনাবহর প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য, রাজধানী কিয়েভ দখল। খুব দ্রুত শহরজুড়ে দখলদারদের চেকপয়েন্ট বসে। নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যা ও বাড়িঘর লুটপাট শুরু হয়। হোস্টোমেল শহরের বিলাসবহুল ভবন দখল করে সেখানে ঘাঁটি বসায় রুশ সেনারা। ওইসব ভবনের প্রধান ফটকে তারা ভি চিহ্ন (রাশিয়ার সেনাবাহিনীর চিহ্ন) লিখে রাখে যাতে রাশিয়ার ট্যাংক সেসব ভবনে গোলাবারুদ না ছোড়ে। ওই দিন ঘরের জানালায় বাইনোকুলার হাতে আল্লা দেখেন, পুরো পাড়া কাঁপিয়ে তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে রাশিয়ার কয়েকটি ট্যাংক। ভুল জায়গায় বসানো সেই টেলিফোনের খুঁটির কাছাকাছি এসে হঠাৎ ট্যাংকগুলো থেমে যায়। অন্য অনেকের মতো ট্যাংকে থাকা সেনারা মনে করে, এটি কানাগলি। সামনে এগোনোর আর পথ নেই ভেবে তারা ট্যাংক ঘুরিয়ে ফেলে। যে খুঁটি নিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিবেশী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মন-কষাকষি চলছিল আল্লা ও ভাদিমের, সেই খুঁটিই শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচিয়ে দেয়। রুশ সেনারা সে সময় শহরে যাকে পাচ্ছে, তাকেই গুলি করছে। আল্লা-ভাদিমের প্রতিবেশীদের কয়েকজন প্রাণে বাঁচতে কাছের বন দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাদের একজনের মৃতদেহ পরে দেখতে পায় ওই চিকিৎসক দম্পতি। ২৭ ফেব্রুয়ারি আল্লা ও ভাদিম রুশ সেনাদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও আতঙ্কে দিন কাটতে থাকে তাদের। বাইরে কোনো শব্দ পেলেই বাইনোকুলার নিয়ে জানালায় দৌড়ে যেতেন তারা। আগ্রাসনের শুরুর দিকে ফোনে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর স্থানীয় ইউনিটকে রুশ সেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দিতেন ভাদিম। একবার ফোনে অস্বাভাবিক শব্দ পেলে তার সন্দেহ হয়, স্থানীয় ইউনিটের সঙ্গে ফোনালাপ হয়তো আড়িপেতে শুনছে হানাদার বাহিনী। এভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটানোর একপর্যায়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন ওই দম্পতি। খাবার-পানির যা মজুদ ছিল, খুব বেশি দিন যে চলা যাবে না, তা তারা বুঝতে পারেন।
অতঃপর পলায়ন
কিয়েভের উপকণ্ঠে হোস্টোমেল শহরে রুশ বাহিনীর একের পর এক গোলার আঘাতে কেঁপে কেঁপে উঠত বাড়িঘর। গোলার শব্দ পেলেই ল্যাপটপ আর হেডফোন নিয়ে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতেন আল্লা ও ভাদিমের ছেলে ইলিয়া। সেখানে অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও গেমস খেলে চারপাশের সত্যিকারের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে কাল্পনিক যুদ্ধে মনোনিবেশ করতেন তিনি। তার বন্ধুদের কেউ কেউ এরই মধ্যে পোল্যান্ডে পালিয়ে যায়। ইলিয়া বলেন, ‘যুদ্ধ গেমসের চেয়ে বাস্তব জীবনে বেশি ভয়ংকর। রুশ আগ্রাসনের প্রথম দিকে গোলার শব্দে খুব ভয় পেলেও পরে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই।’
এই চিকিৎসক দম্পতির মেয়ে অ্যানাসটেসিয়া স্মিরনভ একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। হোস্টোমেল থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে বুচা শহরে থাকেন তিনি। রাশিয়ার সেনাবাহিনী ইউক্রেনের যে কটি শহরে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তার মধ্যে বুচা অন্যতম। রুশ আগ্রাসন শুরুর দিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি কোনো মতে শহর ছেড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল ইভানো-ফ্রানকিভস্কে পালাতে পেরেছিলেন অ্যানাসটেসিয়া। আগ্রাসনের সপ্তম দিনে হোস্টোমেল শহরে যোগাযোগের সব টাওয়ার ধ্বংস করে দেয় রুশ বাহিনী। এতে বাইরের জগৎ বিশেষ করে মেয়ে অ্যানাসটেসিয়ার সঙ্গে একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আল্লা ও ভাদিম। পাশাপাশি দেখা দেয় খাবার ও পানির তীব্র সংকট। ১১ মার্চের দিকে তারা বুঝতে পারেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করে লাভ নেই, পালানোই শ্রেয়। ঘরে নগদ অর্থ যা ছিল সেসব ব্যাগে ভরে ইভানো-ফ্রানকিভস্কের দিকে রওনা দেন আল্লা ও ভাদিম। পথে অগণিত বুলেটবিদ্ধ ও আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া গাড়ি চোখে পড়ে তাদের। কয়েকজন ইউক্রেনীয় তাদের গাড়িতে রুশ ভাষায় ‘শিশু’ লিখে রেখেছিলেন এই আশায় যে, রাশিয়ার সেনাদের তা দেখে করুণা হবে, গাড়ির ভেতরে শিশু আছে জেনে গুলি ছুড়বে না। তাতে অবশ্য কোনো লাভ হয়নি। যুদ্ধবাজরা শিশুদের কথা ভাবলে পৃথিবীতে কখনো যুদ্ধই হতো না। হোস্টোমেল থেকে পালানোর সময় পথে অনেক পরিত্যক্ত বাড়ি দেখতে পান আল্লা ও ভাদিম, যেগুলোতে সপ্তাহ কয়েক আগেও লোকজন বসবাস করত। পরিত্যক্ত সেসব বাড়ি তখন রুশ সেনাদের দখলে।
রুশ চেকপয়েন্ট
রাস্তার দুপাশে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখতে দেখতে একপর্যায়ে রুশদের এক চেকপয়েন্টে চিকিৎসক দম্পতির গাড়ি থামে। ২০ বছর বয়সী এক রুশ সেনা জানতে চান, তারা কোথায় যাচ্ছেন। উত্তর শুনে গাড়িটি এগোনোর অনুমতি দেন তিনি। গাড়ি চলতে শুরু করলে আতঙ্কিত বোধ করেন আল্লা। চেকপয়েন্টে যেসব রুশ সেনা ছিল, তাদের আচরণ স্বাভাবিক লাগেনি তার। সেনারা তাদের যাওয়ার অনুমতি দেবে, তা বিশ্বাস হচ্ছিল না আল্লার। তার ভয় হয়, গাড়ি চলতে শুরু করার পর গুলি ছুড়বে সেনারা। একই ভয় পাচ্ছিলেন ভাদিমও। সে মুহূর্তে আতঙ্ক চিকিৎসক দম্পতিকে গ্রাস করলেও গাড়ির পেছনের সিটে বসা ছেলে ইলিয়াকে কিছুই বুঝতে দেননি তারা। রুশ আগ্রাসন শুরুর পর রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠের বাসিন্দারা শুনেছিলেন, রাশিয়ার সেনারা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলের পুরনো ম্যাপ ব্যবহার করার কারণে নতুন সড়ক তাদের বিভ্রান্ত করছে। এটি সত্যি না গুজব তা জানা না গেলেও ভাদিম সিদ্ধান্ত নেন, যুদ্ধের সরঞ্জামে পূর্ণ প্রধান সড়ক ব্যবহার না করে বাইসাইকেল চলার পথ, গ্রামাঞ্চল ও বনের পথ দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে মেয়ের কাছে যাবেন। গ্রামীণ এলাকার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারটি লক্ষ করে, পথের একদিকে রুশ সেনা ও অন্যদিকে ইউক্রেনীয় সেনারা যুদ্ধংদেহী অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে গোলাগুলি শুরু হয়ে যেতে পারে। উদ্বেগ-উত্তেজনা কাটিয়ে একসময় গ্রিন করিডরে পৌঁছে যায় ভাদিমের পরিবার। সেখানে ইউক্রেনের চেকপয়েন্ট দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তারা। আল্লা বলেন, ‘দেশের সেনাদের দেখে অনেক ভালো লাগছিল। অবশ্য একই সঙ্গে তাদের জন্য খারাপও লাগে। আমরা না হয় নিরাপদ স্থানে যেতে পারছি, তাদের তো সেখানেই থেকে দেশের জন্য লড়তে হবে।’
ঘরে ফেরা
২৮ মার্চ হোস্টোমেল শহর ছেড়ে চলে যায় রুশ সেনারা। এ খবর পেয়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দুই সপ্তাহের বেশি সময় অবস্থান করা আল্লার পরিবার বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। বাড়ি ফিরে তারা দেখেন, বেশির ভাগ জানালার কাচ গোলাবর্ষণে ভেঙে গেছে। এ ছাড়া দেয়ালে দেয়ালে গুলির গর্ত। অ্যানাসটেসিয়া বুচা শহরে না গিয়ে মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি ফেরেন। তিনি বলেন, ‘বুচা থেকে পালিয়ে ইভানো-ফ্রানকিভস্কে যাওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। সে সময় যে কী পরিমাণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কেটেছে, তা শুধু আমিই জানি। তাদের ইভানো-ফ্রানকিভস্কে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরি। ওই অঞ্চলে আগে কখনো যাইনি আমরা। নতুন জায়গায় তাই মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় আমাদের। অবশ্য সেখানে বিস্ফোরণ বা গোলাগুলির শব্দ ছিল না। এ কারণে প্রথম প্রথম অবাক হতাম।’ অ্যানাসটেসিয়ার বাড়ির কয়েক জায়গায় ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো রয়েছে। বাড়ি ফিরে তারা সেসব ক্যামেরায় রাশিয়ার সেনাদের কর্মকাণ্ড দেখেন। ভাদিম বলেন, ‘আমরা ১১ মার্চ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। ঠিক পরের দিন রুশ সেনারা আমাদের বাড়িতে হানা দেয়। ঘরের জিনিসপত্র তারা তছনছ করে, ড্রোনসহ ইলেকট্রনিকের জিনিসপত্র লুট করে। মদ খেয়ে শেষ করে। অবশ্য ক্যামেরায় সেগওয়ে (বৈদ্যুতিক পরিবহন যন্ত্র) থেকে এক সেনাকে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে দেখে বেশ মজা পাই।’ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে কদাচিৎ মদ খেতেন আল্লা। ইভানো-ফ্রানকিভস্কে থাকার সময় নিয়মিত মদ খাওয়া শুরু করেন তিনি। আল্লা বলেন, ‘ট্রমা কাটাতে শুরুতে ওয়াইন খেতাম। তবে দ্রুত ভোদকা খাওয়া শুরু করি কারণ এটি ওয়াইনের চেয়ে শক্তিশালী। এখন অবশ্য ভোদকা খেয়েও কোনো কাজ হয় না। এক মাসে যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেসব ভুলে যেতে চাই কিন্তু সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখলে বা সাইরেন শুনলে মনে পড়ে যায়, যুদ্ধ তো এখনো শেষ হয়নি। টিভি খুললেই আমার যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশকে দেখি, কান্না পায় তখন আমার।’
রাশিয়ার সেনারা হোস্টোমেল শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বেশির ভাগ ভবন মেরামতের অযোগ্য। শহরটিতে রাশিয়ার সেনাদের ৩৫ দিন অবস্থানের সময় ঠিক কতজন নিহত হয়েছেন, তা জানা যায়নি। তবে হোস্টোমেলের প্রায় ১৭ হাজার বাসিন্দাদের মধ্যে ৪০০ জন নিখোঁজ বলে দাবি করে ইউক্রেনের মানবাধিকার সংস্থা। ৭ মার্চ বাসিন্দাদের চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্য বিতরণ করছিলেন শহরটির মেয়র। সে সময় তাকে গুলি করে হত্যা করে রুশ সেনারা। কিয়েভ অঞ্চলে ১০টির বেশি গণকবরের খোঁজ পাওয়া যায়। ইউক্রেন কর্র্তৃপক্ষের দাবি, নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের অপহরণ ও নির্যাতন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনী।
বাড়ি ফিরে ক্ষতিগ্রস্ত আসবাবপত্র মেরামত করেন আল্লা ও ভাদিম। জানালায় নতুন কাচ লাগান। বাগান থেকে গোলার টুকরা সরিয়ে নেন। নতুন করে জীবন শুরুর চেষ্টা করেন ওই চিকিৎসক দম্পতি। বাড়ির সামনে ভুল জায়গায় বসানো সেই টেলিফোনের খুঁটি নিয়ে এখন তাদের কোনো অভিযোগ নেই। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হয়তো তারা টেলিফোন খুঁটিটি সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আরজি জানাবেন না।
