টি-টোয়েন্টির কারণে টেস্টে মনোযোগ কমে গেছে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০১:২০ এএম

পাকিস্তানের সঙ্গে ২৯১ বলে ৬০। উইন্ডিজের বিপক্ষে ২৩৪ বলে ৮৯, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৮৪ বলে ৬৭ ও ১৮১ বলে ৭১, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৩২ বলে ৫১; রাজিন সালেহ ছিলেন ধৈর্যশীল ব্যাটার। শিহাব উদ্দিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেস্ট ব্যাটিংয়ের নানা দিক জানালেন তিনি।

২২ বছর পর এখন কথা উঠছে আমাদের টেস্ট ঐতিহ্য তৈরি হয়নি। এর কারণ কী মনে করেন?

রাজিন : আমরা টেস্ট ঐতিহ্য তৈরি করতে পারি নাই। এর জন্য ক্রিকেটাররাই দায়ী। এখানে বোর্ড বা ম্যানেজমেন্ট তো থাকবেই কিন্তু দায় ক্রিকেটারদের বেশি। বোর্ড থেকে ১৫ দিন আগে জাতীয় লিগের প্রস্তুতি নিতে বলে। কিন্তু এই দায়িত্বটা কি বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাকে দেওয়া যায় না, বিভাগ আগে থেকে ক্রিকেটারদের প্রস্তুত রাখতে পারে না? বিভাগ তো প্রথম শ্রেণির জন্য ক্রিকেটারদের সঠিকভাবে তৈরি করছে না। এটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিকেটারদের ‘দায়’র কথা বলছিলেন। তা কীভাবে?

রাজিন : গত জাতীয় লিগে সিলেট একাডেমি মাঠের উইকেট নিয়ে সবাই সমালোচনা করল। মিটিং করা হলে সেখানে ক্রিকেটাররা অভিযোগ দিল পিচ ভালো না। যে উইকেট দেওয়া হবে আমাকে ওই উইকেটেই তো সার্ভাইভ করতে হবে তাই না। সিলেটের বিপরীতে একটা দল নাম বললাম না, একটা ম্যাচে আমাদের এবাদতের বল খুব বাউন্স করে ওদের ব্যাটসম্যানের গ্লাভসে আঘাত করে। তখন ওই দলের অধিনায়ক এসে বলে উইকেট ভালো না আমরা খেলব না। উইকেট ভালো না এটা তো কোনো অজুহাত হতেই পারে না। সে (এবাদত) ভালো বল করছে সেটা কেউ বলছে না। আমাদের ক্রিকেট আগাবে না। ক্রিকেট তখনই এগিয়ে যায় যখন আমরা ভিন্ন ক্রিজে-ভিন্ন কন্ডিশনে-ভিন্ন বোলারদের বিপক্ষে সার্ভাইভ করা শিখব। আমরা সার্ভাইভ করা শিখি নাই। কারণ আমরা আগেই ভালো উইকেট খুঁজি। এই বাহানা থেকে যতদিন বের হতে না পারছি ততদিনে আমাদের টেস্ট ক্রিকেট কখনই ভালো হবে না।

আপনি সার্ভাইভের কথা বলছিলেন। টেস্টে ঠিক কী রকম সার্ভাইভ করলে সফল হওয়া যায়?

রাজিন : পাকিস্তানের সিরিজে (২০০৩ অভিষেক সিরিজ) আমি এক ইনিংসে নটআউট ছিলাম। পরের দিন মাঠে নামব, তো দিনের আগে ওয়ার্মআপ করছি ওই সময় শোয়েব আকতার আমাকে মা-বাপ তুলে গালাগালি শুরু করল। সুমন (হাবিবুল বাশার) ভাই বলল তুমি পারলে ওকে আউট করো, গালাগালি করছো কেন। তখন ইনজামাম এসে পরিস্থিতি ঠা-া করে। কিন্তু পরের ইনিংসে বল করার সময় সে আমার শরীর লক্ষ্য করে বল ছুড়েছে। বুকে-পিঠে বল লাগছে, একটা আমার অ্যাবডমিন গার্ডে লাগে। সেদিন রাতে আমার পায়ে রক্ত জমাট হয়ে গিয়েছিল। এখন এসব তো আসল ক্রিকেটীয় উদাহরণ না, কিন্তু এটা হলো সার্ভাইভের উদাহরণ। আমাদের তো টেস্টে ইনিংস খেলার জন্য সার্ভাইভ করতে হবে।

টেস্ট ব্যাটিংটা আমাদের অনেক ভোগাচ্ছে। লম্বা ইনিংস আসছে না নিয়মিত। আপনি পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবারই তা দেখিয়েছেন। এখন ব্যাটাররা তা পারছে না কেন?

রাজিন : দেখেন, আমি এখন যারা আছে তাদের মতো খেলি নাই। কিন্তু আমার সময়ে যতটুকু খেলা দরকার আমি বলব ওই সময়ের তুলনায় আমি সেরা ক্রিকেট খেলেছি। আমি নিজে চেষ্টা করে যা অর্জন করেছি, মানে আমার স্বপ্ন ছিল শোয়েব আকতার-ব্রেট লিকে ফেস করব। ওই অনুশীলন আমি করেছি, মানে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের ওই সময়ে সুযোগ-সুবিধা কী ছিল? আমরা নিজের সুবিধামতো অনুশীলন করব তাহলে হবে না। সুবিধার জায়গা থেকে সরে এসে অনুশীলন করতে হবে তখন আপনি শিখবেন।

তাহলে টেস্ট ঐতিহ্য তৈরি না হওয়ায় ঘরোয়া ক্রিকেট ও ব্যাটিং মেজাজে উন্নতি না হওয়া দায়ী? নাকি আরও আছে?

রাজিন : দেখেন, আমাদের যারা কোচ ছিলেন, ওনারা আমাদের এই সার্ভাইভের অনুশীলনটাই করিয়েছেন। আমরা যখন থেকে টিভিতে খেলা দেখতাম তখন থেকে আমরা চিন্তা করতাম কীভাবে আমরা সার্ভাইভ করব। এখন এটা না হওয়ার কারণ টি-টোয়েন্টি। এখন টি-টোয়েন্টিতেই নজর থাকে সবার। এই ফরম্যাটটা আসলে আমাদের ক্রিকেটকে নষ্ট করে দিয়েছে। আমরা টেস্টে যখন মনোযোগী হতে শুরু করেছিলাম ঠিক সেই সময় এই ফরম্যাট আসায় আমাদের চিন্তাটা ওদিকে ঘুরে গেছে। টি-টোয়েন্টিতে বেশি আর্থিক সাপোর্ট পাওয়া যায়। তাই আমরা সেদিকেই ঘুরছি। দেখেন, আমাদের বিপিএল সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আসর। কিন্তু লম্বা ফরম্যাটে আমাদের বড় আসর কোনটা, জাতীয় লিগ। এই জাতীয় লিগে আমাদের আগ্রহ কতটুকু। আর সেটা আসবে কোথা থেকে? আজ টেস্টের ২০-২২ বছর পরও জাতীয় লিগে একটা বিভাগীয় দলের একজন হেড কোচের বেতন ধরা হয় ৩০-৪০ হাজার টাকা। তো এই টাকায় একজন হেড কোচ থাকলে তার কথা কে শুনবে। বা ওই কোচই বা এই কাজে কতটা মনোযোগ দিতে পারবে। তার তো পরিবার আছে, তাকে অবশ্যই অন্যদিকেই চিন্তা রাখতে হবে। তো এই অবস্থা থেকে ক্রিকেটার বা কোচের দিক থেকে বড় ফরম্যাটে উন্নতিটা কীভাবে আশা করি।

অনেক ক্রিকেটার আছেন টি-টোয়েন্টি খেলে না। যেমন জো রুট-ব্র্যাথওয়েট। ওদের মতো ক্রিকেটার তো তৈরি করতে পারছে না বাংলাদেশ?

রাজিন : শুধু খেলে যে তা না, খেললে তো তারা খেলোয়াড়ই থাকছে। সেখান থেকে বাকিদের কতটুকু শেখাতে পারছে। কিন্তু এরাই যখন কোচ হয়ে আসছে তখন ওদের অভিজ্ঞতা কতটুকু। এখন বাংলাদেশের ২০-২২ বছর হয়েছে টেস্টে, এখনো দেখেন আমরা যারা খেলা ছেড়েছি, খেলেছি সেই অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের কয়জন দেশের ক্রিকেটের ভালো জায়গায় আছেন। আমাদের এই জায়গাগুলোতে কাজে লাগানো জরুরি। যারা ক্রিকেট ছেড়েছি সবাই জানি আমরা কীভাবে টেস্ট খেলতে হয়। দেখেন রাহুল দ্রাবিড় এখন ভারতের কোচ, এর আগে তাকে যুব দলের কোচিংয়ে দেওয়া হয়; শুধু দেওয়াই না, তাকে কী পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রাবিড় শুধু তার দল নিয়েই মনোযোগী ছিলেন। কত পরিমাণ ক্রিকেটার তৈরি করে এনেছেন। আমাদের অনেক কোচ আছেন যারা প্রথম শ্রেণিতে খেলেন নাই। তারা একটা দলের কোচ হলে তাদের কাছ থেকে ক্রিকেটাররা কী মানসিকতা শিখবে। তাহলে এখানে টেস্টের ঐতিহ্যটা কীভাবে তৈরি হবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত