সাভারের আশুলিয়ায় হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর ফের পাঠদান শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার ক্লাসে ফিরেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে কিশোর গ্যাং আতঙ্কসহ পারিপাশির্^ক আরও কিছু কারণে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল আগের চেয়ে কম।
এদিকে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলার প্রধান আসামি আশরাফুল ইসলাম জিতুর ‘বান্ধবীকে’ও বহিষ্কার করেছে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্র্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান জানান, গত বৃহস্পতিবার কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলে জিতু ও তার ‘বান্ধবী’কে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী জিতুকে স্থায়ী বহিষ্কারের পর একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রীকেও সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীকালে তদন্তে শিক্ষক উৎপল হত্যায় সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাকেও স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক উৎপল হত্যার প্রতিবাদে পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল সকাল থেকে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা দলে দলে এসে নিজ নিজ ক্লাসে যোগ দেয়। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে প্রাথমিক শাখার ক্লাস শুরু হয়। বেলা ১১টায় শুরু হয় মাধ্যমিক ও কলেজ শাখার পাঠদান। এরপর দুপুর ১টায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে এবং সড়কের পাশে অবস্থান নিয়ে নিহত শিক্ষকের স্মরণে প্রতীকী মানববন্ধন করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
গত ২৫ জুন নিজ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রকাশ্যে কলেজশিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে ফিরলেও তাদের ভয় দূর হয়নি। কিশোর গ্যাং আতঙ্ক এবং সামনে ঈদের ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি গতকাল আগের চেয়ে কম ছিল। আতঙ্কের কারণে গতকাল প্রভাতি শাখায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল শতকরা ৫৩ শতাংশ এবং দিবা শাখায় শতকরা ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া গত শুক্রবার ঢাকা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় ক্লাস চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশি টহলের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রভাতি শাখার শিক্ষক জ্যোৎস্না আক্তার বলেন, ‘স্যার (নিহত শিক্ষক উৎপল) খুব ভালো মানুষ ছিলেন। যখনই পরীক্ষা হতো স্যার এসে জিজ্ঞেস করতেন, কোনো সমস্যা আছে কি না? এই স্কুলে জয়েন করার পর স্যার ছাড়া আজ আমার প্রথম ক্লাস। আমি একদিন অসুস্থ হওয়ার পর স্যার আমাকে পরীক্ষায় ডিউটি করতে না দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। স্যারের জন্য সকাল থেকেই মন খারাপ। ক্লাসে সেভাবে মন বসছে না।’
আরেক শিক্ষক দিবা আফরিন বলেন, ‘স্যার বাচ্চাদের খুব ভালোবাসতেন। ভাবতেই পারছি না স্যার আমাদের মাঝে নেই। কীভাবে চোখের সামনে সব বদলে গেল, খুব খারাপ লাগছে এখনো।’
দশম শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বলেন, ‘স্কুলে আসতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। স্কুল শুরুর আগে যারা (ইভ টিজার) সাধারণত সড়কে দাঁড়িয়ে থাকত তাদের আজ দেখা যায়নি। তবে স্কুলের আশেপাশে পুলিশ থাকলে ভালো হতো। তাহলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে আর ভয় পেত না।’
নিহত উৎপল কুমার সরকারের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শরিফুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পুলিশের একটি টহল টিম সকাল থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের সামনে থাকার কথা থাকলেও দেরিতে আসে। এ ছাড়া শিক্ষক উৎপল হত্যায় গ্রেপ্তার আশরাফুল ইসলাম জিতুর সহযোগীদের এখনো চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়নি। যে কারণে এখনো নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছেন না তারা।
এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের পর জিতু গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগী এবং মদদদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় আমরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। শুক্রবার দুপুরে শিক্ষক উৎপল স্মরণে শোক ও মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানানো হয়। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস যথাসময়ে রক্ষা না করায় আমরা নিজেরাই দলবদ্ধভাবে টহল দিয়েছি।’
তিনি জানান, আজ রবিবার থেকে আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঈদের ছুটির কারণে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
যথাসময়ে পুলিশের টহল দল না আসার কারণ জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার এসআই আল মামুন কবির বলেন, ‘রাস্তায় যানজট থাকার কারণে যথাসময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ক্লাস চলাকালে আমাদের সার্বক্ষণিক টহল থাকবে।’
