ভারতে ট্যাটু সংস্কৃতির ইতিহাস

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ১০:৫৪ পিএম

আধুনিক যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শরীরের নানা জায়গায় ট্যাটু আঁকে ভারতের তরুণসমাজ। পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ মনে করা হলেও দেশটিতে বহু আগে থেকে ট্যাটু আঁকা হয়ে আসছে। আদিবাসী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ট্যাটু। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

প্রাচীন ঐতিহ্য

দেহের বিভিন্ন অংশে ট্যাটু বা উলকি আঁকা হাল আমলে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করে হাতে, গলায়, বুকে, পেটে নানা ডিজাইনের ট্যাটু এঁকে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলেন। সাধারণত সুইয়ে কালি লাগিয়ে ট্যাটু শরীরে খোদাই করা হয়। এই কালি অনেকে শরীরে অস্থায়ীভাবে বসায়। অনেকে আবার চামড়ার এমন স্তরে ট্যাটু আঁকেন যা আজীবন থেকে যায়। কারও কাছে এটি শিল্পের ধরন, কারও কাছে নিজেকে ফ্যাশনেবল দেখানোর কৌশল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও ট্যাটু আঁকা নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা কম নয়। দেশটির তরুণ প্রজন্মের অনেকে মনে করেন, ট্যাটু বা উলকি পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ, সেখান থেকে এটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ট্যাটু সংস্কৃতি পশ্চিম থেকে আসেনি বরং দেশটিতে ট্যাটু আঁকার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। কমপক্ষে একশ বছরের বেশি সময় আগে থেকে ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দেহে স্থায়ী ট্যাটু এঁকে আসছে। তারও অনেক আগে থেকে নানাভাবে ও নানা কারণে শরীরে অস্থায়ী ট্যাটু আঁকা হয়ে আসছে। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস করা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ট্যাটু। তাদের কাছে এটি সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

অনুপ্রেরণা

প্রাগৈতিহাসিক আমলে পাথর বা কাঠের দেয়ালে আঁকা নকশা মুগ্ধ করত মানুষদের। দেয়ালে বা পাথরে যদি এত সুন্দরভাবে নকশা আঁকা যায়, তাহলে নিশ্চয়ই তা দেহেও আঁকা সম্ভব এই চিন্তা থেকে তারা শরীরে ট্যাটু আঁকার প্রতি উৎসাহবোধ করেন। গাছ বা ফুলের কাঁটা, কখনো বা ধারালো হাড় দিয়ে সে সময় থেকে শুরু হয় ট্যাটু আঁকাআঁকি। বুকের দুধ, গুরুর দুধ, গরুর মূত্র, তেল বা পানি দিয়ে তখন কালি বানানো হতো। আঁকার পর ট্যাটুর জায়গায় গোবর লাগানো হতো। এটি জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করত। এ ছাড়া গোবর দিলে ট্যাটুর রং গাঢ়ও হতো। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঘন পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শুরু করে পশ্চিমের ধু-ধু মরুভূমিতে বাস করা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ কেবল দেহের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ট্যাটু আঁকান না, ভিন্ন ভিন্ন কারণে তারা দেহের ওপর এই শিল্পকর্মের চর্চা করেন। আদিবাসীদের কেউ কেউ বিশেষ কোনো ঘটনা মনে রাখতে তা শরীরে খোদাই করেন। কেউ বা কোনো ঘটনার প্রমাণ রাখতে ট্যাটু আঁকান। জাতিভেদে ট্যাটু আঁকার চর্চা ও নকশার মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। এক গোষ্ঠীর ট্যাটুর সঙ্গে আরেক গোষ্ঠীর ট্যাটুর মিল পাওয়া যায় না। এ কারণে তাদের পরস্পরের থেকে আলাদা করে চেনা যায়। ট্যাটু আঁকার প্রক্রিয়াকে আদিবাসীরা গুদনা বলে, যার অর্থ সুইকে কবর দেওয়া। এই ট্যাটু তাদের কাছে অনেকটা গহনার মতো। এ এমন গহনা যা কি না তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া যায় না। জাগতিক সবকিছু তারা হারিয়ে ফেললেও গহনার মতো দেখতে ট্যাটু হারানো অসম্ভব।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ে ট্যাটু

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসময় বিভিন্ন কারণে শরীরে ট্যাটু আঁকা শুরু করেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক গোষ্ঠীর সঙ্গে আরেক গোষ্ঠীর লড়াইয়ের সময় নারী অপহরণ করা ছিল সাধারণ ঘটনা। এটি ঠেকাতে ট্যাটুর আশ্রয় নেওয়া হতো। উদাহরণ হিসেবে অরুণাচল প্রদেশের কথা বলা যায়। কথিত আছে, এ প্রদেশের আপাতানি নামের গোষ্ঠীর কিশোরীদের মুখে ট্যাটু আঁকা হতো, যাতে তাদের আকর্ষণীয় না দেখায়। এর ফলে প্রতিবেশী গ্রামের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর লোকজনের নজর দেখতে সুশ্রী আপাতানি নারীদের ওপর কম পড়ত। আপাতানিরা ট্যাটু আঁকার সময় গাছ বা ফুলের কাঁটা ও পশুর চর্বিতে মেশানো কালি ব্যবহার করত। তারা ক্ষত সংক্রমিত হতে দিত যাতে ট্যাটু বড়, কালো ও স্পষ্ট দেখায়। সত্তরের দশকে এই পদ্ধতিতে ট্যাটু আঁকা নিষিদ্ধ করে ভারত সরকার। অবশ্য দেশটির উত্তর-পূর্বে দুর্গম এলাকায় যেখানে মনুষ্যবসতি প্রায় নেই বললেই চলে, সেখানে এখনো আপাতানিরা এভাবে ট্যাটু এঁকে যাচ্ছেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে বাস করা সিংপো জাতিগোষ্ঠীর নারী ও পুরুষদের মধ্যে ট্যাটু আঁকার নিয়ম আলাদা। বিবাহিত সিংপো নারীরা দুই পায়ে হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত এবং পুরুষরা তাদের হাতে ট্যাটু আঁকেন। অবিবাহিত সিংপো নারীদের ট্যাটুর অনুমতি নেই। অন্যদিকে নাগাল্যান্ডের কনিয়াক জাতিগোষ্ঠী ট্যাটুর জন্য বেশ প্রসিদ্ধ। কয়েক দশক আগেও এই গোষ্ঠীর যোদ্ধারা শরীরের অন্য কোথাও নয়, শুধু মুখমণ্ডলে ট্যাটু আঁকতেন। তারা এটিকে একসময় লড়াইয়ের ময়দানে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে দেখতেন। কনিয়াক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত ট্যাটু। লড়াইয়ের সময় কারও মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তি কোন গোষ্ঠীর, তা ট্যাটুর মাধ্যমে জানা যেত। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় বা বন্যপ্রাণীর হাতে কেউ বেঘোরে প্রাণ হারালে তার গোষ্ঠী পরিচয় ট্যাটুই জানান দিত।

ট্যাটু আঁকার প্রচলন সাঁওতাল আদিবাসীদের মধ্যেও রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যে বাস করা সাঁওতালদের মধ্যে এর চল বেশি দেখা যায়। সাঁওতাল পুরুষরা কপালে মুদ্রা আকৃতির ট্যাটু আঁকেন। এই ট্যাটুকে তারা সিক্কা বলে। সুইয়ের জায়গায় তারা গাছ বা ফুলের কাঁটা ও কালি হিসেবে গরুর পিত্ত, শূকরের চর্বি বা আঙুল ফলের বীজ থেঁতলে সেখান থেকে বের হওয়া রং ব্যবহার করে। সাঁওতাল নারী ও পুরুষদের ট্যাটু আলাদা হয়। এ ছাড়া বয়সভেদেও ট্যাটুর ভিন্নতা দেখা যায়। সাঁওতালদের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী তাদের ট্যাটু মূলত বিজোড় সংখ্যায় হয়। তাদের কাছে বিজোড় সংখ্যার অর্থ জীবন, অন্যদিকে জোড় সংখ্যা বলতে তারা মৃত্যু বোঝে। সাঁওতাল নারীরা দেহে ফুলের নকশার ট্যাটু আঁকেন। বয়ঃসন্ধি বা বিয়ের সময় তাদের বুকে ছাতি গোদাই নামে বিশেষ ধরনের ট্যাটু আঁকা হয়।

দক্ষিণ ভারতে বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে বাস করে তোদা আদিবাসী। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ও দীর্ঘস্থায়ী ট্যাটুর নাম পাচাকুথারাথু। এ অঞ্চলে ট্যাটুশিল্পীদের কোরাথি বলা হয়। কোরাথিরা খদ্দেরের খোঁজে তামিলনাড়ুর এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বেড়ান। তোদারা মনে করে, প্রাচীনকাল থেকে জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ট্যাটু এমন এক মাধ্যম, যা স্বর্গে পূর্বপুরুষের শক্তির সঙ্গে মিলনের আগ পর্যন্ত তাদের অশুভ আত্মা থেকে রক্ষা করে। তাদের বিশ্বাস, ট্যাটুর বিভিন্ন নকশার মধ্যে কোল্লাম নামের নকশা সবচেয়ে নান্দনিক এবং এটি অশুভ আত্মা পরাস্ত করতে সাহায্য করে।

পূর্ব ভারতের বিহার রাজ্যে বাস করে ধানুক নামে নিম্নবর্ণের এক সম্প্রদায়। ধানুক পুরুষদের দেহে ট্যাটু দেখা যায় না। এটি মূলত এই বর্ণের নারীদের মধ্যে প্রচলিত। ধানুকরা মনে করে, ট্যাটু তাদের নারীদের উচ্চবর্ণের পুরুষদের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করে; নারীদেহের উন্মুক্ত অংশে ট্যাটু আঁকা থাকলে উচ্চবর্ণের পুরুষরা তাদের শারীরিকভাবে কামনা করবেন না। কিছু সম্প্রদায় বাইরের পুরুষদের আপত্তিকর চাহনি থেকে ঘরের নারীদের রক্ষায় পর্দার আশ্রয় নিলেও ধানুক পুরুষরা পর্দা নয়, দীর্ঘদিন ধরে ট্যাটুকেই তাদের স্ত্রী ও কন্যার আত্মরক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

বর্তমান সময়ে ট্যাটু

ট্যাটু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন গ্রাফিক ডিজাইনার ও ট্যাটুশিল্পী শোমিল শাহ। তার বাড়ি ভারতের গুজরাট রাজ্যের কুচ অঞ্চলে। যাযাবর জাতিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বাস ওই অঞ্চলে। একসময় ট্যাটু ছিল তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। ব্যাপক মাত্রায় নগরায়ণের কারণে ট্যাটুর চল এখন অনেকটা কমে গেছে কুচ অঞ্চলে। শোমিল বলেন, ‘আমার দিদিমার মায়ের ট্যাটু ছিল কিন্তু তার মেয়ে বা আমার মায়ের গায়ে কখনো ট্যাটু দেখেনি। মনে হয়, ভারতে ট্যাটু আঁকার চল এক বা দুই প্রজন্মে বাদ পড়ে যায়।’ ট্যাটু নিয়ে পড়াশোনা করতে করতে একপর্যায়ে নিজের উদ্যোগে ট্যাটু আঁকা শিখে ফেলেন শোমিল। দেশীয় ট্যাটুর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে জানাবোঝা আরও বিস্তৃত করেন তিনি। শোমিল বলেন, ‘ইন্টারনেটে ট্যাটু নিয়ে আমার কাজ অনেকে দেখেছে। সেসব দেখে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা তাদের দাদি, খালা বা রাঁধুনির শরীরে আঁকা ট্যাটু সম্পর্কে নানা ধরনের গল্প বলেন। কেউ কেউ তাদের পরিবারের নারী সদস্যের ট্যাটুর ছবি দেখিয়ে তাদের দেহে হুবহু তেমন ট্যাটু আঁকার ফরমায়েশও করেন। এ ছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয়রা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশের ঐতিহ্যবাহী ট্যাটু সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চান। এই ভারতীয়দের অনেকে তাদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো না কোনো নারীর দেহে ট্যাটু দেখেছেন। দেশের তরুণদের দেহে পশ্চিমা অনুকরণের ট্যাটু বেশি দেখা গেলেও এমন অনেকেই আছেন যারা আমাদের প্রাচীন ও আদি ট্যাটু আঁকতে চান।’

ট্যাটু নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখে ইন্সটাগ্রামে ইন্ডিয়া ইঙ্ক আর্কাইভ নামে পেজ খোলেন শোমিল। এই পেজটিকে ভারতীয় উপমহাদেশের মৌলিক ট্যাটুর ভাণ্ডার বলা যায়। অত্যন্ত নিখুঁত ও বিশদ নকশার ট্যাটু থেকে শুরু করে সাধারণ নকশার ট্যাটু ইন্ডিয়া ইঙ্ক আর্কাইভে গেলে দেখা যায়। শুধু নকশা নয়, নকশার পেছনের গল্পও জানা যায় এ পেজে গেলে। নারীরা তাদের দেহে আঁকা ট্যাটুর ছবি এ পেজে পোস্ট করেন। পেজটিতে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রের কোলি সম্প্রদায়ের ইন্দিরা বাই নামের ৯০ বছর বয়সী নারী তার দেহে তিনটি ট্যাটু আঁকিয়েছেন। পালকির একটি ট্যাটু তার ডান হাতে, সৌভাগ্যের জন্য বাম হাতে এক জোড়া সামুদ্রিক মাছের ট্যাটু ও অমঙ্গল তাড়াতে কপালে তৃতীয় নয়নের ট্যাটু।

ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজির ছাত্র ছিলেন ট্যাটুশিল্পী মোরাঙ্গম খলিং। তিনি মো নাগা নামেও পরিচিত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের উইপো সম্প্রদায়ে জন্ম তার। ট্যাটুর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও একে নিয়ে নানা ধরনের মিথের বিষয়ে জানাবোঝা ব্যাপক তার। ট্যাটু নিয়ে বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তি, ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানীদের লেখা বইপত্র পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জাদুঘরের অনলাইন আর্কাইভও পড়াশোনা করেন মো। ভারতের উত্তর-পূর্বে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ট্যাটুর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধানের লক্ষ্যে স্থানীয় দোভাষীদের নিয়ে ওই অঞ্চল চষে বেড়ান তিনি। মো বলেন, ‘শিল্পের যেসব ধরন নিয়ে আমাদের দেশে কাজ কম হয়েছে, তার মধ্যে ট্যাটু একটি। শুধু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়, দেশের অন্য প্রান্তের ট্যাটু সংস্কৃতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন গবেষণা নেই।’

ট্যাটু আঁকা ছাড়াও আদিবাসীদের মধ্যে এটির তাৎপর্য এবং ট্যাটুর প্রতীক বা নকশার গূঢ় অর্থ সম্পর্কে লোকজনকে জানাতে ভালোবাসেন মো। তিনি বলেন, ‘আদিবাসী মানুষের অর্জন, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থেকে শুরু করে তাদের জীবনের গল্প ট্যাটুর মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। মানুষের রুচি, সৌন্দর্যবোধের প্রতিফলন ঘটায় ট্যাটু।’ ট্যাটুর প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হলে এটি নিয়ে প্রচলিত নানা ধরনের মিথ খণ্ডানোর প্রয়োজন হয়েছে বলে মনে করেন মো। উদাহরণ হিসেবে তিনি অরুণাচল প্রদেশের আপাতানি আদিবাসীর প্রসঙ্গ তোলেন। মো বলেন, ‘প্রায় এক দশক ধরে আপাতানিদের ট্যাটু নিয়ে পড়াশোনা করেছি। বলা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর পুরুষদের চোখে কম আকর্ষণীয় করতে আপাতানি নারীর নাকের দুপাশে প্লাগ বসানো হতো আর ট্যাটু আঁকানো হতো। এটি ভুল ব্যাখ্যা। নাকে প্লাগ পরা বা ট্যাটু আঁকা আপতানি সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ এবং এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত।’

ট্যাটু গবেষণার কাজে একবার নাগাল্যান্ডে কনিয়াক সম্প্রদায়ের এলাকায় যান মো। সেখানে তার সঙ্গে দেখা হয় ওই সম্প্রদায়ের ৮২ বছর বয়সী কনিয়াক রানীর। তিনিও একজন ট্যাটুশিল্পী। তবে ৬০ বছর ধরে তিনি ট্যাটু আঁকেন না। মো বলেন, ‘আলাপের একপর্যায়ে রানী আমার গায়ে ট্যাটু এঁকে দেবেন বলে জানান। শুনে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়। ৬০ বছরের বেশি সময় পর আমার জন্য ট্যাটু আঁকার সরঞ্জাম হাতে নেন তিনি। রানী বলেছিলেন, তিনি আমার মুখে ট্যাটু আঁকবেন না কারণ শুধু কনিয়াক সম্প্রদায়ের বীর যোদ্ধাদের মুখে ট্যাটু আঁকার নিয়ম। যেসব যোদ্ধা বেঁচে রয়েছেন, তারা আমার মুখে ট্যাটু দেখলে অসন্তুষ্ট হবেন। রানী তখন আমার বুকে ট্যাটু আঁকেন। দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় তিনি ট্যাটুর প্যাটার্নটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। অসম্পূর্ণ হলেও এটি আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ট্যাটুর প্রতি আমার আগ্রহ ও পড়াশোনা দেখে রানী আমাকে তার সরঞ্জাম উপহার দেন। তিনি আশা করেন, ‘আমি ট্যাটুর ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে যাব। আমি তার সরঞ্জাম বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ব্যবহার করি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত