গাধা বাড়ছে পাকিস্তানে কমছে ভারতে

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ১০:৫০ পিএম

শিরোনামে যা লিখেছি তা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করুন। এর মধ্যে প্রতীকী কিছু খুঁজতে যাবেন না; খুঁজলে সময় নষ্ট হবে, কিছুই পাবেন না, ঠকবেন। বেশ তো ভারত আর পাকিস্তানের কথা বলছি। বাংলাদেশ নেই কেন নেই কারণ প্রতীকী-প্রবণতা আমাদের বেশি, গুরুত্বপূর্ণ কেউ না কেউ ভেবে বসবেন রাষ্ট্রীয় অর্থে শুমারিটা আসলে তাকে নিয়ে। এটা যে তিনি নন কিংবা তাকে নিয়ে নয় বোঝাতে বোঝাতে নাভিশ্বাস উঠবে।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নাম নিয়ে শুরু করি। বস্তাভর্তি আলু-পটোল গাধার পিঠে চাপিয়ে হোজ্জা বাজারে রওনা হলেন। বেচে হাতে কিছু নগদ টাকা রাখবেন। বস্তাটা ভারী। কিছুদূর গিয়ে গাধা থেমে গেল, আর যাবে না। বহু তোষামোদ করলেন, গাধা এক ইঞ্চিও এগোল না। সুতরাং একটা লাঠি নিয়ে গাধাটাকে পেটাবেন বলে মনস্থির করলেন। মারের নাম বাবাজি। গাধাকে কয়েক ঘা লাগানোর পরই আশপাশে অনেক মানুষ জমে গেল। তারা অসন্তুষ্ট হয়ে হোজ্জাকে গালমন্দ করতে শুরু করল। একজন বলল, ‘কেমন অমানুষ তুমি হোজ্জা, নিরীহ গাধাকে কেউ এভাবে পেটায়?’ দ্বিতীয় জন বলল, ‘গাধা একটা বোবা প্রাণী, মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না বলেই তোমার এই অত্যাচার।’ তৃতীয় জন বলল, ‘পুলিশ ডেকে এখনই হোজ্জাকে সোপর্দ করো, তার বিরুদ্ধে ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্টের মামলা হবে।’ এ ধরনের বহু মন্তব্য শোনার পর হোজ্জা গাধাটার কাছে এসে পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘আহারে গাধা, আমি যদি আগে জানতাম তোর এত আত্মীয়স্বজন, তোর পরিবারটা এত বড়, তাহলে আমি কখনো লাঠি হাতে নিতাম না।’ তার কথা শেষ হতেই দেখা গেল গাধার শুভানুধ্যায়ীদের একজনও আশপাশে নেই। হোজ্জার গাধার আত্মীয়স্বজন দ্রুত সটকে পড়লেও বাংলাদেশি গাধার স্বজনরা যে সহজে নড়বেন না এটা মানতেই হবে।

এটাও আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে প্রাণিজগতে গাধাই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির শিকার, শারীরিক লাঞ্ছনাও তারই বেশি জোটে। তার সঙ্গে তুলনা করে মানুষকে হেয় করার চেষ্টা তো চলে অবিরাম। এই যেমন রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশনে ভাষণ হচ্ছে, শুনেই একজন বলে উঠলেন, গাধাটা এসব কী বলছে? মাঝখানে কেউ একজন বক্তাকে বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। তখন হান্টার থম্পসন বুঝতে পারলেন কোথাও একটা গড়বড় হয়ে গেছে এবং তিনি লজ্জিত বোধ করলেন।

পাকিস্তান ইকোনমিক সার্ভে ২০২০-২১-এর সুসংবাদটি দক্ষিণ এশীয় দেশের গণমাধ্যম লুফে নিয়েছে। উপমহাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা ও শুমারির গুণগত মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছেন পাকিস্তানে বাস্তবিকই গাধার সংখ্যার আশাব্যঞ্জক বৃদ্ধি ঘটেছে। পাকিস্তানের সরকারি হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ বছরে মোট পশুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ, আর ২০২০-২১ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার। এক বছরে গাধা বেড়েছে পুরো এক লাখ; মোট সংখ্যা এখন ৫৬ লাখ। আর ২০২১-২২ বছরে পুরো ৫৭ লাখ। বাড়েনি ঘোড়া এবং খচ্চরের সংখ্যা। ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা বেড়েছে ৪ লাখ।

অন্যদিকে ভারতে গাধার সংখ্যার আশঙ্কাজনক পতন ঘটেছে। ২০১২ এবং ২০১৯ সালের পশুশুমারির মধ্যবর্তী সময়ে গাধার সংখ্যা ৬১.২৩ ভাগ কমে গেছে। এমনিতেই গাধার সংখ্যার বিচারে ভারত পাকিস্তানের কাছে মার খেয়ে আছে। ২০১২ সালে এত বড় দেশে গাধা ছিল মাত্র ৩ লাখ ২০ হাজার; সাত বছরের ব্যবধানে গাধার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার। গাধা কমার অন্যতম কারণ গাধা জবাই এবং চামড়া পাচার। বাহ্যত পাকিস্তানের বন্ধুদেশ চীন, ভারতের বেলায় শত্রু। কিন্তু চীনারা সম্ভবত পাকিস্তানি গাধার চেয়ে ভারতীয় গাধার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। ভারত থেকে গাধার চামড়ার চোরাচালান হচ্ছে চীন দেশেই। গাধার চামড়া মূল্যবান ওষুধ তৈরিতে চীনারা ব্যবহার করে থাকে। ঐতিহ্যবাহী সেই চীনা ওষুধের নাম ‘ইজিয়াও’। মনে করা হয় ইজিয়াও দুর্বল দেহ বলবান করে, যৌনশক্তি বৃদ্ধি করে, প্রজনন সক্ষমতা বাড়ায়। গাধার মাংসও চড়া দামে বিক্রি হয়। গাধা চোরাচালানের (এমনকি জ্যান্ত গাধাও) কাজে সীমান্তবর্তী নেপাল করিডরই বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভারতে ভারবাহী জন্তু হিসেবে গাধার চাহিদা কমে গেছে। স্থানটি দখল করে নিচ্ছে খচ্চর। গাধার তুলনায় খচ্চরের গর্ভাবস্থার শুরু থেকে প্রসব পর্যন্ত সময়টা কম এবং খচ্চরের লালনপালন ব্যয়ও কম।

ডাঙ্কি স্যাঙ্কচুয়ারি নামক ব্রিটেনভিত্তিক একটি পশুকল্যাণ সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমানে সারা পৃথিবীতে গাধার সংখ্যা ৪ কোটি ৫৮ লাখ এবং তা ক্রমহ্রাসমান। চীনা ওষুধ ইজিয়াও একসময় কেবল ধনী ম্যান্ডারিনদের মধ্যেই সীমিত ব্যবহার হতো। কিন্তু আর্থিক অবস্থার যুগান্তকারী পরিবর্তনের কারণে চীনের মধ্যবিত্ত তো বটেই এমনকি নিম্নবিত্তের সদস্যরাও বলবর্ধন, পৌরুষ সঞ্চারক এই ওষুধের দিকে হাত বাড়িয়েছে। ফলে ২০১৩ থেকে ২০১৬ এ সময়ে ওষুধের উৎপাদন বার্ষিক গড়ে ২০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত চীনের নিজ দেশীয় গাধার সংখ্যা কমে গেছে ৭৬ ভাগ। পশুকল্যাণকর্মীরা মনে করেন গাধা মর্যাদাগতভাবে শুধু উপেক্ষিতই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝা টানানোসহ মারাত্মক শারীরিক নিপীড়নেরও শিকার। তাঞ্জানিয়ার কসাইখানায় গাধার মাথায় মুগুর দিয়ে আঘাত করে অজ্ঞান করা হয়ে থাকে। কেনিয়া ও বতসোয়ানাতেও গাধা নির্যাতনের শিকার। বর্তমানে পৃথিবীর গাধা-পরিস্থিতি আতঙ্কজনক বলে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষকরা মনে করছেন। শুধু চীনকে বলবর্ধক ওষুধের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর ৪৮ লাখ গাধার চামড়া সংগ্রহ করতে হয়।

প্যারিসভিত্তিক ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথ পরামর্শ দিচ্ছে গাধাকে আপনার সেভিংস অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করুন এবং গাধার যতœ নিন। যুক্তরাজ্যের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্পেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগারে গাধার চামড়ার সমান গুণসম্পন্ন কৃত্রিম চামড়া তৈরি করেছে, যা চাইনিজ ওষুধে একই রকম কার্যকর হবে। এটা যদি ব্যাপকভিত্তিক ব্যবহৃত হতে থাকে তাহলে চামড়া পাচারের উদ্দেশ্যে হত্যার হাত থেকে বহু গাধা বেঁচে যাবে এবং প্রকৃতিতে কিছুটা ভারসাম্য ফিরে আসবে।

অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গাধার দুধ

মিসরের সুন্দরী সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা নিয়মিত গাধার দুধে গোসল করতেন। প্রতিবার প্রয়োজন হতো ৭০০ গাধার দুধ। এটি কল্পিত কোনো কাহিনী নয়। তার পরবর্তী যুগেও ধনবান রাজার স্ত্রী ও কন্যারা গাধার দুধ বাথটাবে ঢেলে তাতে অবগাহন করতেন। আবার অনেকে ওষুধ মনে করে এই দুধ খেতেনও। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা অঞ্চলের ২৩ বছর বয়সী কৃষি প্রকৌশলী এলেন জুসোপোভিক গাধার ওপর ভরসা করলেন। ইউএস-এইডের কর্মসংস্থান প্রকল্পের ৪ হাজার ডলার ঋণ নিয়ে গাধা লালনপালনে মনোযোগ দিলেন। একটি গাধা দিয়ে শুরু করে এবং গাধার দুধ বেঁচে (তখন প্রতি লিটারের মূল্য ৫০ ইউরো, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ হাজার) বড় একটি খামার প্রতিষ্ঠা করলেন। প্রাণীটি গাধা বলেই শুরুতে লোকজন খুব হাসিঠাট্টা করত। কিন্তু ৩ বছরেই তিনি দেশের একজন উল্লেখযোগ্য মর্যাদার উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। ১৮ মাসেই একটি গাধা পরিপুষ্ট ও পূর্ণদেহী হয়ে ওঠায় কম সময়ের বিনিয়োগেই পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দিতে পারে।

সম্প্রতি ভারতের একজন বড় বেতনের আইটি স্পেশালিস্ট চাকরি ছেড়ে ২.৩ একর জমিতে ২০টি গাধার একটি খামার করে সংবাদে উঠে এসেছেন। তিনি ৩০ মিলিলিটার প্যাকেটে ১৫০ রুপি দামে গাধার দুধ বাজারে এনেছেন। তিনি সরবরাহ দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। প্রতি লিটার প্রায় ৬ হাজার টাকা। দুগ্ধ-বিশ্লেষকরা গুণমানে একে গরুর দুধের চেয়ে ভালো মনে করছেন। উপযোগিতার প্রশ্নে মরণোত্তর মানবদেহের চেয়ে গাধার দেহ উত্তম এবং আর্থিক দিক দিয়ে ঢের বেশি মূল্যবান। ঘোড়ার মানমর্যাদা গাধার চেয়ে বেশি হলেও সৌন্দর্য ও শক্তিপূজারির কাছে গাধাই বেশি কাক্সিক্ষত। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে গাধা মানুষের কল্যাণে ভারবহন করে আসছে। গতির প্রশ্নে গাধার তুলনায় মানুষ অনেক শ্লথগতির গাধা এক ঘণ্টায় যেতে পারে ২৪ কিলোমিটার আর পুরুষ মানুষ ঠেলেঠুলে ১৩ কিলোমিটার, নারীর বেলায় ১০ কিলোমিটার। দাঁতের সংখ্যার দিক দিয়েও মানুষ গাধার পেছনে। মানুষের দাঁত বড়জোর ৩২ আর গাধার বেলায় ৪৪টি। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় পোপ গ্রেগরি গাধার মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছিলেন। বিভিন্ন জাতির তারুণ্যে যুদ্ধজয়ের দিনগুলোতে বিজিত দেশের লুণ্ঠিত মালামাল নিয়ে যেতে গাধাকে ব্যবহার করা হতো। এখনো কলম্বিয়ার দুই গাধার ভ্রাম্যমাণ বইয়ের লাইব্রেরি অনগ্রসর এলাকার শিশুদের কাছে যাচ্ছে। এই লাইব্রেরির নাম বিবলিও ব্যুরো। মুস্তাফা গুজেলগজ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে ১৯৪৪ সালে নিজের পিতৃভূমি তুরস্কে ফিরে এসে গাধার পিঠে বিভিন্ন বিষয়ের বই নিয়ে গ্রামে গ্রামে ছুটলেন, মানুষকে বিনে পয়সায় বই পড়াবেন, এটাই তার ব্রত। তিনি বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠলেন ‘গাধার পিঠে গ্রন্থাগার’-এর রূপকার হিসেবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটেসই প্রথম গাধার দুধের চিকিৎসাগুণ লিপিবদ্ধ করেন জ্বর, যকৃতের প্রদাহ, ছোঁয়াচে রোগ, শোথ, নাক থেকে রক্তপাত এবং আরও অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান দেয় গাধার দুধ। মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গাধা, মানুষের হয়ে বোঝা টেনেছে, দর-কষাকষি করেনি, উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। ব্রোঞ্জ যুগে চাকার গাড়ি গাধাই প্রথম টেনে নিয়ে গেছে। খ্রিস্ট জন্মের আগে রোমান সৈন্যবাহিনীর অংশ ছিল গাধার বহর।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জা একসময় চোরাকারবারি শুরু করলেন। প্রতি সপ্তাহে একবার গাধার পিঠে বসে সীমান্তের ওপার থেকে আসেন। গাধার পিঠে একটা বস্তাও থাকে। শুল্ক বিভাগের লোকজন যেদিনই বস্তা খোলেন ভেতরে পান মাটি। মাটি নিষিদ্ধ কিছু নয়, কোনো শুল্কও ধার্য নেই। শুল্ক বিভাগের প্রধান আর হোজ্জা দুজনই তখন বৃদ্ধ। হোজ্জারও সীমান্ত পারাপারের শক্তি নেই। এক দিন শুল্ক বিভাগের প্রধান তার বাড়ি এসে বললেন, হোজ্জা আপনার মতো বুদ্ধিমান লোক শুধু মাটি চোরাচালান করেছেন এটা আমরা বিশ্বাস করি না। অন্যকিছু করে থাকলে এখন আমার কিছু করার ক্ষমতাও নেই। শুধু জানতে ইচ্ছে করছে আপনি আসলে কীসের চোরাচালানি করতেন?

হোজ্জা বললেন, গাধা। তার দেশে সত্যিই গাধার সংখ্যা বেড়ে গেছে। পাকিস্তানের হয়ে ভারত থেকে কোন হোজ্জা গাধা চোরাচালান করছেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত