পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রথম দিনই মোটরবাইক বা মোটরসাইকেল নিয়ে সেতু পারাপারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন থেকেই মোটরসাইকেলে সেতু পারাপার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকার জানায় যে, ঈদের আগে পদ্মা সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। তখন থেকেই মোটরসাইকেলের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় দেশজুড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন ঈদের আগে পরে সাত দিনের জন্য শুধু পদ্মা সেতুই নয় সারা দেশের মহাসড়কে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ফলে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার আসলে রোগের কারণ দূর করার চেয়ে রোগের উপসর্গটা ছেঁটে ফেলাকেই সহজ রাস্তা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু কে না জানে, রোগ সারাতে না পারলে কেবল উপসর্গ দূর করা দীর্ঘমেয়াদে কোনো কাজে আসবে না। রোগ আরও নতুন নতুন উপসর্গ জন্ম দেবে। ফলে রাজধানী ঢাকা কিংবা সড়ক-মহাসড়কে মাত্রাতিরিক্ত মোটরসাইকেলের চলাচলই আসল রোগ না এটা কেবল রোগের উপসর্গমাত্র সেই আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঈদুল আজহার আগের তিন দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরের তিন দিন সারা দেশের মহাসড়কে যৌক্তিক কারণ ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। অনুমোদিত এলাকার বাইরে মোটরসাইকেল রাইড-শেয়ারিংও করা যাবে না। এছাড়াও এক জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চালাতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে যৌক্তিক ও অনিবার্য প্রয়োজনে পুলিশের অনুমতি নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো যাবে। অর্থাৎ পুলিশের অনুমতি থাকলে এই সময়ে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানো যাবে। কিন্তু মুশকিল হলো, এই ‘যৌক্তিক কারণ’ বা ‘অনিবার্য কারণ’ কে বা কারা কীভাবে নির্ধারণ করবে? প্রশ্ন হলো, এই বিধান কি ঈদযাত্রার সময় প্রকারান্তরে মহাসড়কে পুলিশি হয়রানি বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্র তৈরি করবে কি না? অন্যদিকে, এই সাত দিন এক জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চালাতে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করাও কি এক দুরূহ কাজ নয়? বিশেষত যখন দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নিকটবর্তী দূরত্বে প্রতিদিনই এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাতায়াত করেন, পেশাগত ও পারিবারিক কারণে এক উপজেলা থেকে আরেক জেলার ভিন্ন উপজেলায় গিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম করেন। এই বিধানও কিন্তু মোটরসাইকেলে যাতায়াতকারীদের অন্যায্য হয়রানির সুযোগ করে দিতে পারে পুলিশকে। দেশে প্রতিবছর ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রায় মহাসড়কগুলোতে পুলিশের চাঁদাবাজির যে অভিযোগ দেখা যায় সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এই হয়রানির আশঙ্কা অস্বীকার উপায় থাকে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরগুলোতে ব্যাপক মাত্রায় মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আরও আগে থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং চলে আসছিল। দেশের বিভিন্ন জেলাতেই এমন অনেক গন্তব্য আছে যেখানে দ্রুত যাতায়াতের জন্য যাত্রীবাহী বাস কিংবা অন্য কোনো পরিবহনের চেয়ে মোটরসাইকেলের ওপরই মানুষ ভরসা করে। কিন্তু আমরা এটা ভাবছি না যে মানুষ কেন দিন দিন শহর-নগর-বন্দরে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে? উত্তরটা খুবই সহজ গণপরিবহনের অপর্যাপ্ততা, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা আর শহরের তীব্র যানজট। এই একই কারণে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ মহাসড়কেও মোটরসাইকেল নিয়ে দূরপাল্লার গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছেন। এটা নিশ্চিত যে, যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক আর অগুনতি প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাসের সঙ্গে একই সড়কে এত বেশি মোটরসাইকেল চলাচল কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। একইসঙ্গে তা মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। কিন্তু এই সংকটের সমাধান কি কেবল ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা? এই সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তাতে আসল রোগটা দূর হবে না।
খেয়াল করা দরকার, আগে আমরা মহাসড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য ভটভটি, নছিমন, অটোরিকশা, ভ্যানের মতো ধীরগতির হালকা যান চলাচলকে দোষ দিতাম। এখন দেওয়া হচ্ছে মোটরসাইকেলকে। কিন্তু সারা দেশের বিপুল সংখ্যক যাত্রীর এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাতায়াত কিংবা দূরপাল্লার গণপরিবহন খাতে আমরা কোনো সংস্কার করতে পারিনি, সেখানে কোনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করা হচ্ছে না। বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিমালিকানা নির্ভর যাত্রীবাহী বাস সার্ভিসের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি উপেক্ষা করে বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি। যা কোনোভাবেই কোনো সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে না। মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে গণপরিবহন খাতে বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সরকারি- বেসরকারি মালিকানায় সমন্বিত সেবা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নইলে আসল রোগটি সারবে না।
