এবার বর্ষায়ও পর্যটকদের কোলাহলে মুখরিত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বেলাভূমি কুয়াকাটা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় পর্যটনকেন্দ্রিক সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও আসছে নতুনত্ব, আধুনিকতার ছোঁয়া। স্থবির হয়ে থাকা এ খাতের বিনিয়োগও এসেছে গতিশীলতা। কুয়াকাটা উন্নয়ন মাস্টারপ্ল্যানের দ্রুত বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর পরিকল্পিত ও সুষম উন্নয়ন এবং দর্শনীয় স্থানের সংযোগ সড়ক উন্নয়ন করা হলে শুধু পর্যটন নয়, শিল্পায়নে সমৃদ্ধ হয়ে কুয়াকাটা হবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল।
সৈকতের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটার রয়েছে আলাদা সুখ্যাতি। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত, প্রশস্ত বেলাভূমি জুড়ে উপকূলের সবুজ প্রকৃতি, ফাতরার বনের চেনা-অচেনা হরেক প্রজাতির বৃক্ষ এবং জীববৈচিত্র্য, প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, উপজাতি রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনাচারণ কুয়াকাটাকে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পরিচিত ‘সাগরকন্যা’ নামে। কিন্তু পদ্মা নদী পারাপারসহ সড়কপথের দীর্ঘ ভ্রমণ ক্লান্তি পর্যটকদের জন্য হয়ে পড়ে বিড়ম্বনার কারণ। পর্যটকদের অনাগ্রহে মৌসুমের তিন মাস ছাড়া বাকি নয় মাস টানা চরম মন্দাভাব বিরাজ করে কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে। থমকে পড়ে এখানকার কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, কুয়াকাটায় বড়-মাঝারি-ছোট মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ হোটেল-মোটেল-কটেজ-রিসোর্ট রয়েছে। তারকা মানের না হলেও অভিজাতদের পছন্দের শিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা ও কুয়াকাটা গ্র্যান্ড ছাড়া বাকি সবই সাধারণ মানের। পর্যটকদের চাপ কম থাকায় এ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে দোটানায় ছিলেন উদ্যোক্তারা। তবে পদ্মা সেতু চালুর ফলে এখন বদলে গেছে কুয়াকাটার দৃশ্যপট। পুরনোসহ নতুন বিনিয়োগকারীরা আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর পর্যটন অবকাঠামো তৈরিতে উৎসাহিত হচ্ছেন। মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন অনেকেই। দ্রুত গড়ে উঠছে দৃষ্টিনন্দন আবাসিক হোটেল, মোটেল, কটেজ, খাবার হোটেল, বিনোদন পার্ক। পুরনো বিনিয়োগকারীরাও লোকসানের বোঝা লাঘবে নেমেছেন স্থাপনায় নতুন আদল দিতে।
পর্যটন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম শফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারী, এলাকাবাসী, পর্যটকদের দীর্ঘদিনের দাবি কুয়াকাটার ভাঙন রোধে গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণের। বিলীনের পথে উপকূলের সবুজ বনানীকে রক্ষার। কিন্তু এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।’
শিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলার এজিএম মো. আল-আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুয়াকাটায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ে যে জটিলতা রয়েছে এটি চরম ভোগান্তির। বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে এটি সহজীকরণ হওয়া দরকার।’
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল মোতালেব শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পে প্রাণসঞ্চার করেছে। আগামী দিনগুলোতে কুয়াকাটায় দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে। পর্যটকদের সুন্দরবন, জাহাজমারাচর, সোনারচরে ভ্রমণের জন্য সি-ক্রুজ চালুর প্রচেষ্টা চলছে। এটি সম্ভব হলে কুয়াকাটা ভ্রমণে আসা পর্যটকরা নতুনত্ব পাবেন।’
কুয়াকাটা পৌর মেয়র আনোয়ার হাওলাদার বলেন, ‘দর্শনীয় স্থানসহ সংযোগ সড়কের উন্নয়ন করা গেলে দ্রুত বিকাশমান কুয়াকাটার পর্যটন খাত থেকে প্রতি বছর আয় হবে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। আধুনিক বাস টার্মিনালের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আশা করছি ডিসেম্বরেই এটি চালু হবে।’
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে ঘিরে দ্রুতই একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হবে কুয়াকাটা। অন্তত কয়েক হাজার দক্ষ-অদক্ষ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।’
