রাজধানীর পশুর হাটে দুর্বল ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২২, ০১:৫৯ এএম

কুষ্টিয়া থেকে ২০টি গরু নিয়ে রাজধানীর আফতাবনগর হাটে ভোরে নেমেছেন ইশরাফুল। কিন্তু হাটে গরু নামিয়ে কয়েকটি স্থানে বাঁধতে গেলে বাধা দেয় কয়েক ব্যক্তি। গরু রাখতে টাকা দাবি করেন তারা। ইশরাফুল তাদের এক হাজার টাকা দিয়েও দেন। পরে হাট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে, তারা এসে ওইসব লোককে খুঁজে পায়নি।

গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া রাজধানীর কয়েকটি কোরবানির পশুর হাট ঘুরে এমন অগোছালো ব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সারা দেশের প্রায় ২ হাজার ৪০০ হাটে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে হাট।

রাজধানীর গাবতলী, কমলাপুর, আফতাবনগর ও মেরাদিয়া হাটসহ বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটে সবে গরুসহ অন্যান্য পশু আসা শুরু হয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনা এখনো দুর্বল। হাটগুলোতে পর্যাপ্ত ছাউনির ব্যবস্থা থাকলেও একটু বৃষ্টি হলেই কাদাপানিতে একাকার হয়ে যেতে পারে। কয়েকটি স্থানের গরুর ব্যাপারীরা অভিযোগ করেছেন,পানির ব্যবস্থা থাকলেও তা অপর্যাপ্ত, বিদ্যুৎ সারাদিন না দিয়ে কেবল রাতের বেলায় সংযোগ দেওয়া হয়। দিনের গরমে মানুষের তো কষ্ট হয়ই, পশুগুলো যেকোনো সময় অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিনাত সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক পশুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ঈদের আগের রাত পর্যন্ত কর্মরত থাকবেন। রাজধানীর ২১টি হাটসহ সারা দেশের ২ হাজার ৪০০ হাটে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে মেডিকেল টিমের।

কয়েকজন ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার পশুর দাম একটু বেশিই হবে। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের খরচও বেড়েছে। ৩ মণ ওজনের গরু গত বছর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার একই ওজনের গরু  ৮০ থেকে ৯০ হাজারে বিক্রি করতে হতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে ভালো দাম পাবেন কিনা সে শঙ্কাও রয়েছে তাদের।

হাট ঘুরে দেখা গেছে, ৪০ হাজার থেকে শুরু করে ২২ লাখ টাকা মূল্যের গরু এসেছে ঢাকায়। এ ছাড়া ছাগলের দাম গড়ে ১০ হাজার থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্তও রয়েছে।

গাবতলী হাটে দেখা যায়, বিক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীদের সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে লাল বাহাদুর, রাজা বাবু, কুষ্টিয়ার টাইগার, মাগুরার বাদশাসহ বেশ কয়েকটি গরু মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। অনেকে মোবাইল ফোনে গরুর ছবি তুলছিলেন। হাটে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার গরুর দাম গতবারের চেয়ে বেশি হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা।

‘লাল বাহাদুর’, ‘বাংলার টাইগার’, ‘বাংলার চিতা’ নামের তিনটি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে ক্রেতার অপেক্ষায় আছেন কুষ্টিয়ার নূর হোসেন। তিনি বলেন, ‘লাল বাহাদুর’র দাম ২০ লাখ টাকা, ক্রেতাদের মধ্য থেকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছেন, বিক্রি করিনি। ১৬ লাখ টাকা হলে ‘লাল বাহাদুর’ বিক্রি করব। ‘টাইগার’ ও ‘চিতা’ প্রত্যেকটির দাম ১২ লাখ টাকা করে।

গাবতলী হাটের আরেক আকর্ষণ ‘রাজা বাবু’। এ গরুটির দাম হাঁকা হচ্ছে ১৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া মাগুরার ‘বাদশা’ও দৃষ্টি কাড়ছে।

৬০টির মতো গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছে কুব্বত ব্যাপারী ডেইরি ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আসাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে তিনটি গরু ১১ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। আরও ১৫টি গরু হাটে আসার পথে আছে। আমাদের নিজেদের ফার্মে দেশি প্রক্রিয়ায় লালনপালন করে বড় করেছি গরুগুলো। এখানে সর্বোচ্চ ১৩ লাখ টাকা দামের গরু আছে, সর্বনিম্ন রয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দামের।’

গাবতলী হাটে ১০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাগলের দাম হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। শতাধিক ছাগল নিয়ে হাটে আসা ব্যাপারী আসমত আলী বলেন, ‘ঈদের বাজার তো মাত্র শুরু হয়েছে। এখনো বিক্রি তেমন একটা জমেনি। ঈদের আগের দুই দিনই বেশি বিক্রি হয়। আমি তিনটি ছাগল বিক্রি করেছি। আমার কাছে ৮০ হাজার টাকা দামের ছাগলও আছে, আবার ১৫ হাজার টাকা দামের ছাগলও আছে।’

হাটের ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার হাসিল নেওয়া হচ্ছে শতকরা ৫ টাকা করে। হাটে লোকজনের চাপ খুব বেশি নেই। পরিবেশও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন, হাটে আসা লোকজন। তবে গরমের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের খামারি সাইদুল ইসলাম এবার ৩০টি গরু নিয়ে এসেছেন ঢাকার কমলাপুর হাটে। গত বছর এনেছিলেন ৮০টি গরু। তিনি জানান, খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারের অধিকাংশ গরু ৬ মাস আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এতো গরুর খাবারের ব্যবস্থা করতে হলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। ঋণের দিকে না গিয়ে গরু বিক্রি করে বাকি গরুর খাবারের ব্যবস্থা করেছেন।

আফতাবনগর হাটে এবার ৪৫ থেকে ৫০ হাজার গরু সংস্থানের ব্যবস্থা আছে। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ হাট। কমলাপুরে আসবে ১০ থেকে ১৫ হাজার, মেরাদিয়ায় ১৫ হাজার। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের পশুর হাটেও গরু এসেছে। এখানেও আসতে পারে ১৫ থেকে ২০ হাজার গরু। এ ছাড়া পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট পশুর হাটেও বেশকিছু গরু এসেছে। রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে অবস্থিত বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গায় পশুর হাটে গরু এসেছে অনেক।

আফতাবনগর গরুর হাটের তথ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ উজ্জ্বল ব্যাপারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাটগুলোর মধ্যে এটি একটি। এখানে ২ হাজার ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ ছাড়া হাটে ৪০টি মোটরসাইকেল নিয়ে থাকবে একটি মোবাইল টিম। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত (গতকাল) এ হাটে প্রায় ১৫ হাজার গরু এসেছে, ছাগল এসেছে ১ হাজার।

এ হাটের ‘স্মার্ট হাট’-এর দায়িত্বে আছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এ ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবাও আছে। তবে অন্য ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকলেও তেমন একটা সমস্যা নেই। তাদের ব্যবস্থাপনায় টাকা পাঠানো হবে।

হাটে দায়িত্বে থাকা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বুথে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সুবিধা আছে। ইজারাদারের হাসিলের টাকা থেকে শুরু করে নগদ লেনদেনের সুবিধা আছে। তিন শিফটে ৮ ঘণ্টা করে ১০ তারিখ সকাল পর্যন্ত আমরা সেবা দেব।’

ফরিদপুরের আনোয়ার হোসেন ৪০ মণ ওজনের ‘কালা মানিক’ নিয়ে এসেছেন রাজধানীর কমলাপুর হাটে। দাম হাঁকাচ্ছেন ২০ লাখ। সাড়ে তিন বছর নিজে পালন করার পর এবার ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। তবে কমলাপুরের হাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ রয়েছে তার।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখানে ভালো ছাউনি লাগানো হয়নি। একটু বৃষ্টি হলেই কাদায় গরু নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। এ গরু কখনোই এত নোংরা জায়গায় থাকেনি। তবে এবার পদ্মা সেতু হওয়ায় মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ঢাকায় চলে এসেছি, এটিই আনন্দ দিচ্ছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ছয়টি পশুর হাটে (গাবতলী, বসিলা, আফতাবনগর, ভাটারা, কাওলা ও উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর) ডিজিটাল পেমেন্ট বুথ বসেছে। হাটগুলোর সংশ্লিষ্ট ইজারাদাররাও তাতে সহায়তা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত