ঈদুল আজহার আর বাকি তিন দিন। গত মঙ্গলবার থেকে সড়ক ও রেলপথে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। গতকাল বুধবার থেকে লঞ্চেও দেশের ভিন্ন প্রান্তের গ্রামের বাড়ি যেতে শুরু করেছে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলার মানুষ। প্রতিবছর ঈদের আগের কয়েক দিন সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘরমুখো মানুষের ভীষণ চাপ থাকলেও এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। গতকাল নৌপথে যারা গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেছে, তাদের ন্যূনতম কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। রেলপথের যাত্রীদের টিকিট পেতে হয়রানির মধ্যে পড়তে হলেও যাত্রা ছিল স্বস্তিদায়ক। চট্টগ্রাম ছাড়া ঢাকা থেকে বিভিন্ন এলাকার সড়কপথও ছিল চাপমুক্ত। তবে সড়কপথে চাপ ছিল মোটরসাইকলের। আজ বৃহস্পতিবার থেকে পরের সাত দিন মহাসড়কে মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ হওয়ায় গতকাল সুযোগ নিয়েছেন দুই চাকার বাহনের চালকরা। ঢাকা-টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ, ঢাকা থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণবঙ্গ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সব সড়কেই ছিল মোটসাইকলের বাড়াবাড়ি।
গতকাল সরেজমিন রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনাল, কলমাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, পাটুরিয়া ঘাট, পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে দেখা যায় এসব চিত্র।
গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একাধিক জায়গায় যানজট বাঁধে। ফলে ঘণ্টারপর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যাত্রী ও চালকদের। বিশেষ করে মেঘনা সেতু এলাকা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত এ যানজটের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই এলাকায় নারী ও শিশুদের গরমের মধ্যে বেশ কষ্ট ভোগ করতে দেখা গেছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া এলাকায় দেখা গেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখী উভয় লেনেই যানজট লেগে আছে। তবে মাঝে মাঝে গাড়ি চললেও গতি ছিল খুবই ধীর। তা ছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় গরুর ট্রাক আসার কারণেও যানজটের মাত্রা তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
সোনারগাঁ থেকে ঢাকাগামী দোয়েল বাসের যাত্রী রফিক বলেন, ‘আমি সকাল সাড়ে ৯টায় বাসে উঠেছি দুই ঘণ্টায় মাত্র মদনপুর পর্যন্ত যেতে পেরেছি। এটুকু পথ যেত স্বাভাবিকভাবে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। এ পথে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ (গতকাল) সকাল থেকেই সড়কে গাড়ির চাপ অনেক গুণ বেড়ে গেছে। অনেকেই আগেভাগে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে। এ জন্য চাপ অনেক বেশি; বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কে অনেক বেড়েছে।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ নবীর হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়াতেই এ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানজট নিরসনে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ এক যোগে কাজ করছে। আশা করি সন্ধ্যার মধ্যেই এ সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
তবে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-আরিচা বা ঢাকা-মাওয়া রুটে গণপরিবহনের তেমন চাপ ছিল না গতকাল। ওই সব রুটের সংশ্লিষ্ট টার্মিনালগুলো থেকে যথাসময়েই ছেড়ে গেছে গাড়ি। তবে কোনো কোনো যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বিত-ায় জড়ান কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে।
এদিকে ঈদে বাইক চলার বিধিনিষেধের আগেই বাইকাররা ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। দেশ রূপান্তরের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, পদ্মা সেতু ও ঈদ উপলক্ষে গতকাল পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বেড়েছে মোটরসাইকেল আরোহীদের সংখ্যা। সেই সঙ্গে যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই পার হচ্ছে যাত্রী ও যানবাহন। কর্র্তৃপক্ষ বলছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ফলে যানবাহন কম থাকায় পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মহিউদ্দিন রাসেল বলেন, ঈদের আগে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ ও যানজটের সেই চিরচেনা দৃশ্য এবার নেই এ নৌরুটে। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। তবে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ নৌরুটে বাড়ছে দুই চাকার বাহন। এদিকে ঈদের আগে ও পরে মিলে ৭ দিন এক জেলার মোটরসাইকেল অন্য জেলায় যেতে পারবে না এমন প্রজ্ঞাপন আসায় আরও চাপ বেড়েছে।
এদিকে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল পারাপার নিষিদ্ধ ও ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হলেও শত শত মোটরসাইকেল আরোহী ভিড় করেন সেতুর টোলপ্লাজায়। কেউ কেউ কৌশলে ট্রাকে মোটরসাইকেল পার করতে পারলেও বেশিরভাগকেই পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ভাড়ায় ট্রলারে পার হতে হয়েছে।
ট্রলারে প্রতি মোটরসাইকেলে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটের অদূরে শিমুলিয়া বাজার ঘাটে এ চিত্র দেখা যায়। ২০-২৫টি ট্রলার দিয়ে এসব মোটরসাইকেল পারাপার করতে দেখা গেছে।
এদিকে, পদ্মা সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল ও ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রাকে করে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল পারাপার করা হচ্ছে। বুধবার সকাল থেকেই এ রকম চিত্র দেখা গেছে। তবে বিকেল ৬টার দিকে পদ্মা সেতুর উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন সম্পূর্ণভাবে ট্রাকে করে মোটরসাইকেল পারাপার বন্ধ করে দেন। এতে রাজধানী থেকে যাওয়া মোটরসাইকেল আরোহীরা বিপাকে পড়েন।
মাওয়া নৌপুলিশ স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু তাহের মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু পদ্মা সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ ও ফেরি চলাচল বন্ধ, সে ক্ষেত্রে অবৈধভাবে কিছু অসাধু ট্রলারচালক এর সুবিধা নিতে চেয়েছেন। আমি এবং আমাদের নৌ-পুলিশ গত মঙ্গলবার রাতে কিছু ট্রলার আটক করি এবং ট্রলারে করে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করে দিই। তবে চোখের আড়ালে যদি ট্রলারে করে মোটরসাইকেল পারাপার করতে পারে। যেহেতু পদ্মা নদী অনেক বড়।’
গত ২৬ জুন থেকে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করে সরকার। ফলে পরের দিন সকাল সোয়া ১০টায় ফেরি কুঞ্জলতা শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে শিমুলিয়া ঘাট ছেড়ে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে মাঝিরকান্দি ঘাটে পৌঁছায়। ফেরিটি ছেড়ে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পর নদীর লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে ডুবোচরে আটকে যায়। প্রায় ৪ ঘণ্টার চেষ্টায় ডুবোচর থেকে ফেরিটি বের হতে সক্ষম হয়। এরপর থেকেই ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেরি চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানায় কর্র্তৃপক্ষ।
গতকাল বাইকের নিষেধাজ্ঞার আগেই রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে নেত্রকোনায় বাইকে করে যান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সাকিব আব্দুল্লাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসের ভাড়া যে বৃদ্ধি, বাসে করে কীভাবে যাব। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ রোডে ২৬০ টাকার ভাড়া আজ (গতকাল) ৫০০ টাকা করে নিয়েছে। তারপরও লাইনের পর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের টিকিটের জন্য। আর বাইকের গেলে এত টাকা খরচ হয় না। অর্ধেকের কম টাকা খরচ হয় বাসের থেকে। তাই নিষেধাজ্ঞার আগেই চলে আসলাম বাইকে করে।’
এদিকে প্রতি বছর এই সময় রাজধানীর সদরঘাটে ঘরমুখো মানুষের চাপ থাকলেও এবার ভিন্ন চিত্র। লঞ্চের টিকিট পেতে দৌড়ঝাঁপ, ধাক্কাধাক্কি, ডেকে জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা এখন অতীত। মূলত পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই বদলে গেছে লঞ্চঘাটের চিত্র। ফলে স্বাভাবিক সময়ের মতো যাত্রী নিয়েই ঢাকা ছাড়ছে লঞ্চগুলো। ঈদ উপলক্ষে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও সদরঘাটে এখন পর্যন্ত যাত্রীদের ভিড় শুরু হয়নি। মালিকেরা বলছেন, যাত্রীদের চাপ শুরু হলে ঈদের বিশেষ সার্ভিসের লঞ্চ দেওয়া হবে।
গতকাল সদরঘাট ঘুরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে সামান্য বেড়েছে যাত্রীর চাপ। তবে ৭ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের কেবিনের টিকিট বুক হয়ে গেছে। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বলছে, বেশিরভাগ লঞ্চের ৮০ শতাংশ কেবিনের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অতীতে যে যাত্রীর চাপ ছিল। এবার তেমনটা নেই। তবে যাত্রীর চাপ বাড়ছে। আশা করি আগামী দুদিন এর সংখ্যা দিগুণ হবে। তবে বিভিন্ন নৌপথের জন্য অতিরিক্ত লঞ্চ প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। যাত্রীর চাপ হলে প্রয়োজনে বিশেষ লঞ্চ পরিচালনা করবেন মালিকেরা।
সদরঘাটে শফিকুল আলম নামে যাত্রী বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় প্রতিটি মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সদরঘাটে এসে। এবার যাত্রী কম, টিকিট পেতেও কোনো ঝামেলা নেই। মানুষের ধাক্কাধাক্কি থেকে মুক্তিও পেয়েছি। স্বস্তির সাথে পরিবার নিয়ে বাড়ি যেতে পারছি। খুব ভালো লাগছে।’
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সদরঘাটে যাত্রীর চাপ কমেছে বলে জানিয়েছেন লঞ্চের স্টাফরা। পারাবত লঞ্চের স্টাফ সুমন খান বলেন, পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল ও অন্যান্য জেলায় যেতে সময় কম লাগছে। রাস্তাও ভালো। মানুষ তাই এখন সড়ক পথকে বেছে নিয়েছে। প্রতিটি ঈদে সদরঘাটে যাত্রীদের খুব বেশি চাপ থাকে। কিন্তু এবার ঈদে যাত্রীদের চাপ খুবই কম। বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রীর চাপ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রেনের আগাম টিকিটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি হলেও ইদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে স্বস্তি নিয়েই ঘরমুখো মানুষকে গন্তেব্য যেতে দেখা যায়। গতকাল বেশিরভাগ ট্রেন সময়মতো ছেড়ে গেছে। এদিন কিছু ট্রেন দেরিতে ছাড়লেও সময়সূচির বিপর্যয় হয়নি। স্টেশনে তেমন একটা ভিড় না থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেন যাত্রীরা।
কমলাপুর স্টেশন থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সিল্ক সিটির যাত্রী মো. সাগর বলেন, ‘টিকিটের জন্য যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল, কিন্তু যাত্রার দিন স্বস্তিতে ট্রেনে করে যেতে পারছি। আমার মতো আরামেই সবাই যার যার গন্তব্যে যেতে পারছেন।’
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মাসুদ সারওয়ার বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের যে কয়টি ট্রেন ঢাকা ছেড়ে গেছে, তার বেশিরভাগই সময়মতো স্টেশন ছেড়েছে। এদিন শুধু রংপুর এক্সপ্রেস দেড় ঘণ্টা, নীলফামারী এক্সপ্রেস আধা ঘণ্টা এবং সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৩৫ মিনিট দেরি করে ছেড়ে গেছে। কারণ ট্রেনগুলো স্টেশনে ফিরে এসেছেই দেরিতে। ট্রেন দেরিতে এলে এখান থেকে সব ব্যবস্থাপনা শেষ করে ছাড়তে একটু দেরিই হয়।’
