সিসিটিভি ফুটেজে আনিসের হাতে পেট্রল থাকার তথ্য মেলেনি

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ০১:৩৪ এএম

জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা আনিসুর রহমান ওরফে গাজী আনিসের (৫০) হাতে পেট্রলের বোতল থাকার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পায়নি পুলিশ। আনিসুর দগ্ধ অবস্থায় যেখান থেকে উদ্ধার হন, সেই স্থানের কোনো ফুটেজও নেই। কীভাবে তার শরীরে আগুন লাগল তারও কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে রাজধানীর শাহবাগ থানার ওসি মো. মওদুদ হাওলাদার গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রেস ক্লাব চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলের কোনো ফুটেজ নেই। ওই স্থান সিসিটিভির আওতার বাইরে।

আনিসুর দাহ্য তেলের বোতল হাতে নিয়ে প্রেস ক্লাব চত্বরে ঢোকার কোনো ফুটেজ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো আমরা এমন কোনো ফুটেজ পাইনি।’ ফলে আনিসুরের মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকেই যাচ্ছে।

পাওনা টাকা নিতে গিয়ে লাশ হওয়ার বিষয়টিও আনিসুরের স্বজনেরা আত্মহত্যা মানতে পারছেন না। তাদের দাবি, ভালো করে তদন্ত করলে আসল বিষয় বের হবে।

এদিকে আনিসুরকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার ব্যবসায়ী নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতিমা আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। মামলাটি থানা পুলিশ থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির রমনা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) বায়েজীদুর রহমান।

আনিসুরের সঙ্গে লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (হেনোলাক্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন ও পরিচালক ফাতেমা আমিন। তবে আনিসুরের দাবি করা টাকার পরিমাণের সঙ্গে কিছুটা অমিল রয়েছে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানান তারা।

মো. নুরুল আমিন ও পরিচালক ফাতেমা আমিনকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গাজী আনিসের সঙ্গে লেনদেনে টাকার পরিমাণ নিয়ে আসামিদের আপত্তি আছে। লেনদেন হয়েছে তা জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন। বিভিন্ন সময়ে চেকে ও নগদে ৭৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে গাজী আনিসের লভ্যাংশসহ ন্যায্য পাওনা তিন কোটি টাকা। এটা নিয়েই মূলত তাদের মধ্যে একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয়েছে।

আনিসুরের মৃত্যুর ঘটনায় শাহবাগ থানায় হওয়া আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার বরাত দিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, ২০১৭ সালে আমিন গ্রুপের কর্ণধার নুরুল আমিন এবং তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের সঙ্গে ভুক্তভোগী আনিসুরের পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে আনিসুরের সখ্য এবং আন্তরিকতা গড়ে ওঠে। গ্রেপ্তারকৃতরা ২০১৮ সালে চিকিৎসার জন্য পাশর্^বর্তী একটি দেশে গেলে সেখানে স্থানীয় একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থানকালে গাজী আনিসকে হেনোলাক্স কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য প্ররোচিত করেন। প্রথমে অসম্মতি জানালেও পরে রাজি হন এবং প্রাথমিকভাবে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। এরপর তাদের প্ররোচনায় তিনি আরও ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। অধিকাংশ টাকাই আনিসুর ঋণ হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার নিয়েছিলেন। বিনিয়োগ করার সময় পরস্পরের প্রতি সম্মান এবং বিশ^াসের কারণে তাদের মধ্যে কোনো চুক্তিনামা করা হয়নি। বিনিয়োগ-পরবর্তী চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র সম্পাদনে গড়িমসি করতে থাকেন নুরুল আমিন ও ফাতেমা। একপর্যায়ে প্রতি মাসে লভ্যাংশ প্রদানও বন্ধ করে দেন। কয়েকবার আনিসকে হেনস্তা-ভয়ভীতিও দেখানো হয়।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, টাকা উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার আদালতে দুটি মামলা করেন গাজী আনিস। এ ছাড়া ওই টাকা ফিরে পাওয়ার জন্য গত ২৯ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। গত ৩১ মে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে পাওনা টাকা আদায়সংক্রান্তে মামলার বিষয়টি পোস্ট করেন। বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে সহায়তা চান।

গত সোমবার বিকেল ৫টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে শরীরে আগুন লেগে গুরুতর দগ্ধ হন আনিসুর। তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সেখানে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় পরদিন মৃত্যু হয় তার। আনিসের শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামে। বাবার নাম মৃত ইব্রাহীম হোসেন বিশ্বাস। আনিসুর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ শাখার সাবেক সভাপতি। ১৯৯৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত