তদন্ত রিপোর্ট চাপা পড়ে আছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ০১:৩৬ এএম

প্রতিটি বড় অগ্নিকান্ডের পর সরকার বাহারি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে আশার বাণী শোনায়। কিন্তু কিছুদিন পর সব থেমে যায়। এমনকি তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দেয় তা পড়েও দেখেন না সংশ্লিষ্টরা। যাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে নিরীহ শ্রমিকের প্রাণ যায় তারা বহাল তবিয়তে থাকেন। তারা শুধু ওই পদেই বসে থাকেন না ‘তারা নিজেদের তদন্ত নিজেরাই করেন’। মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের আশীর্বাদপুষ্ট মাঠপর্যায়ের এসব কর্মকর্তা ‘যাক, এবারের মতো সামাল দেওয়া গেছে’ বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। তারা প্রস্তুতি নেন পরবর্তী অগ্নিকান্ডের ধকল সামলানোর।

নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডের কারখানার অগ্নিকা-েও একই ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ৮ জুলাইয়ের অগ্নিকান্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর পর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। পুরো বিষয়টি সমন্বয় করার জন্য সেল গঠন করা হয়। সরকারের এসব কমিটি ও সেলের পাশাপাশি নাগরিক কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে। আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করা হলেও অর্ধ ডজন তদন্ত কমিটি বা সেলের কাজ একই।

এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর তদন্ত কমিটি ছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। নির্ধারিত সদস্যদের বাইরে এ কমিটিতে মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন কমিটির আহ্বায়ক কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্মমহাপরিদর্শক ফরিদ আহাম্মদ। তাতে অগ্নিকা-ের কারণ, ঘটনা বিশ্লেষণ এবং কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল। সেটি জমা দেওয়া হয়েছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক নাসির উদ্দিন আহমদের কাছে। তিনি তা পৌঁছে দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহীর কাছে। সচিব তা পাঠিয়ে দেন মন্ত্রণালয়ের শ্রম শাখায়। এরপর তদন্ত রিপোর্টটি নিয়ে কোনো কাজ হয়নি; কমিটির বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করা হয়নি, তাদের পর্যবেক্ষণও আমলে নেওয়া হয়নি। কমিটির সুপারিশ ফাইলচাপা পড়ে রয়েছে।

শুধু অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনই চাপা পড়েনি। চাপা পড়ে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনও। খোদ শ্রম মন্ত্রণালয় যে তদন্ত কমিটি করেছিল তা শুরুতেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। দায়সারা সে তদন্ত কমিটি হয়েছিল প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান ও তৎকালীন শ্রম-সচিব আবদুস সালামের একান্ত সচিবদের (পিএস) নিয়ে। অগ্নিকা-ের চারদিন পর মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। গঠনের আগে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কাছে কমিটি গঠন সংক্রান্ত আদেশের নমুনা চাওয়া হয়। নমুনা দেখে মন্ত্রণালয় যে কমিটি করে তার কার্যপরিধি হুবহু অধিদপ্তরের কমিটির মতো ছিল।

পাঁচটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে কী কী সুপারিশ করা হয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে তা জানতে গত রবি ও সোমবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, সচিব এহছানে এলাহী, অতিরিক্ত সচিব মাসুদ করিমসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বরাবরের মতোই না করে দেওয়া হয়। সচিব এহছানে এলাহীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তার দপ্তরে গেলে তার একান্ত সচিব (পিএস) মো. জাহাঙ্গীর আলম কথা বলার প্রসঙ্গ জানতে চান; জানানোর পর পিএস বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অতিরিক্ত সচিবই যথেষ্ট। অতিরিক্ত সচিবের দপ্তরে গেলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি। ফের সচিবের দপ্তরে গেলে পিএস পরামর্শ দেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সে চেষ্টাও করা হয়েছে জানানোর পর পিএস বলেন, আপনি যুগ্মসচিবের কাছে যান।

দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি তখন জানান, তিনি সচিবের সঙ্গেই কথা বলতে চান। মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টিং অফিসার হিসেবে সচিবই এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার রাখেন, অধীনস্ত কোনো কর্মকর্তা নন। তখন পিএস জানান, ‘সচিব স্যার মন্ত্রীর রুমে।’

এক পর্যায়ে মন্ত্রীর রুম থেকে ফিরে অন্য দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বললেও সচিব দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিকে সময় দেননি। পিএস তখন সচিবের রুমে ছিলেন। পরে পিএস বের হয়ে বলেন, ‘কিছু ফাইল দেখতে স্যারের সময় লাগবে।’

জবাবে অপেক্ষা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে এ প্রতিনিধিকে পিএস বলেন, ‘স্যার এ ব্যাপারে কথা বলবেন না। বিষয়গুলো স্যারের দেখার সময় হয়নি। স্যার ঘটনার খুঁটিনাটি জানেন না।’

তদন্ত কমিটি গঠন এবং সুপারিশ কার্যকর না করার বিষয়টি জেনে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। সম্ভব হলে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করা গুড গভর্নেন্সের অন্তরায়। আমরা নানা ক্ষেত্রে উন্নতি করছি। গুড গভর্নেন্সেও উন্নতি দরকার। একসময় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্র ও সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তার প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়েছিল। সব সময়ই এ ধরনের কমিশন বা কমিটির প্রতিবেদন জনগণকে জানানো উচিত।’ 

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতায় হাসেম ফুডের কারখানা। সেখানে ৯টি ভবন ও ১৫টি শেড রয়েছে। যে ভবনে অগ্নিকা- হয়েছে সেটি ছিল ৬ তলা। ওই সময় নারায়ণগঞ্জের উপপরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন সোমেন বড়ুয়া। এখনো তিনি ওই পদে কর্মরত। মূলত পরিদর্শনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ ওঠার পরও সোমেন বড়ুয়াকে জেলা প্রশাসনের তদন্ত দলের সদস্য সচিব করা হয়েছে। তার যথাযথ তদারকির অভাব থাকলেও সোমেন বড়ুয়াকে দিয়েই তদন্ত করানো হয়েছে।

সোমেন বড়ুয়া অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, পরিদর্শন যথাযথভাবেই হয়েছে। অগ্নিকা-ের আগে কারখানা পরিদর্শনের ভিত্তিতে মামলাও হয়েছে। নিয়মিত পরিদর্শনে কোনো ঘাটতি ছিল বলে মনে করি না।

নিহত শ্রমিকদের ৪৬ পরিবারের মধ্যে চেক বিতরণ করেছে সরকার। বাকি ৬ পরিবারের মধ্যে এখনো চেক বিতরণ সম্ভব হয়নি। নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এগিয়ে এসেছে কারখানা কর্তৃপক্ষও। তারাও নিহত-আহতদের পরিবারকে সহায়তা দিয়েছে।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রমিক নেতারা বলেছেন, একের পর এক অগ্নিকা- ও ভবন ধসের ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাণ গেলেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকা-, স্পেকট্রাম কারখানায় ধস, রানা প্লাজায় ধস, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানায় আগুন, হামীম গ্রুপের কারখানায় আগুন, নিমতলীর কেমিক্যাল কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানায় নিহত ও আহত শ্রমিকরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি। বিচার হয়নি বেশিরভাগ ঘটনার। যার কারণে মালিকদের বেপরোয়া শোষণের শিকার হতে হচ্ছে শ্রমিকদের। শ্রমিকরা অনিরাপদ পরিবেশে জীবিকার তাগিদে জীবনকে তুচ্ছ করে কাজ করতে বাধ্য হয়। কারখানা থেকে বের হওয়ার গেটে তালা বন্ধ করে রাখায় এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকায় এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ দপ্তরের মূল সমস্যা হচ্ছে অকাজের সংস্কৃতি; অর্থাৎ কাজ না করার প্রবণতা। প্রথম অজুহাত হলো জনবলের অভাবে কারখানা পরিদর্শন সম্ভব হচ্ছে না। আসলে জনবলের কোনো ঘাটতি নেই। যে ঘাটতি রয়েছে তা সব সময়ই থাকবে। ডিআইজিদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। বড় কারখানা নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। কারখানা পরিদর্শনের বিকল্প নেই। এছাড়া দপ্তরে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ গড়ে ওঠেনি; পদোন্নতি হয় না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘এক্সট্রা ইনকামের’ ধান্ধায় থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে চলতি দায়িত্বের নামে যে পদোন্নতি দেওয়া হয় অনেক ক্ষেত্রেই তা টাকার বিনিময়ে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একদিকে সরকার ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে অন্যদিকে টাকা না দিলে কারখানার লাইসেন্স পান না বিনিয়োগকারীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত