সীতাকুন্ডু ও নারায়ণগঞ্জে ভিন্ন চিত্র

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ১০:২৯ পিএম

বড় ধরনের সব অগ্নিকান্ডের পরই তদন্ত কমিটি গঠিত হয় কিন্তু সব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। আবার অনেক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও সে অনুযায়ী দোষীদের বিচারের আওতায় আনার খবর পাওয়া যায় না। আর তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের খবর তো পাওয়াই যায় না। বরং পরবর্তী কোনো অগ্নিকান্ডের পর গঠিত নতুন কোনো কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, পূর্ববর্তী ঘটনার পর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে ধরনের অগ্নিকান্ড ঘটত না। যেমন এবার চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর বিস্ফোরণে মারাত্মক অগ্নিকানে্ডর ঘটনায় ডিপো কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটি। প্রশ্ন হলো, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে এই অগ্নিকান্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিবর্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি? আবার এটাও বলা যায় যে সীতাকুন্ডের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেল। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে হাসেম ফুডের কারখানায় মারাত্মক অগ্নিকান্ডের এক বছর পূর্ণ হলেও আজ অবধি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেল না। অথচ ওই অগ্নিকান্ডের তদন্ত করতে আলাদা আলাদা পাঁচটি কমিটি এবং একটি তদন্ত সমন্বয় সেলও গঠন করা হয়েছিল। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে সীতাকু- নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের এই ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে কেন?

 বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরেরআগুনের জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষ দায়ীশিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সীতাকুন্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর বিস্ফোরণে মারাত্মক অগ্নিকান্ডে জন ফায়ার ফাইটারসহ ৫০ জনের মৃত্যু এবং দুই শতাধিক আহতের ঘটনায় ডিপো কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে কন্টেইনার ডিপোর কার্যক্রম তদারকিতে নিয়োজিত ২৫ সংস্থার সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলোর কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা কাস্টমস কর্তৃৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার যে অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সে বিষয়ে এখন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে কি? বাকি কন্টেইনার ডিপোগুলোর নথিপত্র এবং কর্মকান্ডের মধ্যে কতটা ফারাক আছে সেই বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি? আর ডিপোগুলোতে ভবিষ্যতে ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি যে ২০ দফা সুপারিশ করেছে সেসব বাস্তবায়নের আশু পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাব কি? নাকি প্রভাবশালী মহলের চাপে এসব সুপারিশ কেবল কাগজপত্রেই থেকে যাবে? স্মরণ করা যেতে পারে, সীতাকুন্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে মারাত্মক অগ্নিকান্ডের পর বিভিন্ন মহল থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমানের মালিকানার বিষয়টি গৌণ করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মুজিবুর রহমান তার ভাই মোস্তাফিজুর রহমানকে বিএম ডিপোর ৫১ শতাংশের আল রাজী কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের শতভাগ মালিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে মুজিবুর রহমান মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

 অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরেতদন্ত রিপোর্ট চাপা পড়ে আছে শ্রম মন্ত্রণালয়েশিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত বছরের জুলাই নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডের কারখানার অগ্নিকান্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর পর শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসন একটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সরকারের এসব কমিটির পাশাপাশি নাগরিক কমিটি নামে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে। আর পুরো বিষয়টি সমন্বয় করার জন্য সেল গঠন করা হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর তদন্ত কমিটি ছিল কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। কিন্তু এখনো সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। এই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক নাসির উদ্দিন আহমদের কাছে। তিনি তা পৌঁছে দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহীর কাছে। সচিব তা পাঠিয়ে দেন মন্ত্রণালয়ের শ্রম শাখায়। এরপর তদন্ত রিপোর্টটি নিয়ে কোনো কাজ হয়নি; কমিটির বিশ্লেষণ পর্যালোচনাও করা হয়নি, তাদের পর্যবেক্ষণও আমলে নেওয়া হয়নি। কমিটির সুপারিশ ফাইলচাপা পড়ে রয়েছে। শুধু অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনই চাপা পড়েনি। চাপা পড়ে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনও। এই বাস্তবতা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আর দপ্তরগুলো দেশে এত মারাত্মক সব অগ্নিকান্ডের ঘটনার পরও কতটা নির্বিকার, কতটা উদাসীন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার এই গাফিলতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত এবং সবগুলো কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত