সরকার ও দলে নজিরবিহীন চাপে পড়ে দলীয় প্রধানের পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। গত তিন দিন ধরে যুক্তরাজ্যে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের পদত্যাগের পর গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের প্রধানের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বরিস জনসন। তবে দলের নতুন নেতা বেছে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রভাবশালী সদস্য ও বিরোধী দলের অনেকে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করতে বা অনাস্থার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরিস জনসনের ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে।
বরিস জনসন নেতৃত্বাধীন সরকার ঘিরে কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা গত মঙ্গলবার নতুন মাত্রা পায়। এদিন মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এরপর জুনিয়র মন্ত্রী ও এমপিদের পদত্যাগ এবং অনাস্থা জানানোর হিড়িক শুরু হয়। গত বুধবার রীতিমতো পদত্যাগের বন্যা বয়ে যায়। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। ২৪ ঘণ্টায় ৪০ জনের বেশি মন্ত্রী ও সহযোগী পদত্যাগ করেন। গতকাল সকাল নাগাদ সেটা প্রায় অর্ধশত জনে গিয়ে ঠেকে।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের একটি দল ডাউনিং স্ট্রিটে যায় প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে রাজি করাতে। তবে পদত্যাগ না করার বিষয়ে অনড় থাকেন বরিস জনসন। গত নির্বাচনে ভোটারদের ‘বিপুল ম্যান্ডেট’ পাওয়ায় তার পদত্যাগের কোনো ইচ্ছা নেই বলে জানান। পার্লামেন্টের অধিবেশনেও একই ইঙ্গিত দেন তিনি। কিন্তু সকালেও মন্ত্রিসভা ও দল থেকে পদত্যাগের ধারা অব্যাহত থাকে। তারা অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর ওপর অনাস্থা জানিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। অব্যাহত চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করেন বরিস।
তিন বছরেরও কম সময় আগে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন বরিস জনসন। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে রয়েছে করোনাভাইরাস মহামারীতে আরোপিত লকডাউনের বিধিনিষেধ ভেঙে পার্টি আয়োজন ও জরিমানা প্রদান। এর মধ্যে একজন কনজারভেটিভ পার্লামেন্ট সদস্যের (এমপি) বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী আমলে না নেওয়ায় অসন্তোষ তীব্র হয়।
গতকাল ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে জনসন বলেন, ‘দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখন থেকেই শুরু করা উচিত। আর নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাসীন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী সময়ে একটি নতুন মন্ত্রিসভা নিয়োগ করা হবে।’
তিনি জানিয়েছেন, তিনি কনজারভেটিভ পার্টির ১৯২২ কমিটির প্রধান স্যার গ্রাহাম ব্র্যাডির সঙ্গে কথা বলেছেন। তাকে তিনি বলেছেন, নতুন নেতা খোঁজার প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা উচিত এবং আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে কাজ করার দিন তারিখ ঠিক করা হবে।
তাছাড়া যেসব মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন সেসব মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী নিয়োগ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বরিস জনসন বলেন, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সেরা কাজটি ছেড়ে দেওয়ায় অত্যন্ত দুঃখিত। তবে তিনি বিষয়টি মেনে নিয়েছেন।
এদিকে কীভাবে জনসনের উত্তরসূরি খোঁজা হবে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে সে বিষয়টি তুলে ধরেছে
দলীয় প্রধান হতে প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন একাধিক নেতা। প্রত্যেক প্রার্থীকে দুজন কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতা দ্বারা মনোনীত হতে হবে। এরপর কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতারা একাধিক পর্বের ভোট আয়োজন করবেন। প্রতিটি পর্বে গোপন ব্যালটে তাদের পছন্দের প্রার্থীর কথা জানতে চাওয়া হবে। সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থী লড়াই থেকে ছিটকে পড়বেন। দুজন প্রার্থী অবশিষ্ট থাকার আগ পর্যন্ত এই ভোট প্রক্রিয়া চলবে। এরপর চূড়ান্ত দুই প্রার্থীকে নিয়ে পোস্টাল ব্যালট ছাপা হবে দলের সদস্যদের জন্য। এতে জয়ী প্রার্থী হবেন দলের নতুন নেতা। হাউজ অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাই ডি ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্ব চালিয়ে যেতে আগাম নির্বাচন আয়োজনের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু চাইলে তিনি তা করতে পারেন।
কনজারভেটিভ দলের নেতা নির্বাচনে সময়ের ব্যাপ্তি ভিন্ন হয়। এটি নির্ভর করে কতজন নেতা প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের তিন সপ্তাহেরও কম সময়ে নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন থেরেসা মে। ২০১৯ সালে দলীয় নেতা হতে জনসনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। থেরেসা মে পদত্যাগের দুই মাস পর ক্ষমতায় আসেন জনসন।
