বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানির পেছনে ব্যয় হয়েছে মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ। এ সময়ে ১ হাজার ২৩ কোটি ডলারের টেক্সটাইল ফেব্রিক ও গার্মেন্ট এক্সেসরিজ আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে (প্রবৃদ্ধি ৪৬ শতাংশ)। সুতি, সিন্থেটিক ও মিশ্র ইয়ার্ন আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৪২০ কোটি ডলারের (প্রবৃদ্ধি ১০৬ শতাংশ)। কাঁচা তুলা ও সিন্থেটিক আঁশ আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩২৯ কোটি ডলারের (প্রবৃদ্ধি ৩৫ শতাংশ)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, আলোচিত ১১ মাসে সব ধরনের পণ্য আমদানির জন্য ৭ হাজার ৫১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে গার্মেন্ট খাতের কাঁচামাল আমদানির এলসি ছিল ১ হাজার ৭৭২ কোটি ডলারের। যা মোট নিষ্পত্তিকৃত এলসির ২৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এছাড়া বড় প্রবৃদ্ধি রয়েছে অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল, ওষুধ, সার, রাসায়নিক, জ্বালানি তেল, কয়লা, পরিশোধিত ভোজ্য তেল, চাল, চিনি ও গম আমদানিতে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪২ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৫৬ কোটি ডলারের এলসি। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৫ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৫৮ কোটি ডলারের এলসি। কয়লা ও কোক আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০৮ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৬২ কোটি ডলারের এলসি। জ্বালানি তেলের আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪১ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৪০০ কোটি ডলারের এলসি।
সার ও রাসায়নিক আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮৫ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৯৮ কোটি ডলারের এলসি। পরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৮ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৯ কোটি ডলারের এলসি। ওষুধ আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫১৭ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৮ কোটি ডলারের এলসি।
আলোচিত ১১ মাসে গম আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭৪ কোটি ডলারের এলসি। চাল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯৯ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭৩ কোটি ডলারের এলসি। চিনি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৩ শতাংশ, নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৭ কোটি ডলারের এলসি।
তবে আমদানির পরিমাণ বাড়ার কারণে এই ব্যয় বাড়েনি। মূলত বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, গত অর্থবছরে জ্বালানিসহ আমদানি করা প্রধান ৮টি পণ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির কারণে একই পরিমাণ আমদানিতে এই ৮টি পণ্যে গত বারের চেয়ে ৯০০ কোটি ডলার বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
কভিড মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। সেই প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে গভর্নর রউফ বলেন, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি হয়নি। এটা এসেছে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে পয়েন্ট-টু পয়েন্টে ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭.৪২ শতাংশে। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
তবে সার ও জ্বালানিতে সরকার ভর্তুকি দেওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিতে এ খাতের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির তেমন প্রভাব নেই। তাছাড়া ওষুধ খাতের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও ছিল মূলত করোনার টিকার কারণে। ফলে সামগ্রিকভাবে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি ৪৮ শতাংশ বাড়লেও এর একটি বড় অংশ সরকারি খাতের আমদানি হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব তুলনামূলক কম পড়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, আলোচিত ১১ মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে ৮ হাজার ৪৮৫ কোটি ডলারের আমদানি এলসি খোলা হয়। আরও ৩ হাজার ১৮৪ কোটি ডলারের এলসি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। আলোচিত সময়ে ভাঙার উদ্দেশ্যে আনা জাহাজ আমদানিতে ১০৮ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ খাতের আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশ। এছাড়া ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের।
বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে কেবল বিদেশ থেকে তাজা ফল ও শুষ্ক ফল আমদানি কমেছে ৬ শতাংশ। আলোচিত সময়ে তাজা ফল ও শুষ্ক ফল আমদানিতে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে পণ্য আমদানিতে ৪৫ কোটি ৪১ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল।
