টাকার দর আরও ৫০ পয়সা কমল

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২২, ০১:২৮ এএম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়ে গত মঙ্গলবার আবদুর রউফ তালুকদার মুদ্রা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানানোর পরের দিনই ৫০ পয়সা দাম কমল টাকার। গতকাল বুধবার আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের দর বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৯৫ টাকা। আগের দিন মঙ্গলবার ডলারের আন্তঃব্যাংক দর ছিল ৯৩ দশমিক ৪৫ টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডলারের চাহিদা বেশি থাকায় দর বাড়ানো হয়েছে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে।’

এ নিয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৫৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলার সরবরাহ করতে গিয়ে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভেও চাপে পড়ছে। গত মঙ্গলবার রিজার্ভ কমে ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। যা ছিল গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এ বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেশি। এ কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। বাড়তি এ ব্যয় মেটাতে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করতে হচ্ছে।’ বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৭৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যাংকগুলোকে জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে কখনোই এত ডলার বিক্রি করতে হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংককে। বরং এর আগের অর্থবছরে ৭৯৩ কোটি ডলার বাজার থেকে কিনেছিল ব্যাংক খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এদিকে গতকাল আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ৫০ পয়সা বাড়ার পরপরই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমদানি পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে এক ডলারের জন্য ৯৪ টাকা করে নিতে শুরু করে। অবশ্য নগদ (ক্যাশ) ডলারের দর আগের মতোই ৯৭ টাকায় স্থির ছিল। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার ও ইউরোর দাম সমান হলেও বাংলাদেশে ইউরোর দর এখনো কিছুটা বেশি রয়েছে। গতকাল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমদানি পর্যায়ে এবং নগদ (ক্যাশ) ইউরো উভয় ক্ষেত্রেই দর রাখে প্রায় ৯৮ টাকা করে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের অনেক দেশেই তেল, গমসহ বেশ কয়েক ধরনের পণ্যের সংকট তৈরি হয়। এতে এসব পণ্যের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবহন খরচও বেড়েছে। যে কারণে সারা বিশ্বেই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। ফলে এক দেশ থেকে অন্য দেশে একই ধরনের পণ্য আমদানির খরচ আগের থেকে বেড়েছে। বাড়তি এ আমদানি ব্যয় মেটাতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের নির্ভরতাও বহুগুণে বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ফেরত নিয়ে যাওয়ার কারণেও দেশে ডলারের সংকট বাড়ছে। যে কারণে বাংলাদেশসহ অনেক দেশই তাদের স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে গত দুই মাসে ডলারের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ২৫ টাকা। অর্থাৎ এক ডলারের বিপরীতে টাকার দর এ পরিমাণ কমেছে।  গত ১২ মে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবিনিময় হার অনুযায়ী এক ডলারের দর ছিল ৮৬ দশমিক ৭০ টাকা।

পাশর্^বর্তী দেশ ভারতও তাদের রুপির অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। গত দুই মাসে ডলারের বিপরীতে রুপির দাম কমেছে ২ রুপিরও বেশি। গত ১২ মে এক ডলার কিনতে ব্যয় করতে হয়েছে ৭৭ দশমিক ৪২ রুপি। গতকাল এ দর বেড়ে হয় ৭৯ দশমিক ৮১ রুপি।

যদিও সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) তাদের স্থানীয় মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে চালু করতে বিশেষ একটি পদ্ধতি অবলম্বন শুরু করেছে। মূলত রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেনসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য এ পদ্ধতি চালু করা হয়। এ পদ্ধতিতে ভারতীয় রুপিতে বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতারা লেনদেনের জন্য রাজি থাকলে একটি অতিরিক্ত চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে এ আমদানি-রপ্তানি সংঘটিত হবে। বাংলাদেশেও এমন একটি মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) ব্যবস্থার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এতে রাশিয়ার সঙ্গে রুবল ও টাকায় পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২তম গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়েছেন সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। ওইদিন বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রিজার্ভ বৃদ্ধির কাজকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানান। এ সময় কীভাবে টাকার মান ধরে রাখা যায় সে বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। বাণিজ্য ঘাটতির কারণে ডলারের চাহিদা বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন রউফ তালুকদার। এর পরের দিনই অবমূল্যায়ন ঘটে টাকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে আমদানি ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ডলারে ঠেকেছে। অন্যদিকে রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৪৫৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এখানে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল রেকর্ড ৩ হাজার ৮২ কোটি ডলার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত