ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ কমার লক্ষণ নেই। তাপমাত্রা চরমে চলে যাওয়ায় দাবানলে জ্বলছে পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। শুষ্ক আবহাওয়া অন্যদিকে গরম বাতাসের তীব্রতা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর রেকর্ড তাপমাত্রার পূর্বাভাসের মুখে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ইংল্যান্ডে জারি করা হয়েছে তাপপ্রবাহের লাল সতর্কতা। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের সোম এবং মঙ্গলবার ইংল্যান্ডের কয়েকটি অংশে ‘তাপপ্রবাহের চরম সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে, ওই সময় তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারে।
স্পেন-পর্তুগালের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পর্তুগালে তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রিতে উঠে গেছে। দুই দেশে তাপপ্রবাহে এখন পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব অঞ্চলে আগুনের সঙ্গে লড়াই করছে হাজারো অগ্নিনির্বাপণকর্মী। উড়োজাহাজ এবং হেলিকপ্টার দিয়ে পানি ও অগ্নিনিরোধক পদার্থ ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে। পর্তুগালে স্পেন সীমান্তের কাছে আগুন নেভাতে গিয়ে পানিবাহী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন এক পাইলট।
পর্তুগালের উত্তর-পূর্বের পোর্তো এলাকা দাবানলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানে প্রায় ৭৫ হাজার একর এলাকা দাবানলে পুড়ে গেছে, যা ২০১৭ সালের ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে যাওয়া এলাকার চেয়ে আয়তনে বেশি।
প্রকৃতির এই ভয়ালরূপ দেখে আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইউরোপের দাবানলে ভুক্তভোগীদের ভাষ্য। প্রতিবেদনে দক্ষিণ স্পেনের মিহাস এলাকায় বসবাসকারী অ্যাশলে বেকার নামে একজন বলেন, ‘শুক্রবার সবচেয়ে ভয়াল রূপ দেখিয়েছে দাবানল, আমাদের এলাকায় ৪০টি বাড়ি, সবাই খুব ভয়ের মধ্যে ছিল, কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে, কেউ ব্যালকনি থেকে তাকিয়ে দেখছিল, তবে বাতাসের কারণে আগুন দিক বদলানোয় আপাতত আমরা রক্ষা পেয়েছি।’
ফ্রান্সের জিরোন্দে অঞ্চলে চলছে দাবানলের তাণ্ডব। সেখানে বসবাসকারী ১২ হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভয়াবহ দাবানলে দক্ষিণ স্পেনে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন ২ হাজার ৩০০ মানুষ। এসব এলাকার পাহাড়গুলোতে লাগা আগুনের লেলিহান শিখা এবং ঘন ধোঁয়া দূর থেকে দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমের কারিন নামের একজন এএফপিকে বলেন, ‘বনে দাবানল দেখে মনে হয়েছে যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে।’
দেশটিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলে গেছে এবং আগামী সপ্তাহে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফরাসি অগ্নিনির্বাপক ফেডারেশনের প্রধান গ্রেগরি এলিওন বলেছেন, ‘২০৩০ সাল নয়, তার আগেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে। তাপ বাড়ছে, দাবানল মোকাবিলায়, সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের লড়াইতে নামতে হচ্ছে।’
স্পেন-পর্তুগাল এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ছাড়াও তীব্র তাপপ্রবাহে ভুগছে ভূমধ্যসাগরীয় আরও কয়েকটি দেশ। ইতালির কিছু এলাকায় জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা, গ্রিসের ফেরিজা এলাকায় দাবানলের সঙ্গে লড়ছেন অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা, ক্রিট উপকূলীয় এলাকার সাতটি গ্রামের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দাবানলের মুখে উত্তর মরক্কোর বেশ কয়েকটি গ্রামও বাসিন্দাশূন্য।
বিবিসি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের মানব সৃষ্ট কারণে এখন প্রায়শই তাপপ্রবাহ, দাবানল বাড়ছে। আগের চেয়ে এই দুর্যোগ তীব্রতর ও দীর্ঘতর হচ্ছে। শিল্প বিপ্লবের যুগ শুরুর পর পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের সরকারগুলো কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে না আনছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়তেই থাকবে।
