এলজিইডিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ১০:২৩ পিএম

রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে জনপরিসরে রাষ্ট্রীয় যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হয় তার অন্যতম হলো দুর্নীতি। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে বিপুল উন্নয়ন কর্মকা- চলতে থাকলেও এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল ভোগ করা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চলতে থাকা সীমাহীন দুর্নীতির কারণে। অন্যদিকে, প্রায় এক যুগ ধরে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের বহুল উচ্চারিত রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলোর একটি হলো ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’। কিন্তু তাতে যে পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হয়েছে সেটা দৃশ্যমান নয়। বলা বাহুল্য দুর্নীতির অভিযোগের কম সংখ্যক ঘটনারই যথাযথ তদন্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে দোষী হিসেবে প্রমাণ হওয়ার পরও দুর্নীতিতে যুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিচার হয়নি। আর এর অনিবার্য ফল হিসেবে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে, আজকাল অনেক সরকারি প্রকল্পে অনুমোদনের পর্যায়েই দুর্নীতির নীলনকশা গুছিয়ে রাখা হয় এবং সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সবাই যাতে সুবিধাভোগী হতে পারেন সেটা নিশ্চিত করা হয়। সর্বশেষ দেখা গেল, সরকারের একটি অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের বিধিবিধান ও সংবিধান লঙ্ঘন করে নিজেদের মতো ছক কেটে দুর্নীতির এক অভিনব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি করে নিয়েছে।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘এলজিইডির ২% কারসাজি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অধিদপ্তরের অভিনব এক দুর্নীতির ছকের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নে ২৬ হাজার ৫১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প থেকে ‘ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট ব্যয়’ বা ‘সার্ভিস চার্জ’ নামে ২ শতাংশ হারে ৫১৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা নিয়ে নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ‘ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট ব্যয়’ নাম দিয়ে এই অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো আইন বা বিধিবিধান মানা হয়নি। এমনকি লঙ্ঘন করা হয়েছে সংবিধান। এ ধরনের অনিয়ম চালিয়ে যেতে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত সরকারি দপ্তরগুলোকে এলজিইডির পক্ষ থেকে ৯৭টি গাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছে। ফলে যেসব সংস্থা প্রকল্প অনুমোদন করে তারা সব জেনেও এ অনিয়মে বাধা দেয়নি। এই বিপুল পরিমাণ টাকা এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর নামে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছিল। যার বেশিরভাগই পরবর্তী সময়ে নানা খাতে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

  দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এলজিইডির সংগৃহীত এই অর্থ কর্মচারীদের বেতন, আসবাব, জ্বালানি ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, বুথ অপারেশন, স্টেশনারি ক্রয় ও অন্যান্য খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ এই জাতীয় সব খরচ অধিদপ্তরের জন্য নির্দিষ্ট পরিচালন খাতের বাজেট থেকেই আসার কথা এবং সেটাই হয়ে থাকে। তাহলে এই অর্থ এসব খাতে ব্যয় দেখানো হলো কীভাবে? সেটাও তো অডিটে ধরা পড়ার কথা। অন্যদিকে, এলজিইডি ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো যারা সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করে থাকে তেমন দ্বিতীয় কোনো সংস্থার ‘ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট ব্যয়’-এর মতো অভিনব নাম দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার নজির নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ও বলছে, এভাবে অর্থ আদায় ও খরচের আইনগত কোনো বৈধতা নেই। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পেই নয়, সরকারের আরও বেশ কয়েকটি সংস্থার কাজ করতে গিয়ে এলজিইডি এভাবে অর্থ নিয়েছে। যদিও প্রকৌশল কাজের সঙ্গে জড়িত সরকারের অন্য সংস্থা এ ধরনের কোনো অর্থ নেয় না। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠলে তা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিশদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

খেয়াল করা দরকার, এলজিইডির এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকান্ডের ঘটনা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ালে তিনি এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু আজ অবধি বিষয়টির সুরাহা হয়নি। উপরন্তু দেখা যাচ্ছে এলজিইডির কর্মকর্তারা এখনো দাবি করে যাচ্ছেন যে এই ২ শতাংশ তথাকথিত ‘ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট ব্যয়’ না পেলে তারা নিজস্ব রুটিন কর্মকান্ড ছাড়া সরকারের অন্য কোনো প্রকল্পের কাজ করবেন না। তাদের দাবি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছাড়া যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ তারা করবে, সেখানে ২ শতাংশ হারে এই অর্থ তাদের দিতেই হবে। এই পরিস্থিতিতে সবার আগে এলজিইডির এমন সব কর্মকান্ডের বিশদ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সরকারের অন্য কোনো সংস্থা যাতে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতিকে এমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত