তলপেটে সার্বক্ষণিক ব্যথা ও চিকিৎসা

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ১১:১৮ পিএম

‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ বা অসময়ে তলপেটে সার্বক্ষণিক ব্যথা হলো মেয়েদের এক ধরনের অসুখ। জরায়ুর ভেতরের দিকের আবরণের নাম হলো এন্ডোমেট্রিয়াম। বয়ঃসন্ধিতে হরমোনের প্রভাবে মেয়েদের প্রজনন ক্ষমতাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই আবরণের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের ফলে প্রতি মাসে মাসিক হয় এবং রক্তের সঙ্গে জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম স্তরও ঝরে পড়ে এবং নতুন করে সৃষ্টি হয়। যখন এই মাসিক বা ঋতুস্রাব যোনিপথ দিয়ে বের হয় তখন কিছুটা রক্তস্রাব ফেলোপিয়ান টিউব দিয়ে নিম্ন উদর বা তলপেটে চলে আসে এবং তলপেটের বিভিন্ন জায়গায় এটা স্থায়ীভাবে কার্যকর অবস্থায় বিরাজ করে। পেটের ভেতরে এটা ডিম্বকোষের মধ্যেও সংস্থাপিত হতে পারে, যা একটা থলির আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় এর নাম ‘চকলেট সিস্ট’। জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম কোষ যদি জরায়ুর বাইরে বাসা বাঁধে বা বর্ধিত হয় তখন তাকে ‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ বলা হয়। ডিম্বাশয়, পেটের ভেতরের আবরণী পেরিটোনিয়াম, বিভিন্ন লিগামেন্ট, অন্ত্র, সেপ্টাম, স্কার টিস্যু বা কাটা সেলাইয়ের ওপর জমতে পারে এই কোষ।

প্রধান লক্ষণ এবং উপসর্গসমূহ : এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটার উপসর্গগুলো নির্ভর করে কোন জায়গায় এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুগুলো সৃষ্টি হয়েছে তার ওপর। নিচে এর কিছু সাধারণ উপসর্গ উল্লেখ করা হলো।

ঋতুচক্রের সময় পেটে বা শ্রোণী অঞ্চলে প্রচ- ব্যথা অনুভূত হয়, যাকে বলে ‘ডিস্মেনোরিয়া’। সঙ্গমের সময় ব্যথা অনুভূত হয়, যাকে বলে ‘ডিসস্প্যারিউনিয়া’। ঋতুচক্রের সময় অস্বাভাবিকভাবে প্রচুর (মেনোরেজিয়া) বা দীর্ঘকালীন (মেট্রোরেজিয়া) রক্তপাত হয়। বন্ধ্যত্ব। মূত্রত্যাগের সময় এবং মলত্যাগের সময় ব্যথা অনুভূত হয়। ঋতুচক্রের সময় এবং অন্য যেকোনো সময় সহজেই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া।

রোগ নির্ণয় : যদিও মাসিকের সময় ব্যথা, সহবাসে ব্যথা এবং বন্ধ্যত্ব থাকলেই বোঝা যায় এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে, তবুও আধুনিক চিকিৎসাগত পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উক্ত রোগ নির্ণয় করা অধিক যুক্তিযুক্ত। নিম্নোক্ত উপায়সমূহের দ্বারা রোগটি সহজেই নির্ণয় করা যায়।

শ্রোণী অঞ্চলের আল্ট্রাসাউন্ড এবং ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড করে সহজেই এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুর উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়। ল্যাপারোস্কোপি করে এবং বায়োপসি করে নির্ণীত রোগটি আরও নিশ্চিত করা যায়। ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (গজও) করে এন্ডোমেট্রিয়াল যে স্থানটিতে চকলেট সিস্টটি সৃষ্টি হয়েছে, তার অবস্থান এবং আকৃতি নির্ণয় করা যায়।

চিকিৎসা : অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগাক্রান্ত অঞ্চলগুলো সাফ করে দেওয়া হয়। কোথায় এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে ও তার ব্যাপ্তি কতটা তার ওপরে নির্ভর করে যে কী ধরনের অস্ত্রোপচার হবে। প্রথমত, ল্যাপ্রোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত অঞ্চলগুলো বাষ্পীভূত করে দেওয়া হয়। এন্ডোমেট্রিওটিক নডিউলগুলো ডিম্বাশয়ে জমে সিস্টের আকার ধারণ করলে তাকে এন্ডোমেট্রিওমা বলে। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা কেটে বাদ দিতে হয়। মহিলাদের রোগ সংক্রান্ত এটি জটিলতম অস্ত্রোপচার। এন্ডোমেট্রিওটিক নডিউলগুলোর সঙ্গে খাদ্যনালি জড়িয়ে গেলে জীবন সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এন্ডোমেট্রিওসিস যদি ব্যাপক ও অনেকটা অঞ্চল জুড়ে হয়, তবে ল্যাপারোটমি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে নাভির তলার অংশ থেকে পেট কাটতে হয়। সন্তানধারণে ইচ্ছুক না হলে, প্রয়োজনে ডিম্বাশয় বাদ দিতে হয়। তৃতীয়ত, এই রোগে জরায়ু বাদ দেওয়া বা হিস্টেরেক্টমি করতে হতে পারে। তবে এই অস্ত্রোপচারের পরে আর সন্তানধারণ সম্ভব নয়। এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটির চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স এবং রোগের তীব্রতার ওপর। উক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এবং আশঙ্কাজনক লক্ষণ চোখে পড়লে উপযুক্ত সময়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে এবং ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী যথাযোগ্য ওষুধ সেবন এবং বিধিনিষেধ মেনে চললে এরকম একটি রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত