আমাদের দেশে পরিবেশ সংরক্ষণে একটি বড় সমস্যা পলিথিন ও প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। বাজার, রাস্তাঘাট, ড্রেন, নদী, নর্দমা সবই যেন পলিথিনের ডাস্টবিন। ঘরে পলিথিন, বাইরে পলিথিন, খালি জায়গায় পলিথিন, বর্জ্যরে ভাগাড়ে, ময়লার ভাঁজে ভাঁজে পরিত্যক্ত পলিথিন যেন আমাদের চোখ সওয়া। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের মধ্যে একটি। আমাদের এ অবস্থানই বলে দেয় আমরা প্রাত্যহিক জীবনযাপনে কতটা পলিথিননির্ভর।
প্লাস্টিকের কথা না হয় বাদই দিলাম, পলিথিন ছাড়া কোনো কিছুতেই যেন আমাদের আর চলে না। কোনো কিছু মোড়কজাত করা থেকে শুরু করে খাবার-দাবার, প্রসাধনসামগ্রী ইত্যাদি সবকিছুতেই পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার। আমাদের এই সময়ের অভ্যাস, খালি হাতে বাজারে যাওয়া, এক এক দোকান থেকে কিছু একটা কিনলেই নতুন একটা পলিথিন ধরিয়ে দেওয়া, এভাবেই এক দিনের বাজারেই আট-দশটি পলিথিন বাসায় নিয়ে আসা এবং শেষে যাচ্ছেতাইভাবে ফেলে দেওয়া। এ বছরই (মার্চ ২০২২) দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মানুষের রক্তে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। তাদের পরীক্ষা করা ৮০ শতাংশ নমুনাতেই মাইক্রো প্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে অর্ধেকের রক্তে ‘পেটজাতীয়’ বোতলের প্লাস্টিকের কণা আর চার ভাগের এক ভাগের রক্তে পলিথিনের নমুনা পাওয়া গেছে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের কারণে শুধু মাটি, পানি ও বায়ুম-লই দূষিত হচ্ছে না মানুষের রক্ত পর্যন্ত দূষণের শিকার!
আমরা জানি, পলিথিন দীর্ঘদিনেও মাটির সঙ্গে মেশে না বরং তা মাটির উর্বরাশক্তি নষ্ট করে। শহরাঞ্চলে স্তরে স্তরে ময়লা-আবর্জনা তৈরি করে, ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইনের পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ঢাকা শহরের মতো অন্য বড় শহরগুলোর জলাবদ্ধতার একটি মস্ত বড় কারণ পলিথিনের মাধ্যমে স্যুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলাফল কিছুদিন পরপর স্যুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার ও পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়া এবং প্রতি বছর খোঁড়াখুঁড়ি ও অর্থের অপচয়।
অন্যদিকে পলিথিন ও প্লাস্টিক শহরাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি ছড়ানোর বড় নিয়ামক। নোংরা ও ময়লা-আবর্জনায় মশার উৎসস্থলের ছড়াছড়ি। এর প্রভাবে প্রায় প্রতি বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়া। এসবই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পলিথিন মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে। প্লাস্টিক সোপ ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠন বলছে, যেভাবে পৃথিবীতে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ছে তাতে ওজনের দিক থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের তুলনায় প্লাস্টিক বেশি থাকবে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ওপরের যে বিষয়গুলো বলা হচ্ছে, এ সম্পর্কে কমবেশি সবারই ধারণা আছে। যদিও আমরা সবাই পলিথিনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বুঝতে পারি কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ ক্ষেত্রে আমাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং বুঝেশুনেও পলিথিন ব্যবহারের নিত্যনতুন উপায় উদ্ভাবন করছি। এর কোনোটা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সুরক্ষার নামে, আবার কোনো কোনোটি সহজ জীবনযাপনের উপায় হিসেবে। আসলে সহজে পাওয়া কোনো কিছুই এত সরল বা নিষ্কলঙ্ক নয় অধিকন্তু এসবের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মূল্য অত্যধিক।
পলিথিনের সবচেয়ে বড় খারাপ দিকটা হচ্ছে এর ব্যবহার হয় অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য অথচ এর স্থায়িত্ব দীর্ঘদিনের, যুগের পর যুগ। ফলে একদিকে যেমন সম্পদের অপচয় হয়, অন্যদিকে দূষণের ক্ষেত্র বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এজন্যই পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব নেতিবাচক দিক পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ২০০২ সালে পৃথিবীতে সবার আগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও আজ পর্যন্ত সেটা কার্যকর করতে পারল না। গত বিশ বছরের পরিক্রমায় বর্তমানে পৃথিবীর আশিটি দেশে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ভারত এ বছরের পহেলা জুলাই থেকেই পলিথিনের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। অন্যদিকে এ বছরের মার্চে জাতিসংঘের উদ্যোগে কেনিয়ার নাইরোবিতে বিশ্বের ১৭০টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে পলিথিন ব্যবহার থেকে বের হয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট উপকূলীয় অঞ্চল এবং সারা বাংলাদেশের হোটেল ও মোটেলে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করে।
বাংলাদেশের পলিথিন নিষিদ্ধের দুই দশক আমাদের সামনে মোটেই আশাপ্রদ চিত্র উন্মোচন করে না। ২০২১ সালে ইএসডিও নামে একটি সংগঠনের গবেষণা মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার জন্য সপ্তাহে প্রায় দশটি পলিথিনের ব্যবহার করে থাকে। এ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ন্যূনতম মাসিক ১৮০০ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার হয়ে থাকে। শুধু ঢাকা শহরে মাসিক পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার হয় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে পলিথিন ব্যবহার ২০০৫ সালের তুলনায় ২০২০ সালে তিন গুণ বেড়ে তিন কেজি থেকে মাথাপিছু ৯ কেজি হয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রে এটা মাথাপিছু বাইশ কেজিরও বেশি। ২০০২ সালে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এই নিষেধাজ্ঞা যে কার্যকর করা যায়নি তা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে। আর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের উদ্যোগও যে সীমিত তাও বোধগম্য। বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহার করেছে, যার মাত্র ৩১ শতাংশ আবার ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনা একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ডিসপোজের ক্ষেত্রে। ঢাকার প্লাস্টিকের মাত্র ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার যোগ্য করা হয়, বাকিটা বিভিন্নভাবে প্রকৃতিতে ও উন্মুক্ত স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে এবং প্রতিদিন বাড়ছে।
পলিথিনের এই ব্যাপক বিনাশী বিস্তারের জন্য দায়ী কে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আইন বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের দায় তো আছেই, পলিথিন ব্যবহারে জনগণের সচেতনতার অভাবও কম দায়ী না। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি রাখে তা হচ্ছে আমাদের বর্তমান পণ্য বাজারজাত করার পদ্ধতি, যা মোটেও পরিবেশবান্ধব না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বাজারজাতকরণ পদ্ধতিই পলিথিন ব্যবহারে ভোক্তাকে উৎসাহিত করে যাচ্ছে। এটা পরিবর্তন করা এখন সময়ের জরুরি দাবি।
পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। এর জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ এখনই দরকার। জনগণের সচেতনতা যেমন বাড়ানো দরকার, একই সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কর্মকৌশল নির্ধারণ করা দরকার। ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আগের থেকে উন্নত হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। যেখানে পলিথিনের মতো বর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা খুবই প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে পলিথিনের এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এর ব্যবহার যেমন কমাতে হবে, তেমনি এর পৌনঃপুনিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সেসব রিসাইকেল করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক উন্নয়নকর্মী
