দুয়ার খুলছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২২, ১২:২৬ এএম

অবশেষে দুয়ার খুলছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল আকাক্সিক্ষত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি)। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বন্দরটিতে পরীক্ষামূলকভাবে বাল্ক কার্গোবাহী প্রথম জাহাজ ভেড়ানো হবে। ৩২ একর জায়গার ওপর নির্মিত এ টার্মিনালে বছরে সাড়ে চার লাখ টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইক্যুইভেলেন্ট ইউনিটস) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে।

পিসিটির প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান সরকার দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকল্পের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন ইয়ার্ডে আরসিসি ঢালাই, আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংকসহ শেষ মুহূর্তের ছোটখাটো কিছু কাজ চলছে। তিনি বলেন, পাথরবাহী একটি জাহাজ ভেড়ানোর মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার জেটির প্রাথমিক অপারেশন শুরু করবে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এ টার্মিনালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চলবে।

চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পর চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে যাত্রা শুরু করছে এ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। ১ হাজার ২২৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য সেখানে তৈরি করা হয়েছে ৬০০ মিটার দীর্ঘ তিনটি কনটেইনার জেটি। পাশাপাশি থাকছে ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ডলফিন জেটি। এছাড়া ১ লাখ ১২ হাজার বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড ও রাস্তা, ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) শেড, ২ হাজার ৫০০ মিটার রেলওয়ে ট্র্যাক, ৪২০ মিটার ফ্লাইওভার, ৪ লেনবিশিষ্ট পৌনে ১ কিলোমিটার ও ৬ লেনবিশিষ্ট ১ কিলোমিটার রাস্তা স্থানান্তরপূর্বক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে এ প্রকল্পের আওতায়।

পিসিটিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি মাইলফলক বলে মন্তব্য করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক এ প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ টিম এ প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং টার্মিনালটি তৈরি করেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী না হয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা এ টার্মিনাল নির্মাণ আমাদের অনেক বড় একটি অর্জন।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালিত হয় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিন্তু যে হারে এ বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই হারে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামার জন্য বন্দরে ১৯৫৮ সালে প্রথম তৈরি করা হয় জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। এরপর ১৯৯০ সালে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও ২০০৭ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতা আনতে তা যথেষ্ট না হওয়ায় আরও টার্মিনাল তৈরির জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন ব্যবসায়ী নেতারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বন্দর।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা সরানো নিয়ে জটিলতার কারণে তা পিছিয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় সাত মাস পর ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর কাছে প্রকল্পের সাইট হস্তান্তর করা হয় এবং ফেব্রুয়ারি থেকে পতেঙ্গা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্প শেষ করে অপারেশনে যাওয়ার কথা থাকলেও কাজ শুরু করতে বিলম্বের কারণে তা হয়নি। পরবর্তীকালে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ চলতি বছর জুন মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছিল।

পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) চালু হলে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অনেক বেশি গতিশীল হবে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পিসিটির কার্যক্রম শুরু হচ্ছে এটা আমাদের জন্য অবশ্যই খুশির বিষয়। কিন্তু বন্দরের মেগা প্রকল্প বে-টার্মিনাল নির্মাণ আমাদের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে মূল জেটির চেয়ে অনেক কম সময়ে জেটিতে জাহাজ ভিড়তে পারবে। তাছাড়া মূল জেটিতে ৯ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ ভিড়তে না পারলেও এখানে ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। এর ফলে আগের তুলনায় অনেক সময়ে জাহাজ থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্য লোড ও খালাস করা সম্ভব হবে। এতে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকালও কমে আসবে।

টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও পিসিটি পরিচালনার জন্য এখনো নিয়োগ করা যায়নি অপারেটর। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর মাধ্যমে এ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে অপারেটর হিসেবে কাজ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে পাঁচটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আশা করছি খুব শিগগিরই অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তার আগপর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এ টার্মিনাল পরিচালনা করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত