ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ মালামাল ট্রাকে পরিবহন করছিল চালক মো. রাজু আহমেদ ওরফে সিপন (৪২)। টাল সামলাতে না পেরে সে ট্রাক তুলে দেয় ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক পারাপারের অপেক্ষায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা নারী, তার স্বামী ও
সন্তানের ওপর। ট্রাকচালক রাজুকে গত সোমবার ঢাকার সাভার থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে সংস্থাটি। সেখানে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।
তিনি আরও জানান, সাত মাস ধরে শতকরা ১০ শতাংশ কমিশনে ট্রাক চালিয়ে আসছিল রাজু। গাড়িটিতে সবসময় কাঁচামাল পরিবহন করা হতো। অথচ গাড়িটির ট্যাক্স টোকেন এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট মেয়াদোত্তীর্ণ। ধারণক্ষমতা ৭ টন হলেও দুর্ঘটনার সময় গাড়িটিতে মালামাল পরিবহন করা হচ্ছিল ১৩.৫ টন। শুধু তাই নয়, যানবাহন চালানোর জন্য কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না রাজুর। ২০০২ সালে যশোরের এক ট্রাকচালকের সহকারী (হেলপার) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনারও শিকার হয়েছিল সে।
সংবাদ সম্মেলনে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ১৬ জুলাই দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশালের রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তার এক কন্যাসন্তানকে নিয়ে রাস্তা পারাপারের জন্য মহাসড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ময়মনসিংহগামী একটি ট্রাক বেপরোয়া গতিতে তাদের চাপা দেয়। নিহত হন জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রতœা বেগম (২৬) এবং তিন বছর বয়সী কন্যাসন্তান সানজিদা আক্তার। দুর্ঘটনার সময় অন্তঃসত্ত্বা রতœা বেগমের ওপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ায় চাকার চাপে গর্ভে থাকা কন্যাসন্তান অলৌকিকভাবে ভূমিষ্ঠ হয়। ভূমিষ্ঠ শিশুটিকে আহত অবস্থায় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ সদরের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
দেশব্যাপী আলোড়ন তোলায় ওই ঘটনায় বিস্মিত কমান্ডার মঈন বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় র্যাব। র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৪ অভিযান চালিয়ে গত সোমবার রাতে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে ওই দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকচালক মো. রাজু আহমেদ ওরফে সিপনকে গ্রেপ্তার করে। রাজু রাজশাহীর বাঘার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবের কাছে রাজু নিহতদের গাড়িচাপা দেওয়ার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। রাজু গত ১১ জুলাই থেকে একটানা মালামাল পরিবহন করে আসছিল। এর মধ্যে সে একবার রাজশাহী থেকে আম নিয়ে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে মালামাল নামিয়ে ফের রাজশাহী ফিরে আসে। গত ১৫ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট থেকে গাড়ির মালিকের আম বোঝাই করে এবং পরে রাজশাহীর নৌহাটা থেকে আরেক দফায় আলু বোঝাই করে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের এক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাত ১২টায় রওনা হয়। পথে হালকা বিরতি নিয়ে দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত একটানা গাড়ি চালিয়ে আসছিল। কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছালে রাস্তা পারাপারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী-সন্তানকে চাপা দেয়। দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ট্রাকটি থামায়। তখন সুযোগ বুঝে রাজু ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ে। পরে বাস থেকে সে ময়মনসিংহ বাইপাসে নামে এবং সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রথমে মুক্তাগাছা এবং পরে আরেকটি বাসে করে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছায়। সেখান থেকে সে তার পরিচিত বিভিন্ন ট্রাকচালকের ট্রাকে উঠে আত্মগোপনে থাকে। সোমবার এমন একটি ট্রাকে সাভারে পৌঁছালে সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে রাজু জানায়, ভারী যানবাহন চালানোর জন্য কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই তার। আগে গাড়ির মাঝারি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল, যা ২০১৬ সালে হারিয়ে ফেলে। ২০০২ সালে যশোরের এক ট্রাক ড্রাইভারের হেলপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনার শিকার হয়। সে সময় বাম পা মারাত্মকভাবে জখম হওয়ায় ছয় বছর গাড়ি চালায়নি। এখনো তার বাম পায়ে সমস্যা রয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সে নিয়মিত বিরতিতে ট্রাক চালিয়ে আসছিল।
র্যাব বলছে, চালক রাজু আগে জেল খেটেছে। জিজ্ঞাসাবাদে রাজু দাবি করে, ত্রিশালে তার ট্রাকটির পেছনে যাত্রীবাহী একটি বাস ছিল। বাসটি অনবরত হর্ন বাজাচ্ছিল। সে বাসটিকে জায়গা দিতে গিয়ে ট্রাক বাঁয়ে চাপানোর চেষ্টা করে। এ সময় ব্রেক কাজ না করায় নিয়ন্ত্রণ হারায়। সড়কের পাশে দাঁড়ানো পরিবারটিকে রাজু দেখতে পায়নি বলে র্যাবের কাছে দাবি করেছে। ট্রাকের মালিক রাজশাহীর ব্যবসায়ী মনজুর। দুর্ঘটনার সময় ট্রাকচালক রাজুর সহকারী খায়রুল ঘুমাচ্ছিল।
