গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২২, ০২:১২ এএম

বিশ্ব বাজারের মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। জুন মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে ঠেকেছে। এর আগে ২০১৪ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আট বছরের মধ্যে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জুন মাসের ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ তথ্যে এমন কথা বলা হয়েছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একই সময়ে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুনে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে, যা গত মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলে সব স্বাভাবিক হবে। কিছু কৌশল অবলম্বন করা হবে। আরও কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে একনেক সভায়। তবে গত কয়েক দিনে কিছু পণ্য, যেমন চাল-ডাল-তেল-পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। জুলাইয়ের শেষে নিত্যপণ্যের দাম আরও কমবে। তবে কতটুকু কমবে তা বলতে পারব না। ভোজ্য তেলের দাম কমছে। চালের ক্ষেত্রে ভালো পরিবর্তন আশা করছি।’

তিনি বলেন, ‘তেল আমরা নিজেরা উৎপাদন করি না। এটি এখন সব পণ্যের রাজা। এর দাম বাড়ার প্রভাব সবকিছুর ওপর পড়ছে। এর প্রভাব মোকাবিলার জন্য আমরা আরও সতর্ক হয়েছি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী মিতব্যয়ী হতে বলেছেন।’

বিবিএসের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের কেনাকাটায় অস্বস্তি বেশি। জুনে গ্রামাঞ্চলে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ছিল আর খাদ্যে ছিল ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে এ হার ছিল গড়ে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ আর খাদ্যে ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষ কিছুটা কমে কেনাকাটা করতে পারছে। জুনে শহরাঞ্চলে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ আর খাদ্যে ছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে এ হার ছিল গড়ে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ আর খাদ্যে ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর প্রভাবে জুন মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা গত মাসে ছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের জুন মাসে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের জুন মাসে সে পণ্য বা সেবার জন্য ১০৭ টাকা ৫৬ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এ মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২১ সালের জুনে খাদ্যপণ্যের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, এ বছরের জুনে মাসে ১০৮ টাকা ৩৭ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।

বিবিএস জানায়, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ হয়েছে, গত মাসে যা ছিল ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সব খাতেই মূল্যস্ফীতি বাড়তি।

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া। ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। যদিও রেকর্ড হারে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ; খাদ্য খাতে ছিল ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিবিএসের মূল্যস্ফীতির হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জুলাই মাসে খাদ্যবহির্ভূত ও খাদ্যেপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। প্রসাধনী সামগ্রী, জুতা, পরিধেয় বস্ত্র, বাড়িভাড়া, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি পণ্য, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, শিক্ষা-উপকরণ ও বিবিধ সেবা খাতের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জুলাই মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী চাল, ডাল, মাছ, মাংস, ব্রয়লার মুরগি, শাকসবজি, ফল, মসলা, দুধজাতীয় ও অন্য খাদ্যপণ্য কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা।

বাজারে মুদ্রার সরবরাহ যখন বেড়ে যায়, কিন্তু পণ্য বা সেবার পরিমাণ একই থাকে তখন মুদ্রাস্ফীতি হয়। মুদ্রাস্ফীতির ফলেই মূল্যস্ফীতি হয়ে থাকে। এপ্রিলেই সরকারের কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছিলেন, বিশ্ব বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

করোনা আর যুদ্ধের প্রভাবে উন্নত বা গরিব কোনো দেশই উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরে নেই। কভিডে নাগরিকদের বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশে কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলেছে। জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি থেকে টানা পাঁচ মাস ধরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ গত বছর এপ্রিলে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় পাওয়া যেত গত মাসে সে পণ্য বা সেবা পেতে ১০৭ টাকা ৫৬ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।

বিবিএসের প্রতিনিধিরা মাসের প্রথম ১৫ দিন সারা দেশের বাজার থেকে পণ্যমূল্য সংগ্রহ করেন এবং সে মূল্যের গড় করে মাসিক মূল্যস্ফীতি হার নির্ধারণ করে থাকেন।

জুন ২০২২

(%)      জুন ২০২১

(%)      এক বছরে বেড়েছে (%)    

গড় মূল্যস্ফীতি     ৭.৫৬    ৫.৬৪    ১.৯২    

খাদ্যে মূল্যস্ফীতি  ৮.৩৭    ৫.৪৫    ২.৯২   

গ্রামে গড় মূল্যস্ফীতি         ৮.০৯    ৫.৮৪    ২.২৫   

গ্রামে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি      ৮.৯৩    ৬.০৪    ২.৮৯   

শহরে গড় মূল্যস্ফীতি         ৬.৬২    ৫.২৯    ১.৩৩    

শহরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি     ৭.১১     ৪.১৪     ২.৯৭   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত