সরকার নির্ধারিত বাড়তি দামের ১৯টি জেনেরিকের ৫৩টি ওষুধের মধ্যে মাত্র দুটি জেনেরিকের কিছু ওষুধ বাজারে এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো প্যারাসিটামল গ্রুপের ট্যাবলেট ও সিরাপ এবং মেট্রোনিডাজল গ্রুপের ট্যাবলেট। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দাম বেড়েছে প্যারাসিটামল গ্রুপের সিরাপের ৭৫ শতাংশ এবং ট্যাবলেটের ৫৪ শতাংশ এবং মেট্রোনিডাজলের দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।
ওষুধ বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দাম বাড়বে বলে গত ২০-২২ দিন ধরে বাজারে প্যারাসিটামল গ্রুপের কিছু ওষুধ পাওয়া যাচ্ছিল না। খুবই অত্যাবশ্যকীয় এ ওষুধের জন্য রোগীদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। গত দু-তিন দিন ধরে বর্ধিত দামে পুনরায় ওষুধগুলো বাজারে ছেড়েছে কোম্পানিগুলো। সরকার নির্ধারিত ওষুধের বাইরে আরও কিছু ওষুধের দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ওষুধ বিক্রেতারা। তারা বলেছেন, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মগবাজারের একটি নামকরা ফার্মেসির এক বিক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দাম বাড়ানোর আগে ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পরে দাম বাড়লে এসব ওষুধ বাজারে ছাড়ে। এরকম কিছু ওষুধের সংকট এখনো আছে। যেমন বেক্সিমকো কোম্পানির নাপা ট্যাবলেট। দাম বাড়াবে সেটা আরও ২০ দিন আগে থেকেই পরিকল্পনা করছে। ৮ টাকার এক পাতা নাপা এখন ১২ টাকা করেছে। ৫০ শতাংশ দাম বেড়েছে। গেল ২০ দিন হলো নাপা নিয়ে মানুষের অনেক ভোগান্তি হয়েছে। বাজারে ওষুধ ছিল না। অনেক জায়গায় ৮ টাকার নাপা ১৫ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। নাপা সিরাপ ২০ টাকা, সেটা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। এটাও ৭৫ শতাংশ দাম বেড়েছে।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মুখপাত্র আইয়ুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যত কম মূল্যে ভোক্তাকে দেওয়া যায় সরকার সে চেষ্টা করে। আবার শিল্পকেও দেখতে হয়। অনেকে মনে করছে ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। ১৯ জেনেরিকের ৫৩টা ওষুধের দামের পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছি। এখন কোম্পানিগুলো কত মূল্যে বিক্রি করবে, সেটা অনুমোদন নেবে। বেক্সিমকো ১ টাকা ২০ পয়সা প্যারাসিটামলের জন্য অনুমোদন নিয়েছে। এখন সে তার প্যাকেটে এটা লিখবে। আমাদের অনুমোদন ছাড়া কোম্পানি বর্ধিতমূল্য কার্যকর করতে পারবে না।’
এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি মানে জনগণ যেভাবে ভাবছেন, সে রকম নয়। ১৬৬৯ জেনেরিকের মধ্যে সরকার নিয়ন্ত্রিত ১১৭টি জেনেরিকের মধ্যে ১৯টি জেনেরিকের ৫৩টি ওষুধের মূল্য সরকার নির্ধারণ করেছে। বাকিগুলো ভ্যাট প্রদানের নিমিত্তে আমাদের কাছে আবেদন করে, আমরা যাচাই-বাছাই করে মূূল্য নির্ধারণ করে দিই। সেই নির্ধারিত মূল্যের সনদপত্র ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে গ্রহণ করে বাজারজাত করতে পারবে।’
ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও বাজার যাচাই-বাছাই করে ১৯টি জেনেরিকের ৫৩ ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব ওষুধ ধীরে ধীরে বাজারে আসতে শুরু করেছে। এগুলো সবই দেশীয় ওষুধ।
ওষুধের বাড়তি মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ আগে যে দামে ওষুধ কেনা যেত, এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হবে। এর মধ্যে প্যারাসিটামলের ৫০০ এমজির প্রতিটি ট্যাবলেট ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ টাকা ২০ পয়সা। মিথাইলডোপা গ্রুপের ১ টাকা ৫০ পয়সার ২৫০ এমজি ট্যাবলেট ৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ ১৩৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। লিডোকেইন গ্রুপের ১% ডব্লিউভি, ২০ এমজি/২এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা, ৯৯ শতাংশ বেড়ে ওষুধটির দাম হয়েছে ৭ টাকা। বেনজাথিন বেনজিলপেনিসিলিন ১২ লাখ ইউনিট/ভায়ল ইনজেকশনের আগের দাম ১৫ টাকা ৬০ পয়সা, প্রায় ৯৯ শতাংশ বেড়ে দাম হয়েছে ৩০ টাকা।
দাম বেড়েছে যেসব ওষুধের : গতকাল মঙ্গলবার মিটফোর্ড, বিএমএ, শাহবাগ ও মগবাজারের ওষুধের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সরকার যেসব ওষুধের দাম বাড়িয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু ওষুধ বাজারে এসেছে। এসব ওষুধের আগের চেয়ে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো কোম্পানির ৮ টাকার এক পাতা নাপা (১০টা) এখন বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। নাপা সিরাপ ২০ টাকা ছিল। এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। ১৫ টাকার নাপা এক্সটেন্ড এখন হয়েছে ২০ টাকা। দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। নাপা ওয়ান ট্যাবলেটের এক পাতার দাম ছিল ১৪ টাকা, এখন ৬৪ শতাংশ দাম বেড়ে হয়েছে ২৩ টাকা।
মিটফোর্ডের পাইকারি ওষুধ বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, প্যারাসিটামল গ্রুপের ট্যাবলেট এক বাক্স (১ বাক্সে ৫০ পাতা ও প্রত্যেক পাতায় ১০টা করে মোট ৫০০ ট্যাবলেট) আগে দাম ছিল ৪০৮ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৩০ টাকায়। দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। প্যারাসিটামল সাসপেনশন আগে বিক্রি হতো ২০ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। অ্যান্টিব্যাকটারিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল জাতীয় ওষুধ মেট্রোনিডাজল ট্যাবলেটের এক পাতার দাম ছিল (১০টা) ১৫ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। পাতা প্রতি দাম বেড়েছে ৫ টাকা।
এসব মার্কেটের ওষুধ বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরকারের তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর নতুন দাম এখনো দোকানগুলোতে পৌঁছায়নি। তবে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলেছেন, ৮-১০ দিনের মধ্যে চলে আসবে। এখন পুরনো দামেই বিক্রি হচ্ছে। যখন ওষুধের দাম বেড়ে যায়, তখন ঠিকমতো সরবরাহ করে না। সংকট দেখা দেয়। নতুন মূল্য নির্ধারণের জন্য কিছুদিন সরবরাহ বন্ধ রাখে। দোকানে সীমিত ওষুধ থাকে। তখনই কেউ কেউ দাম বেশি রাখে।
তালিকার বাইরেও কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে : ওষুধের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকার যেসব ওষুধের দাম বাড়িয়েছে, সেগুলোর বাইরেও কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে বেনজোডায়াজেপিন জেনেরিক নামের ঘুমের ওষুধ ডায়াজেপাম ইনজেকশন আগে ছিল ১১০ টাকা, এখন ৩৬ শতাংশ দাম বেড়ে হয়েছে ১৫০ টাকা। অ্যাসপিরিন জেনেরিক নামের ইকোস্পিরিন ট্যাবলেটের দাম বাড়বে বলেও জানিয়েছেন দোকানিরা। হার্টের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত এটা এখন বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকায়। গ্যাকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড চর্মরোগের মলম ৩৪ টাকার গ্যাকোজিমার ১৩ শতাংশ দাম বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা। একই কোম্পানির অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত এপিনেফ্রিন জেনেরিকের এ্যাড্রিন ইনজেকশনের দাম ছিল ১৬০ টাকা। ৩১ শতাংশ দাম বেড়ে সেটা বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়।
কিছু ওষুধের সংকটের আশঙ্কা : ওষুধ বিক্রেতারা জানান, বিক্রয় প্রতিনিধিরা অনেকগুলো গ্রুপের কথা বলে দিয়েছেন, এগুলোর দাম নিশ্চিত বাড়বে। অনেক বিক্রয় প্রতিনিধি এসব ওষুধ নিজেরাও বেশি বেশি করে রাখছেন ও ফার্মেসিগুলোকেও বেশি বেশি করে রাখতে বলছেন। বাড়লে তখন এসব ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে। তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন ৩০-৪০ ধরনের ওষুধের দাম বাড়াবে এবং বর্ধিত দামে বাজারে আসার আগে এ ওষুধগুলোর কিছুদিন সংকট দেখা দিতে পারে।
এসব বিক্রেতারা আরও জানান, লোসারটিন পটাশিয়াম নামে প্রেসারের ওষুধ এখন ৮ টাকা দাম, ১০ টাকা করবে। যাদের প্রেসার একটু বেশি থাকে, ঢাকার চিকিৎসকদের ৫০ শতাংশেরই পছন্দ এই গ্রুপের ওষুধ। একই ওষুধের অ্যামলোডিপিন গ্রুপের ওষুধের দামও বাড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহবাগের ওষুধ বাজারের একাধিক ওষুধ বিক্রেতা জানিয়েছেন, অ্যানজলিক গ্রুপের প্রেসারের ওষুধের দাম যখন বাড়বে বলেই দিয়েছে, তখন দেখা যাবে ১০-১৫ দিনের জন্য এ ওষুধটা পাওয়া যাবে না। তখন মানুষের ভোগান্তি হবে। কোম্পানি যখন চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ করতে পারে না, তখন দোকানদারের কাছেও যথেষ্ট পণ্য থাকে না। তখন যেটা থাকে সেটা বেশি দাম নেওয়ার চেষ্টা করে। বিশেষ করে এলাকার ছোট ছোট দোকানগুলোতে দাম বেশি নেয়।
এক বিক্রেতা বলেন, ‘এখন বেক্সিমকো কোম্পানির ৮ টাকার নাপা ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতদিন নাপার সংকট ছিল। কিছু কিছু দোকানে ছিল। কিন্তু দাম বাড়লে বিক্রি করবে সেজন্য এতদিন বিক্রি করেনি। সংকট এতটাই ছিল যে, কেউ যদি ৫ পাতা চাইত, তাকে এক-দুই পাতা দিতাম। কারণ আমি নিজেও বেশি পেতাম না।’
