হবিগঞ্জে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘বাতি বিলাস’

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২২, ০১:১৭ এএম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে, তখন হবিগঞ্জের কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘বাতি বিলাস’-এ মেতে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার অজুহাতে সীমানা দেয়ালের ওপর ও বাগানে শত শত বাতি সন্ধ্যার পর থেকে সূর্য ওঠার পরেও জ¦লতে দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার রাতে এবং গতকাল বুধবার সকালে হবিগঞ্জ শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

দপ্তরগুলোর মধ্যে জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট অফিসের প্রায় পাঁচ একর সীমানাপ্রাচীরের ওপর তিন-চার ফুট দূরত্বে এবং বাগানে সারি সারি শতাধিক বাতি জ¦লতে দেখা যায়। এর কারণ জানতে চাইলে আনসারের জেলা কমান্ড্যান্ট অরূপ রতন পাল বলেন, ‘এটি ডিফেন্স অফিস, সিভিল সার্ভিস অফিস নয়। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য সাশ্রয়ী হতে বলছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তা হুমকি রেখে বাতি বন্ধ রাখতেও বলেনি।’ তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী যেখানে আছেন, সেখানে এত বাতি জ¦ালানোর প্রয়োজন আছে কি না, জানতে চাইলে তার সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

হবিগঞ্জ হাসপাতাল, পৌরসভা, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের ওপর এবং জেলার কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বাসভবনের প্রবেশমুখ ও বাগানে অহেতুক নানা রঙের বাতি জ¦লতে দেখা যায়। এ ছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে যেখানে ফ্যান চালানোর সুযোগ নেই, সেখানে সন্ধ্যার পর হবিগঞ্জ লন টেনিস ক্লাব মাঠ আলোর বন্যায় ভেসে ওঠে। হাজারো ওয়াটের বাতি জ¦ালিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তারা খেলায় মত্ত থাকেন। হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজের একটি ভবনের সামনের বাগানেও অসংখ্য বাতি জ¦লতে দেখা গেছে।

হবিগঞ্জের কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ‘বাতি বিলাস’-এ মেতে উঠেছে অভিযোগ করে ব্যবসায়ী আলফু মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ৮টার পর থেকে দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। শহরের বিভিন্ন ফিডারে (উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র থেকে নিম্নচাপের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের মধ্যে সংযুক্ত লাইন) দিন-রাত ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমানা দেয়ালের চারদিক, বাগান, লন টেনিস মাঠ দেখে মনে হয় বাতি জ¦ালানোর উৎসব শুরু হয়েছে।’

তিনি প্রশ্ন করে আরও বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এভাবে বাতি জ¦ালানো হতো না বলে কী এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিঘি্নত হয়েছিল? নৈশপ্রহরীরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে কোনোভাবেই নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না।’

হবিগঞ্জের বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে অপ্রয়োজনে বাতি জ¦ালানো হচ্ছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হবিগঞ্জের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাতে আলোর ঝলকানি দেখে মনে হয় না যে দেশে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির কোনো সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের আহ্বানে সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং মেনে নিয়েছে। দোকান রাত ৮টার পর বন্ধ না করায় জরিমানাও গুনছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তারা অফিসে, বাসায় এসি ও বাতি ব্যবহারে যদি সাশ্রয়ী না হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তারা মনে করতে পারে, সাধারণ মানুষ হিসেবে এ দেশে জন্ম নেওয়াটা অপরাধ।’

বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র থেকে জানা গেছে, হবিগঞ্জে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ মেঘাওয়াট। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় প্রতিটি ফিডারে দৈনিক ৫ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে অহেতুক বাতি জ্বালিয়ে বিদ্যুতের অপচয় করা না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে সার্কিট হাউজের অভ্যন্তরে বাগান ও অন্যান্য স্থানে বাতি না জ্বালানোর নির্দেশ দিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত