দেশের ২০ মেগা প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৭০ বিলিয়ন ডলার, যার ৬১ শতাংশ আসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। এসব বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে ২০২৪ ও ২০২৬ সালে। কারণ ওই সময়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারের ১১টি বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এটি অর্থনীতির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশের বৃহৎ ২০টি মেগা প্রকল্প : প্রবণতা ও পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্র্য বলেন, ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে বড় অংশ যাবে রাশিয়া, জাপান ও চীনের কাছে। পরিমাণের হিসাবে চীন তৃতীয় হলেও দায়দেনা পরিশোধের সময়সূচি হিসাবে দেশটিকে সবচেয়ে বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বড় ধরনের ঋণ থাকলে আর্থিক গোলক কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক, বিনিয়োগ আসছে খুব ভালো সময়ে। বাংলাদেশের সুদের হার এই সময় কম ছিল। এটা ইতিবাচক দিক।
দেবপ্রিয় বলেন, এই মেগা প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক যুক্তি হলো, নির্বাচনের সময় এ প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হয়। কিন্তু সমস্যা হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগে। এখানে বিনিয়োগ করলে কী উপকার হলো তা সহজে ধরা যায় না, চোখে পড়ে না। সেজন্য ভৌত বিনিয়োগে রাজনৈতিক উৎসাহ বেশি থাকে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের ২০টি মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক অর্থায়ন সাশ্রয়ীভাবে হয়েছে, যা সন্তোষজনক। এসব প্রকল্পে ৪৫টি ঋণ প্যাকেজের মধ্যে ৫টি অনুদান, ৩৩টি সাশ্রয়ী ঋণ প্যাকেজ, আধাসাশ্রয়ী ২টি ও বাণিজ্যিকভাবে নিতে হয়েছে ৫টি ঋণ প্যাকেজ, যা চীন থেকে এসেছে। অর্থায়নটা ভালো হয়েছে বলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক দায়দেনা জিডিপির ১৭ শতাংশের নিচে ও অভ্যন্তরীণ দায়দেনা ১৭ শতাংশের ওপরে। লক্ষণীয় হলো, এটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। সাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি দায়দেনার বড় ধাক্কা ২০২৪ ও ২০২৬ সালে আসবে। কারণ ওই সময়ে ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় অংশ ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ যাবে রাশিয়ার কাছে, এরপর জাপানে যাবে ৩৫ শতাংশ এবং চীনের কাছে প্রায় ২১ শতাংশ। যদিও পরিমাণের হিসাবে চীন তৃতীয় হলেও দায়দেনা পরিশোধের সময়সূচির কারণে সবচেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে চীনকে। ঋণ পরিশোধের বিরাট ধাক্কা সামলাতে কর আহরণ বাড়াতে হবে। কারণ কর জিডিপির পরিমাণ এখনো ১০-এর নিচে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা শুরুকে ভালো দিক হিসেবে অভিহিত করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ২ বিলিয়ন হোক আর সাড়ে ৪ বিলিয়ন হোক, আইএমএফের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এর ফলে মধ্য মেয়াদে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীরা এক ধরনের আস্থা পাবেন। তারা মনে করেন, বাংলাদেশকে এক ধরনের পরিবীক্ষণ ও নজরদারিতে রাখছে আইএমএফ। তিনি এই প্রসঙ্গে সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কার আইএমএফের অর্থ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের উদাহরণটি তুলে ধরেন।
আইএমএফের ঋণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, এটাই শুভকর ছিল। আইএমএফের কাছে শুধু টাকার জন্য কোনো দেশ যায় না, তাদের মতো প্রতিষ্ঠান পাশে থাকলে বিশ্ববাজারে আস্থার জায়গা তৈরি হয়। সাহায্য যাই হোক।
‘আমার বড় উদ্বেগের বিষয় সরকার ঋণের ৫০ শতাংশ নিয়েছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। সেটা পরিশোধ না করলে ব্যাংকগুলো তারল্য পাবে না। অন্যদিকে সেসব প্রকল্প শুরু হয়নি, অতি জরুরি না হলে তা স্থগিত করা প্রয়োজন। আর যেসব এগিয়ে চলেছে, কিন্তু ব্যয় কাঠামোর স্বচ্ছতা নেই, প্রকাশ্যভাবে দুর্নীতি কিংবা অতিমূল্যায়িত হয়েছে, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আর যেগুলো বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, সেগুলোর দায়দেনার সময় কাঠামোকে পুনঃতফসিলিকরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি।’
আলোচিত ২০ মেগা প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট লাইন-১, মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ প্রজেক্ট, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট লাইন-৫, লাইন-৬, পদ্মা ব্রিজ রেল সংযোগ, ফোর্থ প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, এক্সপানশন হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ডিপিডিসির পাওয়ার সিস্টেম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে ব্রিজ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প, সেফ ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প ও কভিড ইমার্জেন্সি রেসপন্স ও প্যানডেমিক প্রিপারেডেন্স প্রকল্প ইত্যাদি। আর ২০টি মেগা প্রকল্পের ব্যয় হচ্ছে ৭০.০৭ বিলিয়ন বা ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। যার ৬১ শতাংশ আসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে।
এ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, ২০টি প্রকল্পের ১৫টিই সড়ক ও যোগাযোগসহ ভৌত অবকাঠামোগত খাতে। যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ। বাজেটের ৩০ শতাংশ অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ গেছে মেগা প্রকল্প খাতে। মেগা প্রকল্পগুলো যতই যৌক্তিক হোক; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতকে অবহেলার সুযোগ নেই। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি। ২০১৮ সালের পর নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের হার দুর্বল। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ১০-এর নিচে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হয় সবগুলো প্রকল্পের কাজ বাকি থাকবে। ২০টি প্রকল্পের মধ্যে ৭টি প্রকল্প ব্যয়, সময় বাড়ানো হয়েছে। আমি মনে করি ২০২৪ ও ২০২৬ সালে দায়দেনা পরিশোধে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাহায্য চাওয়াটা ইতিবাচক।
