খাদ্যশস্য রপ্তানিতে রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ০৬:১২ এএম

অবশেষে খাদ্যশস্য রপ্তানি নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হলো যুদ্ধরত রাশিয়া ও ইউক্রেন। গতকাল শুক্রবার তুরস্কের শহর ইস্তাম্বুলে এ চুক্তি সই হয়। খাদ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় বেশ কিছুদিন ধরে এ চুক্তির জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মধ্যস্থতা করছিল তুরস্ক ও জাতিসংঘ।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার হয়ে চুক্তিতে সই করেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু। ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সে দেশের অবকাঠামোবিষয়ক মন্ত্রী ওলেকসান্দার কুবরাকভ। এ চুক্তিতে রাশিয়া ও ইউক্রেন ছাড়াও জাতিসংঘ ও তুরস্ক সই করেছে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও উপস্থিত ছিলেন।

এ চুক্তির ফলে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে তাদের অবরোধ শিথিল করবে যাতে ইউক্রেন থেকে জাহাজে করে খাদ্য রপ্তানি হতে পারে। তুরস্ক বলছে, এ চুক্তির ফলে শুধু ইউক্রেন নয়, কৃষ্ণসাগর দিয়ে রাশিয়ার খাদ্য রপ্তানিও সহজ হবে।

পাঁচ মাস আগে যুদ্ধ শুরুর পরপরই রাশিয়া ইউক্রেনের উপকূলের কাছে কৃষ্ণসাগরে নৌ অবরোধ দিলে ইউক্রেনের রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়ে। ইউক্রেন জুড়ে বিভিন্ন গুদামে প্রচুর খাদ্যশস্য মাসের পর মাস রপ্তানির জন্য পড়ে রয়েছে। কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ওডেসা বন্দরের গুদামেই এখন দুই কোটি টনের মতো খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এগুলো এখন আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে সেখানে রপ্তানি করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ চুক্তিকে ‘আশার আলো’ বলে বর্ণনা করে জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস বলেছেন, এ চুক্তি বিশ্বকে একটি বিপদ থেকে ‘পরিত্রাণ’ দেবে। তিনি বলেন, ‘আজ কৃষ্ণসাগরে একটি আলোকবর্তিকার সৃষ্টি হলো, যা একটি আশার আলো, একটি সম্ভাবনার আলো, একটি স্বস্তির বাতিঘর। আরও আগেই এই দিন প্রয়োজন ছিল বিশ্বের।’

এ চুক্তির ফলে শতকোটি মানুষের প্রাণ বাঁচবে বলে মন্তব্য করেছেন এ চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে এই চুক্তির ফলে বিশ্বের কয়েকশ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল। শিগগিরই খাদ্য রপ্তানির একটি নতুন প্রবাহ শুরু হবে এবং এটি আমাদের সবার জন্যই একটি মুক্তির বার্তা।’ এই চুক্তির ফলে বিশ্বের খাদ্যশস্যের মূল্যস্ফীতি সহনীয় হয়ে আসবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং রাশিয়াকে একে ‘সরল বিশ্বাসে’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।

তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে মাত্রায় অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে তাতে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কাজ করবে এবং কতদিন তা টিকবে তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা পল অ্যাডামস বলছেন, কাগজে-কলমে চুক্তি সবার জন্য অত্যন্ত সুখবর। পাঁচ মাস বাদে ইউক্রেন খাদ্য রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। ফলে যেসব দেশ ইউক্রেনের গম ও তেলবীজের ওপর নির্ভরশীল তারা কিছুটা হলেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।

এদিকে চুক্তি হতে যাচ্ছে তা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই বিশ্ব বাজারে গমের দাম বেশ কিছুটা পড়ে গেছে। তার নিজের খাদ্য রপ্তানিতে রাশিয়ারও কিছু অসুবিধা দূর হবে। সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্যকে রাশিয়া অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বহু দেশে দুর্ভিক্ষের কারণ হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা খণ্ডনের একটি সুযোগ রাশিয়া পাবে।

পল অ্যাডামস বলছেন, এমন অনেক ঝুঁকি রয়েছে যাতে যেকোনো সময় এই চুক্তি ধসে পড়তে পারে। প্রথম কথা, রাশিয়া যাতে সাগরপথে সৈন্য সমাবেশ না করতে পারে তার জন্য কৃষ্ণসাগরে উপকূলের কাছে বিশাল এলাকায় মাইন পেতে রেখেছে ইউক্রেন। জাহাজ বন্দরে ভেড়ার জন্য এখন তাদেরকে সাগরে মাইনমুক্ত ‘সেফ প্যাসেজ’ নিশ্চিত করতে হবে। ইউক্রেনের ভয়, সেটা করলে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সেনাবাহিনী তার সুযোগ নিতে পারে।

এক বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার রাতে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ‘শক্ত সামরিক অবস্থান’ অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হলেই তারা এই চুক্তিতে সই করবে।

অন্যদিকে রাশিয়ার শর্ত যে খাদ্য রপ্তানির সূত্রে ইউক্রেন যেন কোনোভাবেই সাগরপথে অস্ত্র নিয়ে না আসতে পারে।

শিপিং কোম্পানিগুলো ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে যেতে কতটা আগ্রহী হবে সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ সাগরে কোনো একটি জাহাজে একটি বিস্ফোরণ হলেই এই চুক্তি ভেস্তে যাবে। এরপর কোনো জাহাজই আর ধারেকাছে ভিড়বে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত