চবির দুই শিক্ষার্থী আজীবন বহিষ্কার

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২২, ০৬:২৮ এএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জড়িত মূল হোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। তাদের মধ্যে চারজনকে গত শুক্রবার রাতে চবিসংলগ্ন এলাকা ও রাউজানে আলাদা অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। পরে গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকা থেকে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে যৌন নিপীড়নের সময় ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল এবং ছিনতাই হওয়া দুটি মোবাইলসহ তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের ওই ঘটনায় মোট ছয়জন জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাব। বাকি একজনকে আটকের চেষ্টা চলছে। আটককৃতদের মধ্যে ঘটনার মূল হোতা মো. নাজিম চবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী এবং সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।

এদিকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গ্রেপ্তার চবির দুই ছাত্রকে আজীবন বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিকেলে উপাচার্য অধ্যাপক শিরীণ আখতারের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া বলে জানিয়েছেন প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া।

বহিষ্কৃতরা হলেনÑইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজিম, নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুল আবছার বাবু।

যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিষয়ে জানাতে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাটের চান্দগাঁও ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ জানান, ‘ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে জানতে পারি, আজিমের নেতৃত্বে এ ঘটনার সঙ্গে ৬ জন সম্পৃক্ত। অভিযুক্ত সাইফুলকে ধরতে পারলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক ঘটেছে। পূর্ব কোনো পরিকল্পনা ছিল না তাদের। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ছাত্রী। তিনি গত ১৭ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বন্ধুকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা হয়ে প্রীতিলতা হলসংলগ্ন রাস্তায় যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১০টার দিকে অজ্ঞাত ৫ জন তাদের পথরোধ ও জেরা করতে থাকে। এ সময় তার বন্ধুকে মারধর করতে থাকে তারা। তখন বাধা দিলে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে মারধরের একপর্যায়ে ভুক্তভোগী ও তার বন্ধুকে জোর করে বেগম ফজিলাতুন নেছা হলের পেছনে ইটের রাস্তা দিয়ে ঝোপঝাড়ের দিকে নিয়ে যায়। মারধরের পর শ্লীলতাহানি করে ও অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে।’

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, নিপীড়নে জড়িতদের একজন হুমকি দেয় যে, তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক না করলে ধারণকৃত ভিডিও ভাইরাল করে দেবে। তারা এক ঘণ্টা আটকে রেখে ভুক্তভোগী ও তার বন্ধুর দুটি মোবাইল ও নগদ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে গত ২০ জুলাই হাটহাজারী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের ধরতে র‌্যাব নজরদারি এবং তৎপরতা চালায়। গত শুক্রবার রাতে হাটহাজারী ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. আজিম (২৩), হাটহাজারী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. নুর হোসেন শাওন (২২), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. নুরুল আবছার বাবু (২২), হাটহাজারী কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. মাসুদ রানাকে (২২) আটক করা হয়।

ছাত্রী হেনস্তায় অভিযুক্ত আজিম নোয়াখালীর হাতিয়া থানার চর ভারত সেন এলাকার মো. আমির হোসেনের পুত্র। নুর হোসেন শাওন হাটহাজারীর ফতেপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জাবেদ হোসেনের ছেলে। নুরুল আবছার বাবু ফেনীর পরশুরাম বেড়াবাড়ি এলাকার বেলায়েত হোসেনের ছেলে। মাসুদ রানা ঝালকাঠির আশিয়ার এলাকার আবদুল মান্নানের ছেলে।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, হাটহাজারী সরকারি কলেজের দুই শিক্ষার্থীর আত্মীয়-স্বজন চবিতে কর্মরত থাকার কারণে তারা প্রায়ই ক্যাম্পাসে থাকে।  এ ছাড়া গতকাল বিকেলে আটক করা সাইফুল ইসলাম হাটহাজারী কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। তার পিতার নাম শামসুল গাজী।

ছাত্রী হেনস্তায় জড়িতদের আজীবন বহিষ্কার: যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। তিনি বলেন, ‘ছাত্রী হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত সময়ে গ্রেপ্তার করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ। জড়িত দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অন্যরা বহিরাগত। বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা জড়িত তাদের আজ-কালকের মধ্যে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে ৩৪তম সিনেট অধিবেশনে সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়েশা খানের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

সিনেটে ওয়াশিকা আয়েশা খান বলেন, ‘বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। তবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযুক্তদের আটক করতে সক্ষম হয়েছে।’ এ সময় তিনি শিক্ষাঙ্গনে নারীর ক্ষমতায়নের দাবি জানান।

চবি উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আরও লাইটিং এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

পরে গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির বিশেষ সভায় ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজিম, নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুল আবছার বাবুকে আজীবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া একজন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে থাকে, তাহলে তাদেরও আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত রবিবার (১৭ জুলাই) রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হতাশার মোড় থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় নিয়ে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। পাঁচজন ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করা হয়। পরে ১৯ জুলাই প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেন ওই ছাত্রী।

এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে একই দিন হাটহাজারী থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাও করেন। ওই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশের নির্দেশনা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বুধবার গভীর রাত অবধি হলের বাইরে বিক্ষোভে দোষীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। পরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত