লোনাপানির জীবনে বাল্যবিবাহের অভিশাপ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২২, ১০:১০ পিএম

বিশ্বে বাল্যবিবাহপ্রবণ শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। ২০২০ সালে ইউনিসেফের (জাতিসংঘ শিশু তহবিল) এক প্রতিবেদন অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে শীর্ষে। সম্প্রতি ব্র্যাকের ‘অ্যাডোলেসেন্ট গার্লস ভালনারেবিলিটিস অ্যান্ড ট্রানজিশন ইন দ্য কনটেক্সট অব কভিড-১৯’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ কিশোরী করোনাকালে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। করোনাকালে বাল্যবিবাহ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। আইনে নিষেধ কিন্তু বাল্যবিবাহ চলছেই। তথ্য মতে, ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতো। ২০১৮ সালে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, বাংলাদেশে যত বাল্যবিবাহ হয় তার এক-তৃতীয়াংশ হয় উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় জেলাসমূহ খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও ভোলায় বাল্যবিবাহ আগের থেকে অনেক বেড়েছে। বাল্যবিবাহের ক্ষতি কমবেশি সবারই জানা। বাল্যবিবাহের কবলে পড়া কিশোরী ও তার ভবিষ্যৎ সন্তানের জীবনের ঝুঁকি তো থাকেই, একই সঙ্গে তা সার্বিকভাবে সমাজে নানা অস্থিরতাও বাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, উপকূলীয় অঞ্চলে কেন বাল্যবিবাহের হার বেশি? আসলে উপকূলের মানুষ ভালো নেই। উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততার প্রভাব ও সুপেয় পানির অভাবে উপকূলের জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় সর্বত্র জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মানুষ কাজ হারাচ্ছে। দুর্যোগে জমি ও ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। একটা দুর্যোগের পর ঘুরে না দাঁড়াতেই আরেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। জীবনকে যেন কোনোভাবেই গুছিয়ে তুলতে পারছে না উপকূলবাসী। তবে, দারিদ্র্যের কারণেই শুধু বাল্যবিবাহ হয় না এর সঙ্গে অন্যান্য কারণও রয়েছে। নিরাপত্তার অভাব ও পারিবারিক সম্মান হারানোর ভয়ে এখন বাল্যবিবাহ বেশি হচ্ছে। এসব পরিবারে এখনো অনেক কুসংস্কার রয়ে গেছে। ছেলেমেয়েদের সমান দৃষ্টিতে দেখা হয় না! পরিবারে একটা কিশোরী মেয়ে থাকা মানেই যেন একটা বোঝা! বিয়ে দিতে পারলেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে উপকূলীয় গরিব পরিবারগুলো। অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু মেয়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিজেকে রক্ষা করছে। কিন্তু বেশির ভাগ কিশোরী প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও পাচ্ছে না। বাল্যবিবাহ যে কতটা ভয়াবহ অধিকাংশ কিশোরী তা জানে না কিংবা সে হয়তো কখনো জানার সুযোগই পায়নি। ইভটিজিংয়ের ভয়, পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও পিতা-মাতার মুখের দিকে তাকিয়ে শত শত কিশোরী বাল্যবিবাহ করতে বাধ্য হচ্ছে।

উপকূলের বাস্তব অবস্থাটা সত্যিই ভয়াবহ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক তথ্য বলছে, করোনাকালের দেড় বছরে খুলনার ১০ উপজেলায় ৩ হাজারের বেশি বাল্যবিবাহ হয়েছে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সবাই কথা বলে। কিন্তু সমাজ তথা এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের নীতিনির্ধারকরা, গণমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসন থেকে কিশোরীদের নিরাপত্তা, কিশোরীর পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস, পাশে দাঁড়ানোর অভয় বাণী দেওয়া হয় খুব সামান্যই। বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া একজন কিশোরী আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া একজন কিশোরীর মধ্যে পার্থক্য অনেক। পড়ালেখা না করলে সমাজে তার গুরুত্ব কমে যায়, স্বামীসহ যে পরিবারে তার বিয়ে হয় সেখানকার কেউই তার মতামতের গুরুত্ব দেয় না, চাকরি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। এসব বিষয় উপকূলের গরিব পরিবারগুলোর অভিভাবক ও কিশোরীরা জানলেও হয়তো মানে না। তাই সবার চোখের সামনেই প্রতিদিন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় জন্মনিবন্ধন সনদ জাল করে ও বিভিন্ন ছলনার আশ্রয় নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

করোনাকালের আগে ও পরের বাল্যবিবাহের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। গত দুই বছরে বাল্যবিবাহের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত দুই বছরে এসএসসি পাস না করেই হাজার হাজার কিশোরীর বিয়ে হয়ে গেছে। গবেষণা বলছে, করোনার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও হাজার হাজার কিশোরী আর বিদ্যালয়ে ফেরেনি। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের’ জরিপে উঠে এসেছে, করোনাকালে ১৩ থেকে ১৫ বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ মেয়ের। করোনাকালে আগের থেকে ১৩ শতাংশ বাল্যবিবাহ বেড়েছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনাকালে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে পুরো দেশের চিত্র যেখানে ভয়াবহ, সেখানে উপকূলের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আসলে একের পর এক দুর্যোগে ক্ষত-বিক্ষত উপকূলের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা এই করোনাকালে আরও খারাপ হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেকে কাজ পাচ্ছে না। পাঁচ-ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করা অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। করোনাকালে যৎসামান্য সাহায্য অনেকে পেয়েছেন বটে, তাতে আর কতটুকুইবা সমাধান মিলে! ফলে উপকূলের অভিভাবকরা নিজের কিশোরী হওয়া মেয়েটাকে আর ঘরে রাখতে চাচ্ছে না। কিশোরী মেয়েটাকে দ্রুত বিয়ে দেওয়াটাই তাদের জন্য অনেক বেশি স্বস্তির! সুদর্শন পাত্র, টাকাওয়ালা ও প্রবাসী শ্রমিক পেলে গরিব অভিভাবক যেন সবকিছু ভুলে যায়! ভালো-মন্দ বিচার না করেই কিশোরী মেয়েকেই বাল্যবিবাহ দিয়ে দেয়। অনেক পরিবার উপকূল ছেড়ে শহরে এসে তাদের মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিয়ে দিচ্ছে।

উপকূলের এই সামাজিক সংকটের নেপথ্যে জলবায়ু পরিবর্তনেরও বড় ধরনের ভূমিকা আছে। উপকূলে লবণাক্ততার প্রভাব বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ব্যাপকভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব দেখা দিয়েছে। টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানি কিনতে হচ্ছে। যাদের সামর্থ্য নেই সেসব পরিবারকে বাধ্য হয়েই লবণপানি পান করতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন লবণপানির সঙ্গে বসবাস করতে করতে কিশোরীদের শরীরে নানা রকম রোগ বাসা বাঁধছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো ব্যক্তির পক্ষে প্রতিদিন ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। সেখানে উপকূলের কিশোরীদের প্রতিদিন ১৫ গ্রামের বেশি লবণপানি খেতে হচ্ছে! লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে একজন কিশোরীর যখন বাল্যবিবাহ হচ্ছে তার গর্ভের সন্তানও অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া লবণ বেশি খাওয়ার ফলে হাইপার টেনশন, হার্ট অ্যাটাক, প্রজনন অঙ্গের সংক্রমণ ও গর্ভপাত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করার ফলে বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া নারীদের জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। এভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে করতে কিশোরী ও তাদের পারিবারগুলো প্রতিদিনই যেন জীবনের কাছে একটু একটু হেরে যাচ্ছে!  বাল্যবিবাহ রোধে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের আগে বিয়ে বন্ধ করতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতেই হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব খুব সহসায় কাটবে না। তাই উপকূলের বাল্যবিবাহ রোধে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। বাল্যবিবাহকে এখনই ‘না’ বলতে হবে। শুধু আইন করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাবে না। উপকূলীয় এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে ‘কিশোরী প্রকল্প’ নামে তাদের জীবনমানের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। উপকূলের পরিবারগুলোর উন্নয়নে সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধে বিদ্যালয় ও পরিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কিশোরীদের সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে হবে। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব রোধে সব ধরনের প্রকল্পের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সহায়ক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত