দেশে বিদ্যুৎ সংকট চলছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার জন্য অফিস সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাব পেয়েছে সরকার। সরকারপ্রধান বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যও বাড়তি। দফায় দফায় ডলারের সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এই অবস্থায় আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে নতুন নির্দেশনা আসতে পারে বলে একজন সিনিয়র মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সরকারের মন্ত্রীরা অনেক বিষয়েই অন্ধকারে রয়েছেন। বিশেষ করে নিজের মন্ত্রণালয়ের বাইরের বিষয়ে তারা সরকারের অবস্থান সম্পর্কে খুব কমই জানেন। যতটুকু জানেন সেটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে জানার চেষ্টা করেন। এই অবস্থায় মন্ত্রিসভা বৈঠকই মন্ত্রীদের ভরসা। এই ফোরামের বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী নানা বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তাই আগামীকালের (আজ সোমবার) বৈঠকে অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি এজেন্ডায় না থাককেলও এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কভিডকালেও নানা নির্দেশনা মন্ত্রিসভার মাধ্যমে দিতেন।
আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠক ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন এবং মন্ত্রীরা সচিবালয়ে অবস্থান করবেন। এজেন্ডায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে গত এপ্রিল থেকে জুন মাসের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। তিনটি আইনের চূড়ান্ত খসড়া উপস্থাপন করা হবে। এগুলো হচ্ছে এভিডেন্স অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন এবং গ্রাম আদালত আইন। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ নীতিমালার খসড়া উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া কয়েকজন মন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে অবহিতকরণের বিষয় এজেন্ডায় রয়েছে।
ধর্ষণের বিচারে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বাতিল হচ্ছে : ধর্ষণ মামলায় নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বাতিল করার জন্য ১৫০ বছরের পুরনো এভিডেন্স অ্যাক্ট (সাক্ষ্য আইন) সংশোধন করতে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন চেয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। ধর্ষণ মামলায় ধর্ষিত নারীকে নষ্ট চরিত্রের বা খারাপ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। নারীকেই দুশ্চরিত্র প্রমাণের সুযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তি ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। তদন্তের সময়ও কুরুচিপূর্ণ প্রশ্নের মাধ্যমে পুলিশের কাছে অভিযোগকারীকে পাল্টা হেনস্তার শিকার হতে হয়।
ধর্ষিত নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করার বিধান আইনে রয়েছে। এভিডেন্স অ্যাক্ট সংশোধন করে এ আইনি অধিকার বাতিল করা হচ্ছে। এভিডেন্স অ্যাক্ট সংসদে পাস হওয়ার পর ধর্ষণ মামলার যে ভুক্তভোগী তাকে তার চরিত্র সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। জেরা করার সময় শালীনতা বজায় রেখে প্রশ্ন করার ব্যাপারে আদালত ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তার আইনজীবীকে নির্দেশনা দিতে পারবে।
আইন ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য চিহ্নিতকরণ ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ, প্রমাণের দায়ভার, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি ও আদালতে সাক্ষ্য উপস্থাপনসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণের জন্য ১৮৭২ সালে এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়। এ আইনেই ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীকে জেরাকালে তার চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। যা নারীর জন্য মর্যাদাহানিকর ও আইনের চোখে সমতানীতির পরিপন্থী। কভিড শুরুর পর থেকে অনলাইনে মামলা-মোকদ্দমা চলছিল, এর ফলে সাক্ষ্য-প্রমাণ সব অনলাইনেই আসছিল। কিন্তু এভিডেন্স অ্যাক্টে এরকম ডিজিটাল এভিডেন্সের সরাসরি কোনো বিধান ছিল না। কেউ মামলায় হেরে যদি উচ্চ আদালতে আপিল করতেন, সেক্ষেত্রে আইনি কিছু জটিলতা হওয়ার সুযোগ ছিল। এখন থেকে ডিজিটাল যে এভিডেন্স, সেগুলোও গ্রহণ করা হবে।
জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রাম আদালত : গ্রাম আদালত কার্যকর করেছিল প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার। গ্রামীণ বিচার-আচার স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্পত্তি করার জন্য ১৯৭৬ সালে এ আদালত চালু হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ মেয়াদে আদালতটি জনপ্রিয় হয়। পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত আইন করলেও কার্যকর করতে পারেনি। আইনটি কার্যকর হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। গ্রাম আদালত সাফল্যের মুখ দেখার কারণেই সরকার আইনটি দ্বিতীয় দফায় সংশোধন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
গত চার বছরে ২৭ জেলার ১ হাজার ৮০টি ইউনিয়নের গ্রাম আদালতে মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ২৩৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৫৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে; যা ৮৪ শতাংশ। এই সময়ে ১৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে বিচারাধীন মামলা প্রায় ৩৭ লাখ। তবে বেসরকারি হিসাবে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। মূলধারার বিচারব্যবস্থায় ঝুলে থাকা এসব মামলা বিচারপ্রার্থীদের হয়রানির অন্যতম কারণ। গ্রাম আদালত উচ্চ আদালতে মামলার জট কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৪টি মামলা উচ্চ আদালত থেকে গ্রাম আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে অনির্বাচিতরা বসে আছেন। তাদের হাতে বিচারের ভার দেওয়া নিরাপদ নয়। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট বিচার করার অভিযোগ রয়েছে। এই আদালত কার্যকর হবে তখনই, যখন নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ গঠন হবে।’
দীর্ঘদিন থেকেই বিরোধ-বিবাদ মীমাংসার মাধ্যম হিসেবে সালিশি ব্যবস্থা প্রচলিত। সালিশি ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।
