আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনের পাশাপাশি সরকারেরও আগ্রহ রয়েছে। তবে যন্ত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনীতিতে চলছে বিতর্ক। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন আলোচনা এখানেও আছে যে, ইভিএম প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন এখনো ভোটার ও অংশীজনদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।
এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ইভিএম সম্পর্কে বেফাঁস কথা বলে বিতর্কের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সহায়তা করে যাচ্ছেন। যেন বিতর্ক আরও উসকে দিতে কাজ করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন এলেই ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ইভিএম নিয়ে বেফাঁস কথা বলতে শুরু করেন। এ কারণে ইভিএম নিয়ে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে যে মতপার্থক্য ও অনাস্থা তৈরি হয়ে আছে তা আরও ঘনীভূত হয়। এছাড়া ইভিএমে আস্থা অর্জনে নতুন নির্বাচন কমিশনের চলমান কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ইভিএম নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাদের অগ্রহণযোগ্য এসব বক্তব্য সরকারকেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দল থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে বিতর্কিত মন্তব্য করার নেতাকর্মীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এতে করে ইভিএমে ভোটগ্রহণ নিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির বিষয়টি আরও জোরালো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা এমনটাই মনে করছেন।
ওই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমন বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। সংলাপে আসা রাজনৈতিক নেতারা এসব বিষয় উদাহরণ হিসেবে কমিশনের কাছে তুলে ধরেন।
ইভিএম বিতর্ক যখন তুঙ্গে ওই সময়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মুজিবুল হক চৌধুরী এক জনসভায় বলেন, ‘ইভিএম না থাকলে রাতেই সব ভোট নিয়ে নিতাম।’ গত ২৮ মে এক নির্বাচনী ওই জনসভায় তিনি আরও বলেন, ‘ইভিএম বাটন টিপ দিতে কেন্দ্রে আমার লোক থাকবে।’ শুধু এখানেই থেমে যাননি তিনি, গত ২ জুন আরেক নির্বাচনী সভায় বলেন, ‘তোমার আঙুল টিপ দেব আমি।’
গত ৩০ মে নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খানের অন্য একটি বক্তব্যও ইভিএম আলোচনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেছেন, ‘ইভিএমের মধ্যে চ্যালেঞ্জ একটাই, সেটা হচ্ছে একটা ডাকাত সন্ত্রাসী গোপন কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকে, আপনার ভোট হয়ে গেছে চলে যান। দিস ইজ দ্য চ্যালেঞ্জ।’ সর্বশেষ গত শনিবার পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জোবায়েদুল হক রাসেলও ইভিএম নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেন। বাউফল উপজেলার নাজিরপুর তাঁতেরকাঠি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষে রাসেল বলেন, ‘ভোট হবে ইভিএমে, কে কোথায় ভোট দেবে তা কিন্তু আমাদের কাছে চলে আসবে।’
ভোটের আগে ইভিএম নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্যে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ বক্তব্যের একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ওই নেতাকে বলতে শোনা যায়, ‘ভোট হবে ইভিএমে, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নাই, টেনশনেরও কিছু নাই।’ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী ইব্রাহিম ফারুককে সঙ্গে নিয়েই বেফাঁস এ মন্তব্য করেন রাসেল। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি। এর আগের দিন শুক্রবার অন্য একটি নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেন, ‘যারা নৌকায় ভোট দেবেন, তারাই কেবল ভোটকেন্দ্রে যাবেন।’ সেখানে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান।
ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাদের এমন অসংলগ্ন বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিয়ে যেমন শঙ্কা তৈরি হয়, তেমনি ইভিএম পদ্ধতিও বিতর্কের মুখে পড়ে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোটখাটো নেতারা এসব বেফাঁস কথা বলেন। তাদের বক্তব্য তেমন প্রভাব পড়ে না, তাই দ্রুত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। ওই নেতারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগে অনেকেই আছেন, তারা না জেনে না বুঝে কথা বলেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের বেফাঁস কথা আমলে না নেওয়া ঠিক নয়। ছোটখাটো নেতা হলেও গুজব ছড়ায় আওয়ামী লীগ নেতার নামেই। ফলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, এসব বেফাঁস কথার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় দল বিশৃঙ্খলভাবেই চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারদলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা যখন এসব মন্তব্য করেন কমিশনের চলমান কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়ে। তিনি বলেন, সরকারদলীয় নেতাদের এ ধরনের বক্তব্য পরিহার করা উচিত। হোক বড় বা ছোট নেতা। যারা বেফাঁস কথা বলেন তাদের বিরুদ্ধে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সব মানুষের বক্তব্য আমলে নেওয়া কি সম্ভব?’ তৃণমূলের যেসব নেতা বেফাঁস কথা বলে বেড়ান তাদের ব্যাপারে দলীয়ভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ তো সেনাবাহিনীর নিয়মে চলে না যে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।’
