শারীরিক গঠন, কণ্ঠস্বর শিশুর মতো। দেখে মনে হবে যেন চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী। তবে তানিয়া নামের পাবনার ব্যতিক্রমী শারীরিক গঠনের মেয়েটির বয়স ২২ বছর। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয়েছেন আটঘরিয়া সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য আর সামাজিক নানা বাধা এড়িয়ে তানিয়া এনেছে জীবন সংগ্রামের সাফল্য।
পাবনার আটঘরিয়ার চাঁদভা ইউনিয়নের হাপানিয়া গ্রামের দিনমজুর তাজুল ইসলামের মেয়ে তানিয়া। জন্মের পর থেকে ঠিকঠাকই বেড়ে উঠছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ঠান্ডা, জ্বর ও ক্ষুধামন্দাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে সে। এরপর থেকেই তার শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আসে। দরিদ্র বাবা সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেও তানিয়ার চিকিৎসা করাতে পারেননি।
ব্যতিক্রমী এই শারীরিক গঠনের কারণে তানিয়া শিকার হন সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার। সেই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তিনি এখন আটঘরিয়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
তানিয়া বেরুয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী শেষ করে বেরুয়ান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২১ সালে বেরুয়ান মহিলা কলেজের মানবিক বিভাগ থেকেই জিপিএ ৩.৬৭ পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে সর্বশেষ আটঘরিয়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ে অনার্স ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।
তানিয়া বলছিলেন, ‘স্কুলে পড়ার সময় হঠাৎ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। বন্ধুবান্ধব ও সমবয়সীদের সঙ্গে শারীরিক গঠনে পার্থক্য হয়ে যায়। প্রথম দিকে কেউ কিছু না বললেও ধীরে ধীরে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কেউ বলত বামন, কেউবা লিলিপুট। শারীরিক গঠন স্বাভাবিক না হওয়ায় পরীক্ষার সময় অনেকেই আমাকে পাশে বসতে দিতে চাইত না। মন খারাপ হলেও আমি ভেঙে পড়িনি। লেখাপড়া চালিয়ে গেছি। বোঝা নয়, লেখাপড়া করে পরিবারের অবলম্বন হতে চাই। আমি নিজের স্বপ্নপূরণে সবার সহযোগিতা চাই।’
তানিয়ার বাবা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছোট থেকে ঠিকঠাকই বড় হচ্ছিল তানিয়া। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাঝেমধ্যে দেখা দিতে থাকে ঠান্ডা-জ্বর ও ক্ষুধামন্দাসহ নানা ধরনের ছোটখাটো রোগ। এরপর দেখা যায় তার শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছে না। তখন এলাকার লোকদের পরামর্শে চিকিৎসা করাতে যাই। কিন্তু রিকশাচালক দিনমজুর হিসেবে আর্থিক দৈন্যতায় দুই মাস চিকিৎসা চালাতে পারলেও পরে আর সেটা পারিনি। তারপর থেকে তার শারীরিক গঠন আরও অবনতি হয়। এখন সবাই অটিজম বলে তামাশা করে। বিয়ে দিতে পারব না, বোঝা হয়ে দাঁড়াবে বলে করুণা করে। কিন্তু আমি হতাশ হইনি। লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা দিয়েছি। সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমার আবেদন উন্নত চিকিৎসা যদি ওকে করানো যেত তাহলে অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারত। ভবিষ্যৎ একটা ব্যবস্থা যদি কেউ করে দেয় তাহলে সে আর বোঝা হয়ে থাকবে না।’
আটঘরিয়া কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রজব আলী বলেন, ‘আর দশটা শিক্ষার্থীর মতোই আমরা ওকে দেখছি। বরং লেখাপড়ার প্রতি দারুণ স্পৃহাসম্পন্ন ওর মতো একজন শিক্ষার্থী পেয়ে আমরা গর্বিত।’ অধ্যক্ষ (চলতি দায়িত্ব) মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ তানিয়ার লেখাপড়ায় সার্বিক সহয়তা দেবে। সব শিক্ষার্থীকেও বলে দিয়েছি যেন ওকে কেউ ভিন্ন নজরে না দেখে। আমরা ওর পাশে আছি।’
পাবনা স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালের মেডিসিন, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ মো. শাহিনুর রহমান বলেন, ‘মূলত তানিয়ার শারীরিক বৃদ্ধি হরমোনজনিত জটিলতায় আটকে গেছে। বয়ঃসন্ধিকালে তার সঠিক চিকিৎসা হলে তাকে অনেকটাই স্বাভাবিক করা সম্ভব ছিল। তার হাড়ের গঠন, হরমোনসহ শারীরিক পরীক্ষার পর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত বলা যাবে। তবে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হলে পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হবে।’
আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তানভীর ইসলাম বলেন, ‘সরকার অটিস্টিকদের প্রতি বিশেষ নজর রাখছে। আমরাও তানিয়ার প্রতি বিশেষ নজর রাখব। এত বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে তানিয়ার আজকের অবস্থান অন্যান্য বিশেষ শিশুর জন্য অনুপ্রেরণা। এ ক্ষেত্রে তানিয়া আমাদের আটঘরিয়া তথা পাবনার গর্ব।’
