ডি-৮ নামে পরিচিত বাংলাদেশসহ মুসলিমপ্রধান আট দেশের জোট নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এর জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন (ইপিজেড) করা হবে। এটি হলে দেশগুলোর আন্তঃবাণিজ্য আগামী ১০ বছরের মধ্যে আরও ১০ শতাংশ বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ডি-৮ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডি-৮ সিসিআই) রজতজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সম্মেলনে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা। তারা বলেন, একসঙ্গে কাজ করলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাই লাভবান হতে পারবে।
দুদিনের সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ডি-৮-এর সেক্রেটারি জেনারেল রাষ্ট্রদূত ইসিয়াকা আব্দুল কাদির ইমাম। সভাপতিত্ব করেন ডি-৮ সিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম।
সম্মেলনের প্রথম দিন গতকাল সাধারণ পরিষদে ছয়টি ক্ষেত্রের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য রোডম্যাপ ও এর কৌশলগুলো নিয়ে আলোচনা হয়, যা দ্বিতীয় দিন ডি-৮ মিনিস্ট্রিয়াল পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন বলেন, ‘কোনো ধরনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াই (এফটিএ) বর্তমানে আমরা নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করে যাচ্ছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের প্রচুর যোগ্য জনবল আছে, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। জনশক্তি এই জোটের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।’ এসব বিবেচনায় ডি-৮ আরও সামনে এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশ ভালো করছে। উৎপাদন, শিল্প, সেবা, কৃষি, রপ্তানি তথা জিডিপি প্রবৃদ্ধি সব দিক থেকে বাংলাদেশ এই করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ভালো অবস্থানে আছে। ডি-৮ সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের এই উন্নয়ন ধারায় সম্পৃক্ত হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, যার মাধ্যমে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা, তথ্য বিনিময় ও সেবা সরবরাহের ক্ষেত্র আরও সহজ হতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে। দেশগুলো একে অপরকে সহযোগিতা করলে এই সংকট নিরসন সম্ভব। এতে করে সবাই লাভবান হতে পারবে। তিনি বলেন, ডি-৮ভুক্ত দেশগুলোর একই ধর্ম, রয়েছে বিশাল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। একসঙ্গে কাজ করলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাই লাভবান হতে পারবে।
সালমান এফ রহমান বলেন, সাড়ে ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যা হলেও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল, মাছসহ নানাবিধ পণ্য রপ্তানিও হচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি বিনিয়োগবান্ধব দেশ উল্লেখ করে নির্দ্বিধায় বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
একই অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক সংকট নিরসনে একসঙ্গে কাজ করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, ডি-৮ সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার ভ্যালু চেইন ইন্টিগ্রেশনে সক্ষম একটি কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক অগ্রগতি বিস্তারে বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন আছে। প্রয়োজনে ডি-৮ভুক্ত দেশগুলোর জন্য বিশেষ ইকোনমিক জোন তৈরি করা হবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখাবে এবং প্রবৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। সদস্য উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের আহ্বানও জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বৈশ্বিক সংকটে একমাত্র সমাধান হলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ফোরামভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। সদস্যভুক্ত দেশগুলোর টেকসই ব্যবসা প্রসারে টেকসই ও শক্তিশালী ভ্যালু চেইন তৈরিতে বিজনেস টু বিজনস (বি-টু-বি) এবং সরকারি পর্যায়ে অর্থাৎ জি-টু-জি ভিত্তিতে যেটা যে ফরম্যাটে দরকার তাই করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ সরকার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়িক সংলাপ ডি-৮ সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য বিনিয়োগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করবে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নানা দিক তুলে ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া বক্তারা অর্থনৈতিক খাতের প্রযুক্তিগত বিনিময়, আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব, সুনীল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ উদ্যোগের পরিবেশকে ভ্যালু চেইন ইন্টিগ্রেশন বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ডি-৮-এর সেক্রেটারি জেনারেল রাষ্ট্রদূত ইসিয়াকা আব্দুল কাদির ইমাম ছাড়াও বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কের চেম্বারস অব কমার্সের সভাপতি, প্রতিনিধিদল এবং ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য রাখেন। ডি-৮ সদস্য দেশের ৪০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন।
সম্মেলনে আগত দর্শনার্থীদের জন্য করা প্রদর্শনী কেন্দ্রে ‘বিল্ড ইন বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’-এ বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল স্থাপন করা হয়েছে। আজ বুধবার সম্মেলন শেষ হবে।
