জ্ঞানপাপীদের কথা শুনে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২২, ০২:১৮ এএম

দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পেট্রল ও অকটেন মজুদ আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ডিজেল আমাদের কিনতে হয় এটা ঠিক। কিন্তু অকটেন আর পেট্রল কিনতে হয় না। আমরা যে গ্যাস উত্তোলন করি সেখান থেকে বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে রিফাইন করা পেট্রলও পাই, অকটেনও পাই।’

এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে তিনি বলেন, ‘রিজার্ভ রাখা হয় যাতে আপদকালীন সময়ে তিন মাসের খাদ্যশস্য কেনা যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রিজার্ভ আছে তাতে তিন মাস কেন, নয় মাসের খাবারও কিনে আনতে পারব।’

গতকাল বুধবার আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এ সভায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

জ্ঞানপাপীদের কথা শুনে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়, সেদিকে সজাগ ও সচেতন থাকারও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ষড়ঋতুর দেশ আমাদের। দুই মাস পরপর ঋতু বদলায়, মানুষের মনও বদলায় এবং ভুলেও যায়। কাজেই দুই মাস পর ভুলে যেন না যায়, সেজন্য আমরা কী কাজ করেছি তা মানুষের কাছে বারবার বলতে হবে এবং বোঝাতে হবে। কারণ একটা শ্রেণি আছে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। এসব জ্ঞানপাপীর কথা শুনে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়। পাশাপাশি আমাদের রিজার্ভ নিয়ে কথা বলেন। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন রিজার্ভ কত ছিল? তিন বিলিয়নের কিছু ওপরে; ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাহত করার অনেক ষড়যন্ত্র আছে। কিন্তু উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য গতিকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘যখন করোনাভাইরাস থেকে একটু উত্তরণ ঘটাতে আমরা চেষ্টা করছি, তখন শুরু হয়ে গেল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এর পাশাপাশি দেওয়া হলো নিষেধাজ্ঞা। পাল্টাপাল্টি স্যাংশন দেওয়ার ফলাফল সারা বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের অভাব, ভোজ্য তেলের অভাব। সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি রক্ষা করতে উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে।’

বিশ্বের সব দেশই সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে যেন এরকম দৃশ্য না আসে সেজন্য আগাম পদক্ষেপ নিয়েছি। সবাইকে আহ্বান করেছি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে, পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে। নিজেদের সঞ্চয় নিজেদের করতে হবে।’

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তার ঢেউ থেকে বাংলাদেশ বাদ যাচ্ছে না, যায় না। আমদানিনির্ভর পণ্যে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। বিদ্যুতে ভর্তুকি দিচ্ছি, জ্বালানিতে ভর্তুকি দিচ্ছি। ভর্তুকি দিয়েই যাচ্ছি। তারপরও আমাদের লক্ষ্য উৎপাদন যেন অব্যাহত থাকে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পর আমরা যখন সরকার গঠন করি ২০০৯ সালে রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছিল। যেখানে মাত্র ৭ বিলিয়নের মতো পেয়েছিলাম। সেখান থেকে ৪৮ বিলিয়ন পর্যন্ত রিজার্ভ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলাম। করোনাকালীন আমাদের আমদানি বন্ধ ছিল। এরপর আমদানি করতে হয়েছে। আমদানি করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য আমাদের রিজার্ভ খরচ করতে হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ভ্যাকসিন কিনে দিয়েছি। এই যে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দিলাম, বিনা পয়সায় টেস্টিংÑ সে খাতে তো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি একটা ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য সিরিঞ্জ থেকে যা যা দরকার সেগুলোও তো বিদেশ থেকে কিনে আনতে হয়েছে। শুধু কেনা নয়, আমাদের বিমান পাঠিয়ে বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। সেখানে বিরাট অঙ্কের টাকা খরচ করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আমদানিগুলো সমস্ত ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এটা মাথায় রাখতে হবে। এই ক্যাপিটাল মেশিনারিজ দিয়ে যেসব শিল্প গড়ে উঠবে সেখানে যখন প্রোডাকশনে যাবে সেখানে তো আমাদের দেশের মানুষই লাভবান হবে। এটা তো সহজ। এই খরচ তো আমাদের করতেই হবে।’

ডি-৮ দেশগুলোর শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক গড়তে গুরুত্বারোপ : করোনাভাইরাস মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটে বিশ্ব যে কঠিন সময় পার করছে, সে কথা তুলে ধরে ডি-৮ জোটকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘ডি-৮ এখন সমন্বয় তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আমাদের সরকারি-বেসরকারি খাতের অর্থপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়েছে। আমাদের অপার সম্ভাবনা যদি সঠিকভাবে অর্জন করা যায়, তাহলে একটি অর্থনৈতিক ব্লক হিসেবে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে।’

গতকাল ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উন্নয়নশীল আটটি দেশের জোট ডি-৮-এর ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ডি-৮-এর মন্ত্রিপর্যায়ের ২০তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মহামারী, সংঘাত, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্ব যেহেতু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেহেতু আগের চেয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও বৈশ্বিক সংহতি আরও বেশি প্রয়োজন।’

মহামারীর ক্ষত কাটিয়ে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব বিশ্বকে নতুন বিপদে ঠেলে দিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সংঘাতে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় খাদ্য, সার, শক্তি ও বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত করেছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমাদের সবার উচিত সাহসিকতার সঙ্গে এ মানবিক সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসা।’

ডি-৮ দেশগুলোর সহযোগিতার ক্ষেত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৫তম বার্ষিকী উদযাপন করার সময়, আমি মনে করি, আমাদের আগামী দশকের জন্য কিছু নির্দিষ্ট মনোযোগের ক্ষেত্র তৈরি করা উচিত।’ এজন্য তিনি পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রথমত একটি সফল ডি-৮-এর জন্য পিটিএ (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি) বাস্তবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের বড় বাজার আছে, কিন্তু আমাদের সম্মিলিত বাজারও বিবেচনায় আনতে হবে। অন্তত ডি-৮ বাণিজ্য আমাদের ব্যবসার সম্ভাবনা এবং সুযোগ ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে। আগামী দশকে ১২৯ বিলিয়ন ডলার থেকে অন্তত ডি-৮ বাণিজ্য দ্বিগুণ করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দ্বিতীয়ত সদস্য দেশগুলোর বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জায়গা দিতে প্রস্তুত। আমরা যদি এখনই প্রক্রিয়া শুরু করি, তাহলে আগামী দশকের মধ্যে আমাদের একটি শক্তিশালী ডি-৮ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে।’

তৃতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আইসিটি এমন একটি ক্ষেত্র যার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ডি-৮ দেশের যুবকদের শক্তিশালী কর্মশক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ ৪০ বছরের নিচে এবং আমাদের সাড়ে ছয় লাখ নিবন্ধিত আইটি ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এ বিশাল জনশক্তিকে আমরা আইটিভিত্তিক শিল্প তৈরি করতে এবং তরুণদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে ব্যবহার করতে পারি। চতুর্থত খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীল খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডি-৮-এর বৈচিত্র্যময় কৃষি উৎপাদনে মনোনিবেশ করা উচিত। বাংলাদেশ তার সেরা অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতা অন্যান্য ডি-৮ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। আগামী দশকের মধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের কৃষি উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

পঞ্চম ও চূড়ান্ত প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডি-৮ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে শক্তির ব্যবহার এবং বিকল্প শক্তির উৎসগুলোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এমন অন্য দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করে সক্ষমতা বিকাশের ওপর দৃষ্টি দিতে হবে।’ করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব কাটাতে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, ডি-৮ মহাসচিব রাষ্ট্রদূত ইসিয়াকা আবদুল কাদির ইমাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, ডি-৮ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডি-৮ সিসিআই) সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত