সদ্য প্রয়াত দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিবের হাত ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে অসংখ্য সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়। নেপথ্যে থেকে অসংখ্য সাংবাদিক যেমন তৈরি করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নতুন ধরনের সাংবাদিকতায় তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
নিভৃতচারী অমিত হাবিব সব সময় আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। নিজেকে আলোচনায় রাখা পছন্দ ছিল না তার।
আড়ালে থাকা সাংবাদিক গড়ার এই কারিগর বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
তিন যুগে দেশ-বিদেশে ১০টি গণমাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা অমিত হাবিবের মৃত্যুতে সাবেক সহকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে গুরুস্থানীয় স্বজন হারানোর বেদনার প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জীবনকালে নিভৃতে থাকা দেশের এই প্রথিতযশা সাংবাদিককে নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন সকলে। প্রায় প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ স্মৃতি, শোক, মাতম ও হাহাকারের প্রকাশ করেছেন, আর এর মধ্যে একজন ‘অমিত দা’ প্রকাশিত হয়েছেন।
অমিত হাবিবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে, তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া তার সহকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের কিছু বাছাই করা পোস্ট তুলে ধরা হলো-
(ফেসবুক পোস্টের ভাষা ও বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে- অনলাইন ডেস্ক।)
সওগাত আলি সাগর
১.ভরা হাউজে একেবারে পিক আওয়ারে সবার সামনে চিৎকার করে সম্পাদক অফিস থেকে বের করে দিলেন। একজন সিনিয়র রিপোর্টার সম্পাদক অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই একগাদা অভিযোগ করেছিলেন। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে অফিস থেকে আমাকে বের করে দেন সম্পাদক।
২.মফস্বল থেকে আসা (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় আসাটা তো মফস্বল থেকেই আসা) অভিমানী তরুনের মন বুঝে উঠতে পারেনি, ঢাকা শহরে অভিমানের দাম নেই,চাকরীতে আরো নেই। ফলে সম্পাদকের বকা খেয়ে অফিস থেকে বের হয়ে গেলেও নিজের মতো করেই ফিরে আসতে হয়, প্রয়োজনে মাফটাফ চেয়ে চাকুরী রাখতে হয়। কিন্তু সেই বোধটা তখন মাথায় কাজ করেনি। ফলে টানা কয়েকদিন অফিসে যাওয়া হয়নি, অফিস থেকেও কেউ ডেকে পাঠায়নি, খোঁজও করেনি।
৩. হঠাৎ একজন ফোন করে- ’আপনি কোথায় এখন! এক্ষণি অফিসে আসেন!’- বলেই ফোন রেখে দেন। আমাকে কিছু বলার সুযোগই দেননি। তাঁর কথায় কী যেনো একটা ছিলো- আমি একটা রিক্সা চেপে বাংলা মোটরে ভোরের কাগজের অফিসে চলে যাই।
৪. চায়ের অর্ডার দিয়ে অফিসের একাট কোনায় মুখোমুখি বসেন তিনি। নরসিংদীর (রায়পুরার) চরাঞ্চলে টেটা নিয়ে বড় ধরনের মারামারি হয়েছে। তিনি আমাকে বললেন- সোজা চলে যাবেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসবেন। কয়েকটি অ্যাঙ্গেলও বলে দিলেন। তার সঙ্গে আলোচনার সময়ই সম্পাদক অফিসে ঢুকলেন এবং এক পলক তাকিয়ে উপর তলায় নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।
৫. ‘অফিসটা আপনার ফ্যামিলি না, কারোই ফ্যামিলি না। সাংবাদিকতা করতে আসছেন- সংবাদে মনোযোগ দেন। চর থেকে ফিরে আসার পর কথা বলবো।’- বলেই আমাকে বিদায় দেন তিনি। চরাঞ্চলের টেটাযুদ্ধের রিপোর্টটা ঘষামাজা করে কি তকতকে যে তিনি করে দিয়েছিলেন!
৬. অমিতদার চলে যাওয়ার খবর শোনার পর কেন যে বারবার এই কথাগুলো মনে পরলো! আচ্ছা, সেদিন যদি অমিত দা ফোন করে অফিসে ডেকে না আনতেন, আর কেউ কি আমাকে ডাকতো! ভোরের কাগজে আমার চাকুরীটা কী হতো! ভোরের কাগজের চাকুরী হারালে আমি কী সাংবাদিকতার প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পরতাম!
৭. অমিত দার প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা বুকের ভেতর সবসময়ই আমি লালন করেছি। কিন্তু কখনোই তাকে এ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তাঁর কাছে আসলে এসব কৃতজ্ঞতা ফৃতজ্ঞতার কোনো মূল্যই ছিলো না। এখন তো তিনি এসব কিছুরই উর্ধ্বে।
তবু বার বার মনে হচ্ছে- অমিত দা সেদিন ঠিক বলেননি। ’অফিস কারো ফ্যামিলি হয় না’ ঠিক, কিন্তু কোনো কোনো অফিসে অমিত হাবিবরা থাকেন, যারা আসলে ফ্যামিলির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যান।
মারুফ কামাল খান
অনুজপ্রতিম অমিত হাবিবের জন্য আমাকে এমন একপ্রস্ত শোকেরগাথা লিখতে হবে তা' কখনো কল্পনাতেও আসেনি। যদিও পরে এসে আগে চলে যাবার বেদনাবিধুর রেওয়াজ আছে এ জগতে। ঘটলো সেটাই। এই মাঝ রজনীতে অমিতের বিদায়-বিষাদের গাঢ় মেঘে ছেয়ে গেলো আমার হৃদয়াকাশ। আমি নিজেও এখন পীড়িত। আশা করেছিলাম, তারুণ্যছোঁয়া প্রাণোচ্ছল অমিত জীবনের দাবিতে দ্রুত বিপুল কর্মস্পৃহ হয়ে ফিরবেন। নিরাশ হ'লাম। আমার সঙ্গে সহকর্মের স্বল্পকালকে অমিত তার নিজের মেধার দ্যুতিতেই উজ্জ্বল স্মৃতিময় করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমার ঘোর দুষ্কালেও বিভিন্ন সময়ে অমিত নানান মাধ্যমে খবর নিতেন, সংযোগ রাখতেন এবং উদ্দীপনা যোগাবার চেষ্টা করতেন। অকাল প্রয়াত বুদ্ধিদীপ্ত আরেক অনুজপ্রতিম সাংবাদিক আহমেদ ফারুক হাসানের মতোই অমিত হাবিবের জন্যও আমার মন পুড়ছে, পুড়বে। অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকলে আমি অকালপ্রয়াত অমিতের জন্য বেদনাদীর্ণ হবো বারবার, অনেক দিন, অনেক বার।
পিনাকী রায়
দেশ রুপান্তরের সম্পাদক অমিত হাবিব চলে গেলেন।
আমার কর্ম জীবনের শুরু ভোরের কাগজে। তিনি নিউজ এডিটর ছিলেন ভোরের কাগজে। অমিতদার গল্প বলে শেষ করা যাবে না...
আর দেখা হবে না। ভালো থাকবেন ওপারে
জায়দুল আহসান পিন্টু
নব্বই দশকের শেষ দিকে ভোরের কাগজে তিনি বার্তা সম্পাদক আর আমি প্রধান প্রতিবেদক। সম্পাদক বেনজির ভাই চলে গেছেন বেশ ক বছর হলো, ফিচার সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক সুমন মাহমুদ আর জহিরুল আহসান টিপু ভাইও চলে গেছেন। অমিত হাবিবও চলে গেলেন। ভালো থাকবেন অমিত দা।
গাজী নাসিরুদ্দিন আহমেদ
অমিতদা ছিলেন পাঁড় ওয়েস্ট ইন্ডিজ সমর্থক। পাঁড় আর্জেন্টাইন সাপোর্টার। নিশ্ছিদ্র অসাম্প্রদায়িক। সম্পাদনার হাত অসাধারণ। দারুণ শিরোনাম লিখতেন। ঝরঝরে গতিময় গদ্য লিখতেন। অসম্ভব বাকপটু। মার্কসবাদ চর্চা না করলেও মার্কসবাদে বিশ্বাস ছিল তার। যদিও কলেজ জীবনে মুজিববাদী ছাত্রলীগ করতেন। সে কথা কাউকে বলতেন না। সংগীত অনুরাগী। রবীন্দ্র সংগীত ও লালনগীতির ভক্ত ছিলেন। যৌবনে কবিতা লিখতেন। কবিতার বইও বেরিয়েছিল। বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। আইনস্টাইনকে সবচেয়ে মেধাবী মানব মনে করতেন। ২৬ বছর ধরে প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমে কর্তৃত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। কোনো ধরনের অন্যায্য সুবিধা নিয়েছেন বলে জানি না। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আকালের দিনে এমন একজন সম্পাদকের অকাল প্রস্থান জাতির জন্য ক্ষতিকর। ব্যক্তি অমিত হাবিবের মৃত্যু আমার জন্য আপনজন হারানোর চেয়ে কম ক্ষতির নয়। বহু আনন্দ স্মৃতি অবিরাম ভাসছে যেন।
অপর একটি পোস্টে তিনি আরও লিখেছে, জীবিত অবস্থায় অমিত হাবিব প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পাননি। মৃত অমিত হাবিবকে গ্রহণ করায় প্রেসক্লাবের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
প্রভাষ আমিন
এক জীবনের স্মৃতি নিয়ে চলে গেলেন অমিতদা
অমিত হাবিব নামটার সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে। সাপ্তাহিক পূর্বাভাসে নিয়মিত লিখতেন, সেই সুবাদে। পূর্বাভাসের নয়াপল্টনের অফিসে দুয়েকবার দেখাও হয়েছে হয়তো। তবে অমিতদার বাহিনীতে আমার অন্তর্ভূক্তি ১৯৯৬ সালে, জনকণ্ঠ ছেড়ে যখন আমি ভোরের কাগজে যোগ দেই। ভোরের কাগজ অফিস যারা না দেখেছেন, তাদের বলে বোঝানো যাবে না, সেটা কেমন ছিল। আমার দুয়েকজন বন্ধু-বান্ধব এসে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, এই বাজার থেকে এমন চমৎকার পত্রিকা কীভাবে বের হয়! বাজার মানে বাজার। সারাক্ষণ চিৎকার, চেচামেচি, হৈচৈ, ঝগড়াঝাঁটি। অমিত হাবিব ছিলেন সেই বাজারের সর্দার মানে প্রাণভোমরা। কাগজে-কলমে অমিতদা ছিলেন বস, বাস্তবে বন্ধু। এমন বস পাওয়া সাত কপালের ভাগ্য। রাজনীতি, সাহিত্য, গান, খেলাধুলা- হেন কোনো বিষয় নেই; যা নিয়ে তিনি তর্ক করতে পছন্দ করতেন না। আসলে তর্ক করতে ভালোবাসতেন তিনি। হাসিনা-খালেদা, পেলে-ম্যারাডোনা, লারা-টেন্ডুলকার নিয়ে ধুন্ধুমার লেগে যেতো।
এই ঝগড়া নিয়েও মজার স্মৃতি আছে। সম্ভবত ৯৬ সালেই ভোরের কাগজ থেকে আমরা মাইক্রোবাস ভাড়া করে রাঙামাটি গিয়েছিলাম। সেই টিমে ছিলেন অমিতদা, অলকদা (সুকাস্ত গুপ্ত অলক), শুভ্রদা (উৎপল শুভ্র), রঞ্জনা আপা (শাহানা হুদা), রঞ্জনা আপার শিশু কন্যা অনসূয়া, পিন্টু (জায়েদুল আহসান)। সাথে আমি আর মুক্তি। আমরা তখন নতুন সংসার শুরু করেছি। কার্যত সেটাই ছিল আমাদের হানিমুন। তবে হানিমুনে গিয়ে আমাদের এক রুমে ছেলেরা, একরুমে মেয়েরা সিস্টেমে থাকতে হয়েছে। সেই ট্যুরে অমিতদা আর শুভ্রদার দিনে ১০ বার করে ঝগড়া হতো। ঝগড়া দেখে মুক্তি ভয় পেয়ে যেতো। আমি হাসতাম। ফেরার পথে শনির আখড়া থেকে বাংলা মোটর পর্যন্ত ননস্টপ সিরিয়াস ঝগড়া। এই জগতে নতুন মুক্তি ভেবেছে, এই দুজনের বুঝি এই জীবনে আর মুখ দেখাদেখি হবে না। আমি জানি, বিকেলেই গলাগলি, পরদিন আবার হোটেলে পাঁচ টাকার চায়ের বিল নিয়ে ৩০ মিনিট ঝগড়া হবে। এভাবেই অমিতদা জীবনকে উপভোগ করেছেন, নিংড়ে বাঁচতে চেয়েছেন।
ভোরের কাগজ থেকে আমি চলে গেলাম প্রথম আলোয়, অমিতদা যায়যায়দিনে। তারপর সমকাল, রেডিও বেইজিং, কালের কণ্ঠ হয়ে দেশ রূপান্তরের সম্পাদক। অনেকদিন দেখা ছিল না বটে, তবে অমিতদা ছিলেন হৃদয়ের খুব কাছে। দেশ রূপান্তরের কর্মীরা বলছিলেন, অমিতদা যতটা সম্পাদক ছিলেন, তারচেয়ে বেশি বন্ধু ছিলেন। আমি শুনি আর হাসি, ভোরের কাগজ পরিবারের চেয়ে আর কে বেশি জানে সেটা। সেই বস, সেই বন্ধু অমিত হাবিব এক জীবনের স্মৃতি নিয়ে মাত্র উনষাটেই স্মৃতি হয়ে গেলেন।
মধ্যরাতে অমিতদার চলে যাওয়ার খবর শুনে নিওরো সায়েন্স হাসপাতালে যাওয়ার পথে বাবর রোড থেকে তুলে নিলাম শুভ্রদাকে। কেউ কিচ্ছু বলিনি, ক্যামেরা দেখে তো শুভ্রদা পালালেন; তবু জানি সবার হৃদয়ে তোলপাড়, স্মৃতির পুকুরে উথালপাথাল। আল মারকাজুলে কে যেন বলছিলেন, ভোরের কাগজ পরিবার ভাঙছে। সঞ্জীবদা! (সঞ্জীব চৌধুরী) শুরু করেছেন; বেনজির ভাই, টিপু ভাই, সুমন ভাই, টুসি, তাজিনসহ অনেকেই চলে গেছেন। তবে অমিতদার বোহেমিয়ান একলা জীবন থেমে যাবে মাত্র উনষাটেই, ভাবতে বুক ভেঙ্গে যায়। কী এমন তাড়া ছিল অমিতদা?
* এই লেখা অমিতদার হাতে পড়লে কত কাটাকুটি করতেন, ঝাড়ি দিতেন, কিচ্ছু হয়নি। মুখে লেগে থাকতো হাসি। আহা অমিতদা।
মাহবুব মোর্শেদ
অমিত দা প্রায়ই বলতেন, ঢাকা শহরে আর থাকবো না। আর কিছুদিন পর এইসব চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে যাবো। গ্রামের বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেবো। তাজা শাকসবজি খাবো। মাঝে মাঝে ঢাকা আসবো আপনাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে।
আমি বলতাম, গ্রামে থাকতে পারবেন?
উনি বলতেন, আপনাদের মতো অতো পিছুটান আমার নেই।
আমি বলতাম, চিকিৎসার কী হবে?
তখন একটু চিন্তায় পড়ে যেতেন। তারপর বলতেন, আমার গ্রামে যাওয়ার বিরুদ্ধে আপনি যে যুক্তি দিচ্ছেন এতে আপনার স্বার্থ কী?
বছর দুই আগে ওনার মামা মারা গেল। মহেশপুর থেকে ঝিনাইদহ, ঝিনাইদহ থেকে যশোর নিতে নিতে অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মামার মৃত্যুর পর অমিতদা বলতেন, চিকিৎসা আসলেই একটা সমস্যা।
এরপর অমিতদার প্রথম স্ট্রোক হলো। সীমাহীন কষ্ট ভোগ করার পর আবার সুস্থ হয়ে উঠলেন।
খানিকটা সামলে ওঠার পর ওনার মা অসুস্থ হয়ে গেলেন। ঢাকায় নিয়ে এসে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করার পরও কিছু হলো না। মারা গেলেন।
এবার আবার স্ট্রোক হলো তার। অফিসে বসে কাজ করতে করতেই।
অমিতদার সঙ্গে মাঝে মাঝেই গ্রামের বাড়ি নিয়ে আলোচনা হতো। আমি ইন্টারনেট থেকে নানা রকম বাড়ির ডিজাইন তাকে দিতাম। করছি করবো বলে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলেন অমিতদা।
আমি ভাবতাম, এই যে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবার কথা বলেন তিনি, কিন্তু বাড়ি তো করছেন না। গিয়ে থাকবেন কোথায়?
আমি মাঝে মাঝে বলতাম, এসব হবে না, অমিতদা। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কেনেন।
তিনি বলতেন, সে চিন্তাও আমি করে রেখেছি। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে ভাইয়ের বাচ্চাদের এনে পড়াবো। আমার কাছে রাখবো। কিন্তু তাই বলে গ্রামের বাড়ির চিন্তা থেকে আপনি আমাকে সরাতে পারবেন না।
আমি ভাবতাম, একটা বাড়ি না করে তিনি গ্রামে গিয়ে থাকবেন কোথায়?
উত্তরটা আজ পেয়ে গেলাম।
আগামীকাল গ্রামে চলে যাচ্ছেন অমিতদা। গ্রামে ছোট্ট একটা বাড়ি হবে তার নির্জন কবরস্থানে। বিশুদ্ধ বাতাস বইবে তার কবরের ওপর দিয়ে।
গ্রামে গেলে তার খুব ঘুম হয়। শহরের মতো এত কষ্ট হয় না। ঘুমাতে ঘুমাতে রাত কাবার হয়ে যায় না। এবার দীর্ঘ ঘুম হবে।
সাব্বির খান
১.
গোধুলী বেলার এই শহরে আবার আসবেন, আমাকে কথা দিয়েছিলেন অমিত'দা। আমরা পাশাপাশি বসে নিরব সন্ধ্যা দেখবো, আকাশের তাঁরা দেখবো, বলেছিলেন আমায়।
অমিত হাবিব 'বিশালতায়' মুগ্ধ হতেন। আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকতেন বিশালের দিকে। মুচকি হেসে একদিন বলেছিলাম, পরের বার যখন আসবেন, 'বিশালতা' দেখাবো। যদি আবার দেখা হতো, তাহলে তাঁর দিকেই আঙ্গুল তুলে বলতাম- "ঐতো বিশাল, ওটাই বিশালতা, যে আমার সামনেই দাঁড়িয়ে"।
সুর্যাস্তের মতই চলে গেলেন আজ আপনি। অনেক কথা ছিলো অমিত'দা আপনার সাথে, অনেক অভিমান ছিলো। এপারে তার কিছুই বলা হলো না। ওপারে হয়ত হবে। ভাল থাকবেন। আপনার নিরব, অতৃপ্ত, অস্থির আত্মার কথা আমি জানতাম। তাঁর শান্তি কামনা করি।
২.
অমিত'দা ফিসফিস করে কিছু কথা বলতেন মাঝে মাঝে। চশমার কাঁচ ভেদ করে তখন চোখ দু'টোতে দেখা যেতো এক দৃঢ়তার ঝলকানি। একবার বলেছিলেন, "আমার বয়স যখন ৬০ হবে, আমি স্বেচ্ছায় অবসরে যাব। বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার কোন নজির নেই। আমি সেই নজির গড়বো সাব্বির"! অবসরে আমি বায়োনকুলার দিয়ে রাতের আকাশে দুরের গ্রহ আর তারা দেখবো।
আমি বলেছিলাম, ৬০তম জন্মদিনে আপনাকে একটা সেমি-প্রফেশনাল বায়োনকুলার উপহার দেব অমিত'দা। ওনার চোখে আমি শিশুসূলভ আনন্দের ঝলকানি দেখেছিলাম সেদিন।
উনি যে কখন এক বছর আগেই অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জানতে পারিনি। আগামী বছর ওনার বয়স ৬০ বছর হতো।
শান্তা মারিয়া
বেঁচে থাকতে থাকতে’ চলে গেলেন অমিতদা
খবরটি প্রথম শুনলাম খোকনভাইয়ের (Gazi Nasiruddin Ahmed) কাছে। সাংবাদিক অমিত হাবিব আর নেই। আজীবন সংবাদ নিয়ে কাজ করা মানুষটি আজ নিজেই সংবাদের শিরোনাম। অমিতদার সঙ্গে কর্মস্থল কখনও এক ছিল না। তার কাছ থেকে সাংবাদিকতার পাঠ নেয়ার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু দূরে থেকেও কোনো কোনো মানুষ খুব আপনজন হয়ে ওঠেন। অমিতদা তেমনি একজন। আলাপও অনেক বছরের। সেই ভোরের কাগজ যুগ থেকেই। যখনি দেখা হয়েছে আন্তরিক আড্ডায় সময় কেটেছে যা আজও স্মৃতিতে অক্ষয়।
অমিতদার বুদ্ধিদীপ্ত ক্যাজুয়াল আলাপগুলো ভালো লাগতো খুব। এমনও অনেকদিন হয়েছে যে কোনো কারণে দেশ রূপান্তর অফিসে গেছি, তিনি জরুরি মিটিং থেকে বেরিয়ে এসেও কথা বলেছেন। বড় পদে থেকেও ‘ভাব’ নেয়ার বিষযটি কোনদিন দেখিনি। ডাউন টু আর্থ বোধহয় একেই বলে।
এই তো এ বছরেও চায়না মিডিয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার পৌছে দিতে গিয়েছিলাম। ফোন করে বললাম ‘আসছি’। বললেন, ‘আধঘন্টার মধ্যে আসুন। বেরিয়ে যাচ্ছি।’ সেদিনও কিন্তু ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে তবে ফিরি। আমাকে সবসময় বলতেন ‘আপনি সব বিষয়ের একটা পজিটিভ দিক দেখতে জানেন’। মজা করতেন আমার সঙ্গে এ কথাটা নিয়ে।
অমিতদা ছিলেন ‘জাত সাংবাদিক’। কর্মরত অবস্থাতেই চলে গেলেন। চলে গেলেন ‘বেঁচে থাকতে থাকতে’। কজনের এমন সৌভাগ্য হয় বলুন। নিউজরুমে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে করতে চলে যাওয়া, বুড়ো হয়ে সকলের ভুলে যাওয়ার ভিতর দিয়ে নয়, ফসিল হয়ে নয়, প্রবলভাবে জীবন্ত থেকে চলে যাওয়া। অমিতদা দেখুন আমি এটাকেও পজিটিভলি দেখাতে পারছি। আপনি নিশ্চয়ই এখনি হাসবেন। বলেছিলাম,‘করোনার জন্য আটকে পড়েছি। যেতে পারলেই, চায়না থেকে স্পেশাল গ্রিন টি এনে দিবো বরাবরের মতো।’ কথাটা রক্ষা করতে পারলাম না। ক্ষমা করবেন।
ভালো থাকুন সাংবাদিক অমিত হাবিব। এদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে আপনি বেঁচে থাকবেন।
প্রনব সাহা
বিগ বস অমিতদা
সম্বোধনটা কোনোভাবেই আপনি থেকে তুই-তুমিতে নামাতে পারিনি,তবে বয়সে বড় হলেও বন্ধুত্ব আর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হইনি।
ভোরের কাগজের নিউজ রুমে অবশ্য ঝগড়াঝাটিই বেশি হয়েছে,আর তা থেকে শিখেছিই বেশি। অনেক রিপোর্ট দেখে দিয়েছেন,বকা দিয়েছেন।আবার রিপোর্ট সম্পাদনার পাশাপাশি শিখিয়েছেনও। প্রথম দৈনিক ভোরের কাগজে শিক্ষানবিশ থেকে শুরু করে সিনিয়র রিপোর্টার হতে যে কয়জনের কাছে কৃতজ্ঞ,তাঁদের মধ্যে একজন অমিত হাবিব। দুজনের প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদের অনেকদিন পর একবার কোলকাতায় আনন্দময় ক'টা দিন কেটেছিল অমিতদার সাথে। সেখানেই একটা শিক্ষনীয় ঘটনা ছিল। তারপর থেকে " বিগবস" ডাকা শুরু করলাম। মুচকি হাসিতে সাড়াও দিতেন। তাঁর সম্পাদনায় দেশ রূপান্তর ভালো করেছিল, কতদিন ফোনে বলেছেন, " প্রণব আবার আপনি,আমি আর বাহার কোলকাতা যাবো", পেশার ব্যস্ততা সময় দেয়নি ! হায় বিগবস যাওয়া হলোনা আরেকটি আনন্দ ভ্রমনে। কিন্ত অকাল যাত্রায় কেউ বাধা দিতে পারলো না ।
বরং আকস্মিক আমাদেরকে সকলের হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে অমিতদা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আমরা বার্তাকক্ষের একজন যোগ্য দক্ষ নেতাকে হারালাম,পেশাদার ও সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাতে গোনা সাংবাদিকের সংখ্যা একজন কমে গেলো।
শঙ্কর মৈত্র
আমাদের অমিত দা আর নেই। দেশ রূপান্তর পত্রিকার সম্পাদক অমিত হাবিব। আমাদের অমিত দা। এই মাত্র খবরটা শুনে মনটা বিষাদে ছেয়ে গেলো। স্ট্রোক করে হাসপাতালে চিকিৎসায় ছিলেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করেছি অমিতদাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু দাদাকে নিয়ে গেলেন অজানার দেশে। যেখান থেকে আর ফিরবেন না। ২০ বছর আগে আমি ভোরের কাগজে রিপোর্টার আর অমিতদা বার্তা সম্পাদক। অসাধারণ মেধাবী। অসাধারণ ছিলো অমিতদার নিউজ এডিটিং। হৈ, হুল্লোড়, আনন্দ উল্লাসে ভরপুর ছিলো ভোরের কাগজের পরিবেশ। আর অমিতদার তাড়া ছিল, নিউজ দেন নিউজ দেন বলে। আইন আদালতের রসহীন নিউজ হলো আমার। কিন্তু আইনের জটিলতা কাটিয়ে সহজভাবে নিউজ লেখার অনুপ্রেরণা যাদের কাছ থেকে শিখেছি অমিতদা তাদের একজন। নিউজের চমৎকার হেডিং দিতেন। আমার এখনো মনে আছে, জেল হত্যা নিয়ে সিআইডির একটি এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু দাদা যে হেডিং দিয়েছিলেন তা এখনো ভুলতে পারি নি। কতো স্মৃতি দাদার সঙ্গে। সর্বশেষ দেশ রূপান্তরের বর্ষপূর্তী অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীকে দাওয়াত দেয়ার জন্য আইনমন্ত্রণালয়ে আর রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানে ডিনারে দাদার সঙ্গে দেখা, অনেক গল্প। আমাকে আইন অঙ্গনের কয়েকটি বিষয় নিয়ে লেখা দিতে বলেছিলেন। দিবো দিবো করে দিতে পারি নি। আমাদের আপকামিং টেলিভিশনে কি কি করা যায় এমন পরামর্শ দিতেন। এখন অমিতদাই চলে গেলেন সব ছেড়ে। মায়ার বন্ধন ছেড়ে। দাদার আত্মার শান্তি কামনা করি। দেশ একজন মেধাবী সাংবাদিককে হারালো।
তারেক আলম
অমিত হাবিব - অমিত সম্ভাবনা নিয়ে তিনি কাজ করতেন। ভোরের কাগজে তাঁর সাথে কাজ করেছি।পরে যায়যায়দিনে কাজ করা হয়ে ওঠেনি তবে কালের কন্ঠে আবারও ছিলাম একসাথে। তাঁর চোখেমুখে সবসময় নতুন নতুন পরিকল্পনার ছায়া দেখেছি। কিন্তু ছিলেন নিভৃতচারী। দেশরুপান্তরে তাঁর ঝলক আমরা দেখছি।
অমিতদা সকল সম্ভাবনাকে চাপা দিয়ে চলে গেলেন অনন্তলোকে। আল্লাহর কাছে ভালো থাকুন।
আতিকুর রহমান খান পূর্ণিয়া
বিদায় অমিত দা। অমিত হাবিব ভাইকে দাদা বলতাম। ২০০৫ এ দৈনিক যায়যায়দিন এ বার্তা সম্পাদক হিসাবে অভিভাবক ছিলেন। আরও অনেক দূর যার যাওয়ার কথা ছিলো।
শফিক রেহমানের এক হঠকারি সিদ্ধান্তে যায়যায়দিন বন্ধের পর তার প্রতিবাদি ভূমিকা আমাদের নাড়া দিয়েছিলো।
তাঁর আত্মা শান্তি পাক।
