দেশের ব্যাংকগুলোতে রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরা ও অস্ত্রধারী প্রহরী সবই থাকে ব্যাংকে। গ্রাহকরা অনেকটা নিশ্চিন্তেই ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন। কিন্তু সেই ব্যাংকের ভেতরেই গ্রাহক সেজে ঘাপটি মেরে থাকছে ডাকাতরা। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা কারা তুলছে সেই তথ্য জানিয়ে দিচ্ছে বাইরে ওতপেতে থাকা দলের অন্য সদস্যদের।
ওই গ্রাহক টাকা নিয়ে ব্যাংক থেকে বের হলেই পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) জ্যাকেটের মতো জ্যাকেট পরে থাকা ওই সদস্যরা গাড়িতে তুলে নেয়। টাকা, ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী কেড়ে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে নির্জন কোনো স্থানে ফেলে যায়। রাজধানীসহ সারা দেশেই রয়েছে এমন কিছু ডাকাত দলের দাপট। একটি ডাকাত দলের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর ডিবির কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার চক্রের অন্যতম হোতা কুমিল্লার মুরাদনগর থানার কাজীয়াতল গ্রামের মৃত খালেকের ছেলে ফরিদ উদ্দিন। তার নেতৃত্বে অন্তত ১০ জনের একটি ডাকাত দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা দেশে। তারা ডিবির নকল জ্যাকেট, আসামির হাতকড়া, খেলনা পিস্তল ও পুলিশের স্টিকার লাগানো মাইক্রোবাস ব্যবহার করে ডাকাতি করে।
ফরিদ ছাড়া ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই দলের অন্য সদস্যরা হলো মো. পারভেজ, সাইফুল ইসলাম ওরফে নাদিম, শফিকুল ইসলাম ওরফে বাবলু, মো. জসিম ও নাসির। তাদের সবাইকে গতকাল রবিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবির মতিঝিল বিভাগ।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চক্রটি ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ডিবির নকল জ্যাকেট কিনে মাসুদ নামে শরীয়তপুরের এক ব্যক্তির কাছ থেকে। একটি জ্যাকেট তারা ২ হাজার টাকা দিয়ে কেনে। এছাড়া ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত আসল হাতকড়া কিনছে কাশিমপুর কারাগারের মিয়াসাব কহিনুরের কাছ থেকে। এছাড়া ডিবির ব্যবহৃত ফোল্ডিং লাঠি রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকার মার্কেট থেকে কেনে চক্রটি।
ডিবির দাবি, এই ডাকাত দলের প্রধান ফরিদ উদ্দিন ছিল অন্য আরেক ডাকাত দলের সদস্য। তার বিরুদ্ধে ঢাকা, মাদারীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় অন্তত সাতটি ডাকাতির মামলা রয়েছে। ডাকাতির এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে জেল খেটে মাস ছয়েক আগে জামিনে ছাড়া পায় ফরিদ। এরপরই সে নিজেই একটি ডাকাত দল গড়ে তোলে। ডিবির ওসি পরিচয় দিয়ে ডিবির জ্যাকেট পরে হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে ও কথিত পিস্তল (খেলনা পিস্তল) হোলস্টারে রেখে ডাকাতির নেতৃত্ব দেয় সে।
চক্রের আরেক সদস্য পারভেজ নিজেকে ডিবির দারোগা পরিচয় দেয়। গাড়ি চালায় নাদিম। ব্যাংকে ঢুকে টার্গেট করা ব্যক্তির পোশাকসহ অন্যান্য তথ্য বাইরে অপেক্ষমাণ ডাকাত দলের অন্যদের জানিয়ে দেয় বাবলু। জসিম ও নাসির কনস্টেবল পরিচয় দেয়। অন্যরা থাকে সাধারণ পোশাকে। বোকা ধরনের ও বয়স্ক ব্যক্তি ও নারীদের টার্গেট করে তারা।
চক্রটি সর্বশেষ ডাকাতি করে কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায়। গত ২১ জুলাই দুপুরে চান্দিনা ইসলামী ব্যাংকের শাখা থেকে আড়ায় লাখ টাকা তুলে বের হন মো. আনিস নামে এক ব্যবসায়ী। ডাকাতরা ব্যাংকের সামনে থেকেই তাকে প্রকাশ্যে টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তোলে। ডিবির পোশাক পরা থাকায় এবং গাড়িতে ডিবির স্টিকার থাকায় আশপাশের লোকজন কেউ এগিয়ে আসেনি। চক্রটি আনিসের কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে কয়েক মাইল দূরে নির্জন স্থানে ফেলে চলে যায়।
এছাড়াও চক্রটি নরসিংদীর বাবুবাজার কাপড়ের বাজারের আশপাশে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে একাধিকবার ডাকাতি করেছে বলে ডিবি নিশ্চিত হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিবির এক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিবির নকল জ্যাকেট পরে ভুয়া ডিবি সদস্যরা নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। তাদের খোঁজে নেমে এক ডাকাত দলের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা শুধু ব্যাংকের গ্রাহকদের টার্গেট করে ডাকাতি করে।’ তিনি জানান, ব্যাংকের বাইরে থেকে টার্গেট ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলার সময় আশপাশের কেউ প্রশ্ন করলে তারা বলে মামলা থাকায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
