বন্দর কর্তৃপক্ষ চায় অনুদানসরকার চায় সুদ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ১১:০৮ পিএম

২০১১ সালে খুলনা সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পশুর চ্যানেলের গভীরতা ধরে রাখার জন্য ড্রেজিংয়ের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সাড়া দেশের নৌপথ খননের বিষয়টি ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। ১১ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। পশুর চ্যানেলের গভীরতা ধরে রাখতে ড্রেজিংয়ে ব্যয় হবে ১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। আর এ অর্থ অনুদান হিসেবে চেয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে সরকার অনুদান নয়, ড্রেজিংয়ের জন্য ঋণ দিতে চায়। যদিও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নেই বলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রেজিংয়ে ১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে, যার সুদহার হবে ৫ শতাংশ। ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিজেদের আয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি সরকারকে ভ্যাট অন্যান্য ট্যাক্স বাবদ বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। পরিচালন ব্যয়, কর্মচারীদের আনুতোষিক ও ভবিষ্যৎ তহবিলে জমার পর উদ্বৃত্ত থাকে ৫০ কোটি টাকারও কম। উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে ভৌতকাজ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এমতাবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্তানুযায়ী পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছর মেয়াদে প্রকল্পের ঋণের টাকা ফেরত দেওয়া দুরূহ হয়ে যাবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত প্রকল্পে অর্থায়ন ও দায় ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছর মেয়াদে পরিশোধ করতে হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে অর্থ বিভাগের সঙ্গে ঋণ চুক্তি করতে হবে। চুক্তির সঙ্গে ক্ষতিপূরণ প্রদান পদ্ধতি বা নীতিমালা যুক্ত হবে। প্রকল্প দলিলে প্রতি অর্থবছরের জন্য প্রযোজ্য কিস্তি অনুসরণে বার্ষিক ক্রয় ও ব্যয় পরিকল্পনা করতে যুক্ত হবে। এছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে মোংলা বন্দর ডক লেবার ম্যানেজমেন্ট (বিলুপ্ত) প্রকল্পের ১ হাজার ৭৫৮ কর্মচারীর জন্য আর্থিক সুবিধা সম্পর্কিত পূর্ববর্তী ঋণের দায়বদ্ধতার ২২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বকেয়া নিষ্পত্তি করতে হবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা অর্থ বিভাগকে জানিয়েছেন, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বন্দরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আউটার বার এবং ইনার এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীরতা ধরে রাখার জন্য ড্রেজিং করা অপরিহার্য। ড্রেজিং না করলে বন্দর চ্যানেল নাব্য সংকটে পড়বে। একসময় কম ড্রাফটের জাহাজও মোংলা বন্দরে আনা সম্ভব হবে না। বন্দরের রাজস্ব আয় কমে গেলে জনবলের বেতনভাতা, পেনশন পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেগুলো অব্যবহৃত থাকবে। বর্তমানে মোংলা বন্দর বছরে ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। বন্দরের মাধ্যমে শুল্ক বিভাগের আয় ৩-৪ হাজার কোটি টাকা। শুল্ক বিভাগের আয়ের জন্য বন্দরের কোনো অবকাঠামো ব্যবহার করতে হয় না। এছাড়াও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহন, মোংলা ইপিজেড এবং ই-জোনের আমদানি-রপ্তানি পরিবহন, সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ক্লিংকার ও জিপসাম আমদানি, অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি, এলপিজি প্ল্যান্টের গ্যাস আমদানি পরিবহন ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঁচামাল আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হবে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তাহমিদ হাসনাত খান বলেন, ‘যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অনুদান বা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার সাধারণত তার সংস্থাগুলোর আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে। এসব দিক বিবেচনা করে মোংলা বন্দরের চ্যানেল ড্রেজিং প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান গত ১৭ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলেছেন, প্রকল্পটি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় লিখেছে, বর্তমান সরকার ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিং করার অঙ্গীকার করেছে। যাতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দেশের নৌপথগুলোর সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি সুগম হয়। এর আগে ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনা সফরকালে পশুর নদী ড্রেজিং করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এমতাবস্থায় মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ব্যয়ের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা সরকারি অনুদান প্রদানের নির্দেশনা চেয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। বাকি ১০৫ কোটি টাকা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করবে। চলতি বছর ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যাতায়াতের সময় কমে আসায় রাজধানীর কাছাকাছি চলে এসেছে মোংলা বন্দর। ফলে রপ্তানিকারকরা এখন বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত