(চতুর্থ কিস্তির পর)
৫. উপজেলা থেকে জেলা জজের সঙ্গে আলাপ! সে ছিল তখন বিশাল হ্যাপা। মোবাইল ফোন নামার কথাই ওঠেনি, দূর আলাপের মাধ্যম তখন ছিল শুধু তারযোগে গ্রাহাম বেলের টেলিফোনখানি। সেটাতে অনুমতি নেওয়া সৌজন্যে যায় কি না তা বাজিয়ে দেখারও উপায় ছিল না! জেলা জজের থাকলেও টেলিফোন ছিল না সহকারী জজের। ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’-এর অনুমতি চেয়ে ছুটি নিয়ে আসতে হতো উপজেলা থেকে। সাত দিন আগে দরখাস্ত লিখে স্পেশাল মেসেঞ্জার দিয়ে পাঠাতে হতো। ছুটিসহ অনুমতিপত্র পেয়ে (না পাওয়া হতো না সাধারণত) তবেই মিলত সাক্ষাৎ নির্ধারিত দিনে। দরখাস্ত করে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ মাসে-বছরে কতবার! ছুটি না নিয়ে হুজুরের সামনে তো নয়ই পাশে পড়লেও সাক্ষাৎ বিপদ! ‘ঘোড়ার পেছনে আর বসের সামনে না যাওয়াই ভালো’ বলে সাবধানী বিদ্যা দিয়েছিলেন শিক্ষানবিসিকালেই, ছিলাম যার সহবতে সেই সদর সিনিয়র সহকারী জজ। জেলা জজ হুজুরের আগে-পিছে-চারিপাশে যে তার গুপ্তচরদেরও নজর থাকে এবং তাতে আশপাশ এমনকি পেছনটাও চলে আসে হুজুরের সামনেই! এই গূঢ়বিদ্যাটা গুরু রেখে দিয়েছিলেন নিজেরই ভাণ্ডে সযতনে! গুরু-মারা বিদ্যা দান করেননি হুঁশিয়ার গুরু (তারও তো জেলা জজ হওয়ার দিন আসবে)! সাক্ষাৎ বিপদে পড়েছিলাম তাইতে।
রেওয়াজমাফিক জেলা জজের সঙ্গে পহেলা ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ সেরে গেছি চিলমারী উপজেলা কোর্টে যোগ দেওয়ার পরপরই কুড়িগ্রাম সদরে গিয়ে। চিলমারী কোর্টে কাজ থাকে না দুপুরের পরে (আগেও থাকে না, বলেছি আগে)। উপজেলা পরিষদ চত্বরটুকুর ভেতরে কোর্ট আর কোয়ার্টার বেকার করে করে (এর বাইরে যাওয়ার স্থান-বাহন ছিল না কোনোটাই) হাঁপিয়ে উঠেছি একেবারে (তখনো ধাতস্থ হয়নি বলে)। ভাবলাম, দম ফেলে আসি কুড়িগ্রাম জজ কোর্টে সাব-জজ (তখন একজনই মোটে, যুগ্ম জেলা জজ নামকরণের কথা ওঠেনি তখনো) ভাইয়ের খাসকামরাতে। আমার রাজশাহীর মানুষ তিনি সদালাপী। মামলা-মোকদ্দমার জরুরি কিছু আলাপও (জজদের আলাপে মামলা-মোকদ্দমা উঠবেই!) সারা যাবে, ফাঁকে সদরটাও ঘুরে দেখা হবে। দিনের কাজ সবটা সেরে দুপুরের খাওয়ার পাটও চুকিয়ে ‘এটিইও’ (সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার) সাহেবের ৭০ সিসি মোটরসাইকেলের পেছনে ওঠে (তাকে নেওয়া মূলত সদর ঘোরার গাইড হিসেবে) ঘণ্টাখানেকের আগেই নামলাম গিয়ে ভাইয়ের খাসকামরায়। আলাপ সেরে ঘুরব’খন পরে। আলাপের শুরুটা কেবল হয়েছে, মাঝখানে জেলা জজের আর্দালি এসে খাড়া! জেলা জজ সালাম লাগিয়েছেন। একতলা পুরাতন ভবনে (বহুতল নতুন ভবন তখনো হয়ে ওঠেনি) সাব-জজের এজলাস-খাসকামরার পাশেই জেলা জজের এজলাস-খাসকামরা। ভুলেও তো উঁকি দিইনি জেলা জজের খাসটাতে! কোনটা কার জানি তা আগে থেকেই। ধন্যি বাবা ত্বরিতকর্মা গুপ্তচর! আসতে না আসতে আমার খবর লাগিয়ে দিলে! আলাপ ফেলে ঢুকলাম গিয়ে জেলা জজের খাসকামরায়।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন : ছুটি নিয়েছো আজকে?
ওরে বাবা! এ যে প্রথমেই তলায় হাত! ছেড়ে দেন হুজুর, কেটে পড়ি! ভুল করে স্যার মামলা-মোকদ্দমার আলাপ করতে এসেছিলাম জজ কোর্টে, উপজেলা কোর্টের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে! না হলে কি আর ছুটি না নিয়ে আসি এ-তল্লাটে!
বললেন : কাজ সেরে এসেছো মানে? শুনানির প্রার্থনা নিয়ে বিচারপ্রার্থীর আসার অপেক্ষায় তোমার খাসকামরায় বসে থাকার কাজটা কোথায় যাবে? বিনা ছুটিতে তো নয়ই, বিনা অনুমতিতেও কর্মস্থল ত্যাগ চলে না চাকরিতে। বিভাগীয় শাস্তিতে পড়বে। ‘অফিস ডে’-তে উপজেলা থেকে জজ কোর্টে মামলা-মোকদ্দমার আলাপ নিয়ে আসতে গেলেও কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতিসহ ছুটি নিয়ে আসতে হবে। ছুটি নিলে যে দিন-পাওয়া বিচারপ্রার্থীরাই সাক্ষী নিয়ে এসে ঘুরে যাবে সেদিনটাতে! সে-কথা হুজুরের মুখের ওপর ‘বুললেই তো বুলবেন যে বুলছে!’ নিয়মের নির্দোষ বিচ্যুতিরও প্রশ্রয় নেই হুজুরের কাছে! একটুও লাই না দিয়ে পুরো সেন্স দিয়ে ছেড়ে দিলেন। আর পড়িনি সেই হুজুরের সাক্ষাতে কি পার্শ্বে। তার বদলির পরে এলেন নতুন জন। এই হুজুরের ‘সৌজন্য সাক্ষাতে’ গেছি বার দু-তিনেক। আর কি ভুল করি কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতিসহ ছুটি নিতে! সাক্ষাতের টাইম দিতেন সকাল দশটা লিখে। আগের জন, পরের জনও এই টাইমই দিতেন। এ ছাড়া সকালে আর সাক্ষাতের টাইম নাই কোনো জজের। সাড়ে দশটা থেকে বিকেল চারটা টাইম তার বাঁধা এজলাসের ওঠানামায়। এর আগে-পরে আধা ঘণ্টা করে যে টাইম থাকে সেটুকুই জজের ‘অন্যান্য কাজ’-এর মধ্যে টেনে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’, বড়-ছোট মিটিং-সিটিং সবই সারবারও টাইম। নির্ধারিত দিনে জেলা জজের খাসকামরায় হাজির হতাম ঠিক দশটাতেই। তিনি বসে থাকেন তার আগে এসে। আমার অপেক্ষায় নয়! নিজের কাজে। কাজের মধ্যেই তার শোনা-বলা চলতে থাকে। ‘প্রশাসনিক কাজ’-এর টাইমও তার এই আধা ঘণ্টা! খোশগল্পের সময় নাই মোটে। খোশামুদি চলে যদি সেটাও এ-টাইমেই! প্রত্যেকবারই দেখি, আলাপের মাঝখানে তিনি টুক করে দেয়ালঘড়ি দেখে কথা শেষ না করেই তড়াক করে উঠে পড়েন চেয়ার থেকে ঠিক দশটা উনত্রিশে! সৌজন্য নাই আর। উঠেই সোজা বলে ওঠেন :
যান, উঠব এজলাসে। ততক্ষণে আর্দালি লেগে পড়েছে হুজুরের গায়ে কোট-গাউন চড়াতে। সে বেটাছেলে থাকে যেন তক্কে তক্কে খাসকামরা আর এজলাসের মধ্যখানের দরজার আড়ালটাতে! হুজুরের তড়াক করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নেমে আসে খাসকামরায়! কলিং বেল চাপাও লাগে না হুজুরের। জেলা জজের ওঠাটা তো দেখি কুড়িগ্রামেও ঠিকই চলে ধরাবাঁধা টাইমেই। উপজেলা কোর্টের বেলায় লেট কেন তবে? মনে পড়ে জুনিয়রগিরিকালের কথা। রাজশাহীতে ‘লেবার কোর্ট’ (১৯৮৬ সালে তখন এ-নামই ছিল ইংরেজি আইনে, ২০০৬ সালের বাংলা আইনে নাম হয়েছে ‘শ্রম আদালত’) ছিল জজ কোর্ট চত্বরের বাইরে রিকশার দূরত্বে ভাড়াবাড়িতে। সিনিয়র আমার তখন ছিলেন ‘জিপি’ (সরকারি কৌঁসলি)। রেলশ্রমিকদের মামলায় লেবার কোর্টে রেলের পক্ষে লড়ার দায়িত্ব ছিল তার। যেতেন না প্রায়ই জজ কোর্ট ছেড়ে সে-কোর্টে। প্রথমদিকে টাইম পিটিশন, পরে মামলাই ছাড়তে থাকেন আমার হাতে। পসারওয়ালা সিনিয়রদের কাউকেই তেমন দেখিনি যেতে। সে-কোর্টেও একজন জেলা জজ থাকেন চেয়ারম্যানের চেয়ারে। তবে, কোর্ট পুরা হয় না তার একাতে। আরও সদস্য লাগে মালিক পক্ষের একজন, শ্রমিক পক্ষের আরেকজন। বেলা গড়িয়ে এগারোটা পার হয়ে যায়, কোর্ট ওঠে না এজলাসে! সদস্য এসে পৌঁছাননি কোর্টে। আসবেন কি না তাও জানে না কেউ। মোবাইল ফোন নামেনি তখন, নগদ খবর নেওয়ার উপায় নেই বাসা থেকে (গরম ভাত খেয়ে নাকি না খেয়ে!) বেরিয়ে আছেন তিনি কোন পথে! এমন অনিশ্চিতে জজ কোর্টের প্র্যাকটিস মার দিয়ে নিশ্চিন্তে সময় নষ্ট করার সময় থাকে কি পাকা সিনিয়রের হাতে! আধপাকা আর আনাড়ি জুনিয়রে কাজ চালায় লেবার কোর্টে।
উপজেলায় কোর্ট নামানো মানতেই পারেননি সিনিয়ররা প্রথম দিকে। ছিলেন বয়কটে। স্থান শূন্য থাকে না কারও অভাবে। প্রকৃতি পূরণ করে ফেলে, দরকার হলে আগাছা দিয়ে! পাকা হওয়ার অপেক্ষা না করে আধপাকা জুনিয়ররা পুরোদমে নেমে পড়লেন ফাঁকা উপজেলা কোর্টে। রাস্তা-ঘাট হয়ে ওঠেনি, যাওয়া-আসায় সময় লাগে, বেরোতেও হয় সদরের বাড়ি থেকে গরম ভাত খেয়ে! অজুহাতের অন্ত নেই। বিলম্ব প্রতিদিনই কোর্টে পৌঁছাতে। নিয়মের শৃঙ্খলাকে অলংকারভাবে প্রবীণে, সামলে চলে যেন কভু না ভাঙে! তরুণের কাছে তা শক্ত শেকল ঠেকে, প্রবল উৎসাহ তার নিয়ম ভাঙাতেই! বাহাদুরি তার সেকাজেই! উপজেলায় উকিলের মোহরার, কোর্টের কর্মচারী, সহকারী জজ প্রবীণ নাই কেউ। প্রবীণের সহবতে থেকে নিয়মনিষ্ঠতা, কায়দা-কানুন রপ্ত করার প্রশিক্ষণ কেউ-বা পায়ইনি, কেউ পেলেও সেরেছে আধখেঁচড়া করে। আনাড়ি তরুণ প্রায় সবাই। ভাঙতে ভাঙতে নিয়মকানুন, কাজের মান, আদালতি আদবকেতা সব নেমেছে লেবার কোর্টেরও নিচে। মক্কেল, সাক্ষী আগেকার দিনে উকিলের কাছে হাজির হতো মামলার আগের দিন সন্ধ্যাতেই, দিনের দিনে আসতে গেলে দিন চলে যেত বলে। বাড়ির কাছে উপজেলায় কোর্ট নামাতে দিনের দিনে গেলেই চলে! বাড়ি থেকে গরম ভাত খেয়ে বেরোনোর আগে মাঠের কাজ, বাজারের কাজ সেরেও আসা লাগে! বেলা এগারোটার আগে আসা যায় কী করে!
উপজেলা কোর্ট ১৯৯১-৯২ সালে শুধু উঠিয়েই আনা হলো সদরে, ভাঙাগুলো সারবে কি ভাঙন ছড়াল সদরেও! জেলা জজ, সাব-জজ সব কোর্ট ঘুরে উকিল সাহেব উপজেলা কোর্টে আসে শেষে। ওঠার টাইম আটকে থাকে বেলা এগারোটার কাছেই। মক্কেল, সাক্ষী অনেক সময় আসে তারও পরে! তত দিনে রাস্তা-ঘাট হয়ে ওঠায় দিনের দিনে সদরে আসারও সুবিধা হয়ে গেছে। ১৯৯৪-এর শেষদিকে প্রথম পেলাম সদর কোর্ট। দেখি এখানেও ধরেছে উপজেলা কোর্টের রোগে। উপজেলা কোর্টের উকিল-মোহরার, জজ-পেশকার সিনিয়র হয়ে বসেছে সবাই দশটা বছরে! নিয়মনিষ্ঠ আগের সিনিয়ররা অনিয়মিত তখন বয়সের ভারে। নতুন আসারা শেখে নতুন সিনিয়রদের থেকে! দেওয়ানি-ফৌজদারি সবই করে সবাই! জেলা জজে সবারই জামিন শুনানি, আপিলে স্থগিতাদেশ নেওয়ার থাকে আগে! অতিরিক্ত জেলা জজ, সাব-জজেও সেসবের কিছু তো আছে! একে একে সারতে সারতে সহকারী জজের খালি সিভিলে আসে শেষে। ভাগীদারদের আবদারি বন্দোবস্তে একেক কোর্টের ওঠা উঠল একেক টাইমে। সাড়ে দশটায় ওঠার ধরাবাঁধা টাইম টিকে থাকল শুধু এক জেলা জজেরই কোর্টে। গোল বাধল সেখানটাতেও, যখন ওঠার টাইম টেনে নামানো হলো সাড়ে নটাতে। হাইকোর্টের সার্কুলারে বাঁধা সেই টাইমে উঠতে চেয়ে এক জেলা জজ আর উঠতেই পারেননি তার কোর্টে এক জেলাতে! (চলবে)
লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
