‘বক্তা’ চায় না বিএনপি

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০৩:১৩ এএম

রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা থেকে শুরু করে মধ্যম সারির নেতা সবাই নানা হুমকি দেন। সরকারের বিরুদ্ধেই হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। অথচ কর্মসূচি শুরু হলে হুমকিদাতা নেতাদের রাজপথে পাওয়া যায় না। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মোবাইল ফোনেও তাদের পান না। একাধিকবার ফোন করলেও এসব নেতা ফোন ধরেন না।

সরকারবিরোধী গত দুটি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলেন, কেউ কেউ আন্দোলনের অর্থ নিয়ে কক্সবাজার বা অন্য কোথাও গিয়ে পালিয়ে থাকেন। আন্দোলনের আগে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের পুনর্গঠনের নামে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আয়েশে দিন কাটান। আন্দোলনের সময় তাদের পাওয়া যায় না।

বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, দলের কেউ কেউ এমনটা করলেও কেউ কেউ রাজপথে থাকেন। সমস্যা হচ্ছে, ‘সরকার তো আমাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে না। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। মিথ্যা মামলায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। আদালতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায় নেতাকর্মীরা জামিন পান না।’   

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে রাজপথে নামার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। আন্দোলন-সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির নেতারা বলেন, ‘সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করা, দলের নেতাকর্মীদের নামে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে আইনিভাবে মোকাবিলা করা, আন্দোলনে সরকার যাতে স্যাবোটেজ করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা, নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা যারা কথা বলে বেশি তারাই থাকে না

প্রভৃতি।’ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার কাজ চালিয়ে যাবে দলটি। গত দুটি আন্দোলনে সফলতা না আসার কারণ পর্যালোচনা করে, সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে সচেষ্ট হবে তারা। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত দুটি আন্দোলনে আমরা ব্যর্থ হইনি। সরকার হিংসাত্মকভাবে আমাদের আন্দোলন দমন করার পরও সারা দেশে নেতাকর্মীরা রাজপথে ছিলেন। আগামী দিনের আন্দোলনেও রাজপথে থাকবেন তারা। তবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ। বিএনপি রাজপথে নামলে আমাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীকে ব্যবহার করে সরকার। নানা অপকর্ম করে সেসবের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেয়।’

ফখরুল বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অস্ত্র থাকে। আমরা রাজপথে নামলে তারা সেগুলো ব্যবহার করে। গত রবিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিনা উসকানিতে নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। এতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আব্দুর রহিম নিহত হয়েছেন। অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এসব অস্ত্রের মোকাবিলা করতে হলে তো আমাদের কামান নিয়ে নামতে হবে। তখন দেশের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে! বাংলাদেশ আফগানিস্তানে পরিণত হবে। আমরা দেশকে আফগানিস্তান বানাতে চাই না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন।’

বিএনপি নেতারা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রান্তিকাল পার করছে দল। ওয়ান-ইলেভেনে দলটির রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত। দিন যত যাচ্ছে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নানাবিধ চাপ সত্ত্বেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থেকে কর্মসূচি পালন করছেন। তারা বলেন, আগের দুটি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন সতর্ক। দুটি আন্দোলনে যে ত্রুটি ছিল তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। আগামী আন্দোলনে বিগত দিনের ত্রুটি সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন তারা।

গত দুটি আন্দোলন সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুটি আন্দোলনে নেতাকর্মীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে নেতাকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছিল, তাকে তার সংগঠনের নেতাকর্মীরা খুঁজে পাননি। যাদের আন্দোলনে থাকার কথা, তাদের কেউ কেউ ভারতে চলে গিয়েছিলেন। ফোন করলে তারা বলতেন, রাজপথে আছি। কেউ আবার কক্সবাজার বা অন্য জায়গায় আমোদ-ফুর্তি করে কাটিয়েছেন। স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আন্দোলন শুরু হলে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আন্দোলনের সময়ে তিনি আর সুস্থ হন না। আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায়। কেউ গ্রেপ্তার হলেই সব আত্মগোপনে চলে যান। নেতাদের আর রাজপথে দেখা যায় না।’ 

তিনি বলেন, ‘সভা-সমাবেশে পটকার বিস্ফোরণ হলে বা পুলিশ ধাওয়া দিলে মুহূর্তে সভাস্থল ফাঁকা হয়ে যায়। কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগে নেতারা সমাবেশে বলেন, ‘পুলিশের কত গুলি আছে আমরা দেখব।’ কিন্তু কর্মসূচি যখন শুরু হয়, তখন তাদের রাজপথে পাওয়া যায় না। সাংবাদিক, পুলিশ কেউ তাদের খুঁজে পায় না।’

বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন রাজনীতি করছে। এ নিয়ে দলের কিছু নেতার আপত্তি আছে। কারণ এই নেতারা মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের মূল্যায়ন হবে না। তাই তারা চান না বিএনপি আন্দোলনে সফল হোক। এটা বিএনপির জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।’

বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সরকারকে বাধ্য করাই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য গড়তে যাচ্ছি। এই ঐক্যের প্রধান কাজ হবে দুটি। সরকারের পতনের পর নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রকে মেরামত করা। যেসব দল নিয়ে ঐক্য হবে তাদের নিয়েই আন্দোলন হবে, নির্বাচন করা হবে এবং সরকার গঠন করা হবে।’

এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলো পৃথক তিনটি জোটে ছিল। এরশাদের পতনের যে সরকার হবে তারা কীভাবে কাজ করবে সে জন্য তিন জোটের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। ১৯৯১-এ বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে রূপরেখা মানেনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে ক্ষোভ আছে। জনগণ এখন কোনো রাজনৈতিক দলকে বিশ^াস করে না। এ অবস্থায় জনগণকে আস্থায় আনার জন্য সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কী করবে? এ বিষয়ে স্বপন বলেন, ‘আমাদের লিখিত কর্মসূচি থাকবে। তার আলোকে জনগণকে সচেতন করা হবে। আমাদের কথায় ও কাজে মিল পাবে তারা। কথা না শুনলে তো পরে আমাদের আবার নির্বাচন করতে হবে।’ 

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহত্তর ঐক্যের পথে এ দলটি একটি বাধা। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকলে জোটে অন্য রাজনৈতিক দল আসতে চাইবে না। আবার জামায়াতকে ছেড়ে দিলে সরকার তাদের কাছে টেনে নিতে পারে। এর নজিরও আছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। জামায়াতকে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে আওয়ামী লীগ। এ মুহূর্তে জামায়াতকে নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছিল। এখন আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তাদের নিয়ে আন্দোলন করলে সমস্যা হবে কেন?’ 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক নয়। সামরিক সরকারও তারা নয়; বরং তারা কর্তৃত্ববাদী সরকার। এখন জবাবদিহি নেই, আইনের শাসন নেই। গত দুটি আন্দোলনে তারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে, নানা অপকর্ম করে তার দায় বিএনপির ওপর চাপিয়েছে। আগামী দিনেও তারা এটি করতে পারে। এ বিষয়ে সজাগ থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

আগামীর আন্দোলনে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন না বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত দিনের আন্দোলনের সঙ্গে এখনকার আন্দোলনের তুলনা করা যাবে না। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। সরকার বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় করেছে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত। প্রতিদিন মানুষের অপমৃত্যু হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের দাম বাড়ায় জনগণ অতিষ্ঠ। সরকারের কোথাও নিয়ন্ত্রণ নেই। সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ মাফিয়াদের হাতে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি এখনই আন্দোলনে যাচ্ছে না। ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে মাত্র। সময় হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামবে বিএনপি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত