প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ (রেমিট্যান্স) দেশে পাঠান তার ৪৯ শতাংশ হুন্ডির মাধ্যমে আসে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাকি ৫১ শতাংশ অফিশিয়াল বা ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে। গতকাল বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘অনেক আগে প্ল্যানিংয়ে (পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) থাকতে একটা স্টাডি করেছিলাম। তখন দেখেছি অফিশিয়াল চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসত ৫১ শতাংশ আর হুন্ডিতে (অবৈধ চ্যানেলে) আসত ৪৯ শতাংশ। আমি মনে করি সেই ধারাবাহিকতা এখনো আছে। এটাকে যদি অফিশিয়াল চ্যানেলে আনতে পারি। আর কেনই বা আসবে না। অফিশিয়াল চ্যানেলে এলে তো লস হচ্ছে না। তাদের শুধু প্রণোদনা নয়, স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি পরবর্তী প্রজন্মও বলতে পারবে।’
বর্তমানে বিশে^র বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধভাবে অবস্থান ও কাজ করেন। অবৈধভাবে বসবাসকারী প্রবাসীদের পক্ষে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না। আর বৈধ শ্রমিকরাও অনেক সময় ব্যাংকে গিয়ে দেশে টাকা পাঠাতে গিয়ে কাগজপত্রের জটিলতার কারণে আগ্রহ দেখান না। এসব কারণেই রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈধ চ্যানেলে দেশে অর্থ আসুক আমরা সব সময় প্রত্যাশা করি। বৈধ চ্যানেলে না আনলে সেটাকে কালো টাকা বলব। এই টাকার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অর্থনীতির আওতায় ব্যয় করতে পারে না। আবার যুক্তও করতে পারে না। যারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আনেন, তারা সব সময় বিবেকের কাছে দায়ী থাকবেন। হুন্ডির মাধ্যমে আসা অর্থ কোনো রেকর্ড করা যাচ্ছে না। তাই আমাদের রেগুলেটরি বডি (নিয়ন্ত্রক সংস্থা) যদি এসব অর্থ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলে জবাব দিতে পারবে না। সে জন্য সারা বিশে^ অফিশিয়াল চ্যানেলে অর্থ পাঠানো প্রাধান্য পায়। আমরাও সেভাবেই প্রাধান্য দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেন, আমরা যেন সব সময় ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহ দিই। অফিশিয়াল চ্যানেলে টাকা এলে তাদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বরং লাভবান হচ্ছেন। আর যদি হুন্ডির মাধ্যমে আসে এই টাকা খরচ করতে গেলেও প্রশ্ন আসবে কোথায় পেয়েছে। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আসছে, যাতে কম আসে। সেটা নিরুৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা দিচ্ছি।’
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘রপ্তানি বাণিজ্যের পরে রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির জন্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।’
সরকার বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছিল। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়াতে পরে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রণোদনা দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে আড়াই শতাংশ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার। চলতি বছরের জুলাই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২০৯ কোটি ডলার। যা আগের মাস জুনের তুলনায় ১৪ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দু-এক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ১২.৩ শতাংশ। এখন যে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে তা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। ইউরোপে গত জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.১ শতাংশ যা এপ্রিল ৭.৪ শতাংশ এবং জুলাইয়ে আরও বেড়ে ৭.৯ শতাংশ হয়েছে। পুরো ইউরোপে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। বলা যায়, ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। এসব দেশ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে আসার কারণেই দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সুদ হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেই। যে কারণে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণে শুল্ক বাড়ানো, এলসি মার্জিন বাড়ানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী জানান।
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ছে। এফডিআইতে কতটা দুর্নীতি হয়, আমার কাছে তথ্য নেই। দুর্নীতি যে হচ্ছে না ইটস নট দ্যাট (তা নয়)। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের হিসাব ঠিকভাবে হচ্ছে না। অথবা মূল্যায়ন যা হচ্ছে সেখানে এদিক সেদিক হচ্ছে। এজন্য আমরা এখন দায়িত্ব নিয়েই কাজটি করছি। রেগুলেটরদের নির্দেশ দিয়েছি। তারাও এগিয়ে এসেছে, যাতে সততার সঙ্গে সবাই দায়বদ্ধতার নিরিখে কাজগুলো করে।’ তিনি বলেন, ‘আমদানির পরিমাণ ও মূল্য সঠিক হতে হবে। আমদানির পরিমাণ ও মূল্য যদি বেশি দেখিয়ে টাকা বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলো আমাদের বন্ধ করতে হবে।’
সম্প্রতি ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে কেজিতে ৬ টাকা। এটা কি আইএমএফের শর্ত কি-না সাংবাদিকরা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো জবাব দেবেন না বলে জানান।
